
অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার নভেম্বর ২০২৪-এ শ্রমজীবী মানুষদের সুরক্ষা ও সমতার দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ‘ওয়ার্কিং ফর ওয়ার্কার্স সিক্স অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেছে। সরকারের দাবি, এই আইন কার্যকর হলে প্রদেশের অসংখ্য শ্রমিক ও তাদের পরিবার দীর্ঘ অসুস্থতার সময় এবং পরিবার গঠনের প্রক্রিয়ায় নতুন ধরনের সুরক্ষা পাবে।
শ্রমমন্ত্রী জানান, “আইনের মূল লক্ষ্য হলো শ্রমজীবী মানুষকে তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রদান করা এবং ব্যক্তিগত জীবনে মর্যাদা নিশ্চিত করা।”
আইনের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো দীর্ঘ অসুস্থতার ছুটি বৃদ্ধি। আগে শ্রমিকেরা সর্বোচ্চ ১৭ সপ্তাহের অসুস্থতা ছুটি পেতেন। নতুন আইনে এটি ২৭ সপ্তাহে উন্নীত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সার, হৃদরোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত শ্রমিকরা এখন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য আরও পর্যাপ্ত সময় পাবেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ অসুস্থতা ছুটি নিশ্চিত হলে কর্মীরা চিকিৎসা সম্পূর্ণ করতে পারবে এবং অসম্পূর্ণ চিকিৎসার কারণে পুনরায় কাজে ফেরার ঝুঁকিও কমবে। এটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত সুবিধা নয়, বরং কর্মীদের মানসিক শান্তি ও পরিবারিক স্থিতিশীলতাকেও সমর্থন দেবে।
আইনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পরিবার গঠনে সমতা আনা। আগে দত্তক ও সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান গ্রহণকারীরা মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির পূর্ণ সুবিধা পেতেন না। নতুন আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দত্তক বা সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান গ্রহণকারীও জৈবিক মা-বাবাদের মতোই ছুটির সুবিধা পাবেন।
এই পদক্ষেপ বিশেষভাবে সমলিঙ্গ দম্পতি এবং নিঃসন্তান পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করছে। আইন কার্যকর হলে পরিবার পরিকল্পনায় বৈষম্য ধ্বংস হবে এবং সমস্ত পরিবার সমান সুযোগ পাবে।
অন্টারিওতে বর্তমানে প্রায় ৪৭ লাখ পূর্ণকালীন শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। নতুন আইন তাদের বড় অংশকে সরাসরি উপকৃত করবে। একই সময়ে, বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার দম্পতি দত্তক বা সারোগেসির মাধ্যমে পরিবার গঠন করেন। নতুন আইন তাদেরও সমান সুবিধা নিশ্চিত করছে।
আইনে আরও কিছু অতিরিক্ত সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কর্মীরা ছুটিতে থাকাকালীন তাদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়বে না। নিয়োগকর্তা তাদের বরখাস্ত বা পদাবনতি করতে পারবে না। ছুটির সময়কালীন স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সুবিধাও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নতুন আইনকে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলছে, দীর্ঘ সময় একজন কর্মীর অনুপস্থিতি বিকল্প কর্মী নিয়োগ ও খরচ বৃদ্ধির কারণ হবে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায় যেখানে কর্মী সংখ্যা সীমিত, সেখানে এই চাপ আরও বেশি পড়বে। বিরোধী দলও দাবি করছে, সরকার যদি সত্যিই শ্রমিকদের সহায়তা করতে চায়, তবে ব্যবসায়ীদের জন্য ভর্তুকি বা কর ছাড়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে শ্রমিক ইউনিয়ন ও সামাজিক সংগঠনগুলো আইনটিকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দেখছে। তারা বলছে, “শ্রমিক কেবল উৎপাদনশীলতার অংশ নয়; তারা মানুষ। তাদের পরিবার, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মর্যাদা রয়েছে। এই আইন সেই মর্যাদার স্বীকৃতি।”
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অন্টারিওতে শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন। একই সময়ে দত্তক ও সারোগেসির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে এই আইন সময়োপযোগী এবং সামাজিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ‘ওয়ার্কিং ফর ওয়ার্কার্স সিক্স অ্যাক্ট’ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করছে যে অন্টারিও সরকার শ্রমিকদের কেবল অর্থনৈতিক অবদানকে নয়, মানবিক চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। আইন কার্যকর হলে কর্মক্ষেত্রে সমতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সুরক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

