
এখন বাংলাদেশের কোনো বাড়িতে ভিক্ষুক আসে না। আসতে পারে না। নিরাপত্তার কারণে সব গেঁটে থাকে তালা বা দারোয়ান। গেট থাকে সবসময় বন্ধ। পরিচয় না দিয়ে ঢোকার কোনো উপায় নেই। তাই ওরা তাদের পয়সা উপার্জনের জন্য বেছে নিয়েছে রাজপথ। লাল বাতিতে কিংবা জ্যামে গাড়ি থেমে থাকলে আপনি যতটা বিরক্ত হবেন বিলম্বিত হচ্ছে বলে ঠিক সমানভাবে নির্যাতিত হবেন ভিক্ষুকদের অত্যাচারে। আপনাকে ঘেরাও দেয়া হবে সাহায্যর জন্য। গাড়ি আরোহণকারীদের মন গলাবার জন্য নানারকমের অভিনয়েরও দীক্ষা গ্রহণ করেছে আধুনিক ভিক্ষুকেরা।
লিখতে লিখতে একটা মজার কথা মনে পড়ে গেলো। ঢাকা গেছি বেড়াতে। প্রতিদিনের মতো জ্যামে আটকা। গাড়ির জানালাতে টোকাটুকি, অনুনয় বিনিনয় চলেই যাচ্ছে। আমি সব সময়ই কিছু খুচরা টাকা রেখে দেই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবার জন্য। এমনি একদিন জ্যামে বসে আছি। টুকাটুকি চলতেই লাগলো। আমি ব্যাগ খুলে একটা বিশ টাকার নোট বের করে দিলাম। ভিক্ষুক লোকটা আমার উপর ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বললো – বিশটা টাকা দিলেন কী বুইজা? একশ টাকা দেন। ভিক্ষুকের কথা শুনে আমি হতভম্ব। কই কেউ তো আমাকে বলেনি ভিক্ষুকদের টাকা দেবার রেট বেড়ে গেছে? অবশেষে আমার গাড়ি চালকের কুৎসিত গালি শুনে সরে গেছিল লোকটা। এই গল্পটা আমি অনেককেই করেছি। তখন আমার মাথায় একটা চিন্তা এসেছিল, এমন দিন তো আসতে পারে ভিক্ষুকরা আন্দোলন করবে তাদের একশত টাকার কম কেউ দিতে পারবে না। এর কম যদি কেউ দেয় সেটা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। হয়তো কোনোদিন আন্দোলন করে বিলটা পাশও করিয়ে নিতে পারে।
কথা বলতে বলতে কতো পুরনো কথা যে মনে এসে ভিড় করে। যে সব কথা এত বছর মনে হয়নি এখন কেন মনে পড়ে যাচ্ছে নিজেই নিজের জন্য মুগ্ধ হচ্ছি। হঠাৎ করে কীভাবে আমার স্মরণশক্তি এত প্রখর হয়ে গেলো ভেবে বিস্মিত না হয়ে পারছি না। নিজের জন্য নিজে একটা হাত তালি দিলাম এখন। কাঊকে না জানিয়ে নিজেকে বাহাবা দেয়া নিজের ভালো কাজের জন্য নিজেকে হাততালি দেবার আনন্দই আলাদা। এতে করে নিজের সাথে নিজের নতুন করে পরিচয় ঘটে। মানুষ নিজেকে নিজে ভালোবাসতে শিখে। যে নিজেকে ভালোবাসতে জানে না সে পৃথিবীকেও ভালোবাসতে পারে না।
আমাদের কুমিল্লার মানুষদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। মানুষের নামগুলোকে একটু অন্যভাবে ডাকা। যেমন, কামাল কে কামাইল্লা, ফারককে ফারুইক্কা, ফুলীকে ফুলুনী, তিথিকে তিথুনী, লোটাসকে লোটাসচ্চা। এই ডাকগুলো কখনো ছিল ভালোবেসে কখনো ছিল তাচ্ছিল্য ভরে।
ফজু নামটা শুনলে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় তার প্রকৃত নাম ফোজলু কিংবা ফজল হবে। কিন্তু যেহেতু সে নারী ছিল তাকে ডাকা হতো ফোজুনী এবং ফজু পাগলী। ফজু বছরের তিন চার মাস পাগল থাকতো আর বাকি সময়টা থাকতো সুস্থ স্বাভাবিক। ফজুর সাথে আমাদের ছোটবেলার অনেক স্মৃতি। ফজু কোথা থেকে এলো, কীভাবে এলো, তার আদি বাস কোথায় আমরা কিছুই জানতাম না। ফজু এখন পাগল হয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারতাম ওর পোশাক পরিবর্তন দেখে। তখন ফজু নারী থেকে পুরুষের পোশাক পরতে শুরু করতো। শাড়ি বøাউজ ছেড়ে লুঙ্গি সার্ট স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে ছুটাছুটি করতো। এক হাতে থাকতো একটা লাঠি আর আরেক হাতে ঘাস কাটার কাস্তে। প্রচণ্ড রোদে বসে বাগানের পরির্চচা করতো, ছিপ ফেলে মাছ ধরতো ফজু। মাঝে মাঝে জাল ফেলতো মাছ ধরার জন্য। ফজুর কাছে আমি ছিপ ফেলে মাছ ধরা শিখেছিলাম।
