
কুইবেক সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, ২০৩৫ সাল থেকে শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। এর অর্থ, প্রদেশে ভবিষ্যতেও গ্যাসচালিত গাড়ি বিক্রি চলবে। সরকার জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব অবস্থা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে।
২০২১ সালে কুইবেক সরকার একটি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে অনুযায়ী ২০৩৫ সাল থেকে প্রদেশে শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করা হবে। এর লক্ষ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং কানাডার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কৌশলকে শক্তিশালী করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাড়ি শিল্পকে ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কুইবেকে মোট গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৮ লাখ বা প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে নতুন গাড়ি বিক্রিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশ মাত্র ১৮ শতাংশ, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ বৃদ্ধি। তুলনায়, ক্যালিফোর্নিয়া ও নরওয়েতে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার অংশীদারি ইতিমধ্যে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিদ্যুৎচালিত গাড়ির চার্জিং অবকাঠামোও এখনও সীমিত। পুরো প্রদেশে চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা ১৪ হাজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশ বছরে এই চাহিদা পূরণ করতে অন্তত ১ লাখ চার্জিং স্টেশন প্রয়োজন। এর মধ্যে দ্রুত চার্জিং স্টেশন মাত্র ৩৫০০, যা দীর্ঘ ভ্রমণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।
কুইবেকের গাড়ি ডিলার অ্যাসোসিয়েশন বেঙ্গলি টাইমস এর এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, গ্যাসচালিত গাড়ি বাজার এখনও মোট বিক্রির ৮০ শতাংশের বেশি দখল করে রেখেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্থানান্তর করতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এছাড়া, লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের বৈশ্বিক সংকটও ব্যাটারি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম ৫৫–৬০ হাজার ডলার, যেখানে গ্যাসচালিত গাড়ির দাম ২৮–৩০ হাজার ডলার। কুইবেকের গড় বার্ষিক পারিবারিক আয় ৭৮ হাজার ডলার হওয়ায় সাধারণ পরিবারের পক্ষে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা এখনও চ্যালেঞ্জিং। সরকার সর্বোচ্চ ৭০০০ ডলার ভর্তুকি দিলেও এটি বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, কুইবেকের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৪৩ শতাংশ আসে পরিবহন খাত থেকে। ২০২৩ সালে প্রদেশে কার্বন নিঃসরণ ছিল ৭৭ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে ৩৩ মিলিয়ন টন পরিবহন থেকে এসেছে। ২০৩৫ সালের বৈদ্যুতিক গাড়ির লক্ষ্য কার্যকর হলে, ২০৫০ সালের মধ্যে নিঃসরণ কমানো যেত অন্তত ২৫ শতাংশ।
সরকার বলেছে, তারা নীতি বাতিল করলেও বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে। আগামী পাঁচ বছরে চার্জিং অবকাঠামো ও গবেষণায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ব্যাটারি কারখানা নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্প ও নাগরিকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হলেও, পরিবেশ আন্দোলনকারীদের কাছে এটি একটি পশ্চাদপসরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি স্পষ্ট করছে যে, জলবায়ু নীতি বাস্তবায়নে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঠিক হিসাব রাখা জরুরি। কুইবেকের উদাহরণ দেখাচ্ছে, পরিবেশ সংরক্ষণে পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

