
ডিসেম্বর মাস এলেই আমি ‘সেভেন ফ্লীট’ আতঙ্কে ভুগি।
যুদ্ধের শেষের দিকে সীমান্তের কাছাকাছি একটা ক্যাম্প থেকে পাকিস্তান আর্মিদের চলাচলের পথে আমরা অতর্কিত গেরিলা হামলা করতাম। গোপনে লুকিয়ে থেকে সি এন বি রোডে আক্রমণ করে ওদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়া ছিল দলের লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে হবে করছে, চারিদিক থেকে পাকিস্তানীদের উপর জোরদার আক্রমণ শুরু হয়েছে। রণাঙ্গন ছেড়ে কিছু কিছু পাকিস্তানী নিকটবর্তী শহরগুলোর দিকে পালিয়ে যেতে শুরু করেছে। যার মানে যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে, সামান্য কিছু অপেক্ষা।
কিছুদিনের মধ্যে মায়ের সাথে আমার দেখা হবে। বুঝতে পারতাম রাতে তিনি ঘুমাতেন না। যদি কখনো রাতের আধারে তাঁর সাথে দেখা করতে যাই সে ভাবনায় তিনি হয়তো সারারাত জেগে থাকতেন। যুদ্ধের পর শুনেছি পুরো গ্লাস পানি তিনি খেতেন না এই ভেবে যে, আমি এবং আব্বা পানির জন্য কোন কষ্ট পাচ্ছি কিনা। যদি মারা গিয়ে থাকি, মৃত্যুর সময় গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় নি তো?
সেই মায়ের সাথে সন্তানের দেখা হবে। স্বামীর সাথে স্ত্রীর মিলন হবে এমন শুভক্ষণটি ছিল পলক দূরত্বে। এমন সময় আকাশবাণী খবর প্রচার করলো পাকিস্তান আর্মিদের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য আমেরিকা সবচাইতে বড় নৌবহর (সেই সময়কার) সেভেন ফ্লীট বা সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে।
‘সপ্তম নৌবহর’ সম্পর্কে স্কুল বয়সে আমার কোন অভিজ্ঞতা থাকার কথা নয়। শাঁকচুড়া ক্যাম্পের মন্নু ডাক্তার বুঝিয়ে বললেন সপ্তম নৌবহরের বিশাল ক্ষমতা। তিনি আরও বুঝিয়ে বললেন ভিয়েতনামের যুদ্ধ ছেড়ে দিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে কেন এই নৌবহর পাঠানো হচ্ছে।
তাঁর কথা শেষ হতেই মায়ের মলিন মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। তাহলে, মা-ছেলের মিলন হচ্ছে না সেভেন ফ্লীটের কারণে? আমার প্রচণ্ড রাগ হলো, মিলনের পথে বাঁধা দেওয়ার জন্য আমেরিকা সংক্রান্ত সব আকর্ষণ নষ্ট হয়ে গেল। যার জন্য ৩২ বছর কানাডা থেকেও এখন পর্যন্ত একবারও আমেরিকায় ভ্রমণের জন্য যেতে রাজি হই নি। দু’একটা অনিবার্য ঘটনা ছাড়া আমেরিকার মাটিতে পা দেই নি এখনো। হয়তো কোনদিনও আমেরিকা যাওয়া হবে না। অদেখা থেকে যাবে পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী দেশ। যদিও জানি সেই দেশের মানুষগুলো কত ভাল এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমাদের জন্য সাধারণ মানুষ পথে নেমে কত প্রতিবাদ করেছে, দিয়েছে নানান সহযোগিতা। তবুও মায়ের মলিন মুখের কাছে সব যুক্তি অবুঝ।
দীর্ঘ সময় যে যুদ্ধের মধ্যে থাকে শুধু সেই বুঝতে পারে যুদ্ধ করা যেমন কঠিন, আজীবন যুদ্ধের সাথে লেগে থাকা তার থেকেও বেশি কঠিন।
স্কারবোরো, কানাডা