পাগল অবস্থাতে ফজুর প্রধান কাজ ছিল পুরুষদের গুষ্টি উদ্ধার করা। কিছুক্ষণ পর পরই হৈহৈ করে চিৎকার দিয়ে বলতো, ‘আয় ব্যাডারা তোরার গলা কাইটটা পুশকুনির পানিতে ছুবাইয়া থুমু। কুত্তার জাত, খাওন দেখলে দৌড় মারছ। মাইয়া মানুষ দেখলে জিব্বা দিয়া পানি পড়ে। আয় তোরার জিব্বা কাইটা কুছি কুছি কইরা ভাইজা খামু। ’ আরো অনেক কুৎসিত ভাষা ফজু ব্যবহার করতো পুরুষ জাতির বিরুদ্ধে। শালীনতার খাতিরে সেগুলো উল্লেখ করলাম না। সব চাইতে ভালো ব্যাপার যেটা ছিল তার পাগলামিটা তার নিজের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। ও অন্য কারো কোনো ক্ষতি করতো না।
ফজু খুব বিবেচক পাগল ছিল। ও এক বাড়িতে বেশি দিন থাকতো না। ওর নির্দিষ্ট চারটা বাড়ি ছিল। ঘুরে ঘুরে সব বাড়িতে ফজু থাকতো। ফজুর পাগলামি শেষ হয়ে যাচ্ছে আমরা বুঝতে পারতাম যখন ফজু আবার নারীবেশ ধারণ করতো। আমি এখন ভেবে অবাক হই আমাদের মায়েদের উদারতা দেখে। ফজু এসে থাকতো খেতো, ঘুমাতো কিন্তু আম্মা কখনো ফজুকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেননি। ফজু নিজ দায়িত্বে বাড়ি পাহারা দিতো। ফুলের বাগান ফলের বাগানের কাজকর্ম করতো। আম্মা মাঝে মাঝে টুকটাক বাজার করার জন্যও ফজুকে পাঠাতো, আমরাও পাঠাতাম। যখন ও পাগল থাকতো না নিষ্ঠার সাথে সব পুরুষালী কাজগুলো করতো।
ফজু যখন পাগল থাকতো না তখন ফজুকে ঘিরে বসে ফজুর সাথে গল্প করতে বসতাম। আমাদের প্রতি ওর অনেক মায়া ছিল। ফজুকে আমরা জিজ্ঞেস করতাম, ফজু তুমি কেন পাগল হও?
‘জানি না ছোটবেলায় জ্বিনে ধরছিল, হেই জ্বিনডা যখন আইয়ে তখন পাগল হই, জ্বিন গেলে গা আবার ভালা হইয়া যাই।’ ফজু অনেক গল্প আমাদের শুনাতো ওর জীবন নিয়ে, আমরা গালে হাত দিয়ে ওর গল্প শুনতাম। গল্পগুলো ছিল এরকম ছোটবেলাতে কোনো এক সন্ধ্যাতে গাছের নিচ দিয়ে যাবার সময় ওকে জিনে ধরে। তারপর থেকে ও পাগল হয়ে যায়। ফজুর একটা বিয়ে হয়েছিল। যখন ফজুর পাগলামি শুরু হতো তখন ওর স্বামী আর শাশুড়ি ওকে ধরে অনেক মারতো, কোনো কোনোদিন মেরে ওকে অজ্ঞান করে ফেলতো। খেতে দিত না। মৌলবি ডাকা হতো ওর পাগলামি ছাড়াবার জন্য। মৌলবি বলতেন পাগলামি ছাড়াতে হলে ফজুকে তার বাড়িতে রাখতে হবে কিছুদিন। ফজুকে মৌলবীর বাড়িতে থাকতে হতো কিছুদিন। আর সে মৌলবী শালা প্রতিদিন ওর সাথে খারাপ কাজ করতো। তখন খারাপ কাজটা আমরা বুঝতে পারতাম না। আমাদের চোখ ছল ছল হয়ে যেতো। আমি জিজ্ঞাস করতাম মৌলবি লোকটাও তোমাকে মারতো? ফজু আমার কথার কোনো জবাব দিতো না। ফজুর নাকি একটা কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। দুই মাসের মাথায় শিশুটি মারা যায়। তারপর ফজুর স্বামী ফজুকে পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফজু আবার ফিরে যায় মা ভাইদের কাছে। ফজু যখন পাগল হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে বন বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো তখন অনেক পুরুষই তাকে একা পেয়ে শারীরিক নির্যাতন করেছে। ফজুর ভাইরা ফজুকে ধরে এনে অমানসিকভাবে মারতো। একবার মেরে ওর হাত ভেঙে দিয়েছিল। এসব দেখে ফজুর মা কপাল চাপড়ে কাঁদতো।
মাঝে মাঝে ফজু গায়েব হয়ে যেতো। বেশ কিছুদিন পরে আবার ফিরে আসতো। আম্মা জিজ্ঞাস করতেন, ‘ফজু কই ছিলি এতদিন?’ ফজু জবাব দিত বাড়িত গেছিলাম বেরাইম্মা মাডারে দেখতে। বুড়ি আর বেশি দিন বাঁচতো না।
ফজুকে নিয়ে অনেক গল্প করে ফেললাম। আরো বহু গল্প ফজু আমাদের সাথে করতো সেটা যদি বলতে বসি তাহলে আমার লেখার নাম ‘ আমার ছোটবেলা’ বদলে দিতে হবে ‘ফজুনামা’। তাই আজকের মতো ফজুকে বিদায় দিলাম।
ম্যাল্টন, কানাডা

