22.9 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, জুন ২০, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : চৌদ্দ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : চৌদ্দ

বেশ লম্বা ফ্লাইটে উড়তে উড়তে আমরা আবার টরোন্ট এয়ার পোর্টে অবতরন করলাম। আমার বড় বোনের দুই বন্ধু ছিলো টরোন্টতে । আপার কথা মতো উনারা আমাদের এয়ার পোর্ট এ রিসিভ করলেন। আমরা আবারো একটা এপার্টমেন্ট ভারা করে নিলাম আপার বন্ধুর সহযোগীতায় । উনার বাড়ীর পাশেই আমাদের জন্য একটা এপার্টমেন্ট ঠিক করে রেখে দিয়েছিলেন। আমরা সেখানে পৌঁছে দেখি তিনি আমাদের জন্য ভাত তরকারী রান্না করে ফ্রিযে রেখে দিয়েছেন। যেহেতু কোন ফার্নিচার নেই সেখানে তিনি ফ্লোরে আমাদের জন্য বিছানা বানিয়ে রেখে ছিলেন। প্লেট ,গ্লাস, চায়ের কাপ, দুধ চিনি রুটি ডিম সবই কিনে রেখে দিয়েছিলেন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতার আমাদের শেষ ছিলো না। সেদিন রাতে আমরা এতোই ক্লান্ত ছিলাম যে আর কোন দিকে নজর দিতে পারলাম না,। কোন ভাবে মুখে কিছু দিয়ে শুয়ে পরলাম।

- Advertisement -

সকালে উঠে সুযোগ হোল পুরো এপার্টমেন্ট এবং আশপাশ টা দেখার পর। দেখার পরে মন খুশী হোল না বরং ভরাক্রান্ত হোল । বাচ্চাদের মনটাও কেমন যেনো খারাপ খারাপ মনে হোল । ওরা সব সময় তাদের বাবার অফিসের বাড়ীতে থেকেছে নানা রকমের সুযোগ সুবিধা মনে আনন্দ নিয়ে । এই এপার্টমেন্ট এবং তার আশপাশ খুব বেশী সাধারন। ছেলে মেয়েদের সান্ত্বনা দিলাম, এই দেশে বাবা অফিসের কোনো বাড়ী পাবে না। আমরা একটু ঠিক ঠাক হয়ে নিজেদের পছন্দ মতো বাড়ী কিনে নেবো । তারপর আমাদের শুরু হোলো নিজেদের ঠিক ঠাক করার কাজ। এপার্টমেন্টে যেহেতু কোনো আসবার পত্র নেই শুধু রান্না ঘরের চুলা ও ফ্রিজ ছাড়া ( এটাই এখানকার ভাড়া বাড়ীর নিয়ম ) । আমরা সিধান্ত নিলাম আমরা এখন কোনো আসবার পত্র কিনবো না যখন বাড়ী কিনবো তখন বাড়ীর সাথে মিলিয়ে কেনা যাবে। শুধু মাক্রোওয়েভ , টেলিভিশন , টোস্টার ও অত্যান্ত প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনে সব আসবার পত্র ভাড়া করে নিলাম। সিঙ্গাপুর থেকেও আমরা প্রচুর প্রয়োজনই ও সখের জিনিষ শিপমেন্ট করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আশা করছিলাম এক মাসের মধ্যে চলে আসবে।

যাই হকো এখন বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করার পালা। এই দেশের নিয়ম অনুযায়ী সে এলাকার স্কুলে ছেলে মেয়েদের ভর্তি করিয়ে দিলাম। তারপর আমাদের দুজনের কানাডার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়া। কিছুদিন এখানকার নিয়ম কানুনের প্রশিক্ষণ নিয়ে আমরা দুজনই ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়ে পাস করে গাড়ী কিনে ফেললাম। জীবনটা তখন অনেকটাই মসৃণ হলো । আমাদের আশেপাশে এবং অন্যান্য কিছু বাঙালীদের সাথে পরিচয় হোলো । তাদের কাছে অনেক আন্তরিক ব্যবহার পেয়েছি। তখন টরোন্টতে বাঙালীর সংখ্যা এখনকার তুলনায় অনেকই কম ছিলো যার ফলে সবার মাঝে আন্তরিকতা প্রচুর ছিলো এবং চলাফেরাতে ছিলো খুবই মার্জিত ভাব । তখন সেখানকার মোটা মুটি সবাই আমাদের বয়োজষ্ঠো ছিলেন কয়েকটি পরিবার ছাড়া।

তারপর আমাদের সব চাইতে আগ্রাধিকার হোলো বাড়ী কেনা। বাড়ী বিক্রির এজেন্টের সাথে আমি বাড়ী দেখে বেড়াই । কোনটার দাম পছন্দ হয় বাড়ী পছন্দা হয় না আবার কোনটার বাড়ী পছন্দ হয় দাম আমাদের নাগালের বাইরে। অবশেষে সব মিলিয়ে ভালো এবং সুন্দর এলাকাতে একটা বাড়ী পেয়ে গেলাম । ছেলে মেয়ে তাদের বাবা সবাই বাড়ী দেখে পছন্দ করলো । বাড়ী হাতে পাবো তিন মাস পর। ভালোই হোলো আমরা এপার্টমেন্ট ছাড়ার নোটিস দিয়ে অসবারপত্র কেনায় মনো নিবেশ করলাম। সব কিছু গুছিয়ে আমরা নিজেদের বাড়ীতে উঠে গেলাম। তখন আমরা সবাই খুশী ।আমি আবার চতুর্থ বারের মতো আমার সংসার গুছাতে লেগে গেলাম। খুব ভালো প্রতিবেশী পেলাম।

একজন কলকাতার বাঙালী পম্পা , আমাদের দুপাশে দুই ক্যানাডিয়ান পরিবার। তাদের বাচ্চারা আমাদের বাচ্চাদের বয়েসী । ওরা একই স্কুলে যায় , একই ক্লাসে পড়ে । স্কুলের পর বিকেলে বাচ্চারা সবাই বাইরে খেলা ধুলা করে। এখন ওদের মনের দুঃখ সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আনন্দের জীবন শুরু করলো । আমরাও তাই। প্রতিবেশীদের সাথে দারুন বন্ধুত্ব হয়ে গেলো । আমি আমার জন্য ও গাড়ী কিনে নিলাম। এখানে সিঙ্গাপুরের মতো হাত উঠালেই ট্যাক্সি থামনো যায় না।

এখানকার নিয়ম অন্য রকম। ফোন করে ট্যাক্সি কল করতে হয়। কাজেই দুটো গাড়ী প্রয়োজনীয় হয়ে পড়লো আমার নানা রকম কাজের জন্য। জীবন খুব দ্রুত কাটতে লাগলো নানা রকমের ব্যস্ততায় , আনন্দে , ক্লান্তিতে । জীবনে প্রথম নাইগ্রা ফল দেখে আপ্লূত হয়েছিলাম আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলাম , মুগ্ধতায় প্রান মন ভরে গিয়েছিল, দুঃখ হয়েছিলো কেনো নাইগ্রা ফলে আসলাম না হানিমুন করতে। সে নাইগ্রা ফল এখন আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে। আমাদের উত্তেজনার শেষ নেই । ছেলে মেয়েদের নিয়ে কয়েকবার ঘুরে আসলাম নায়গ্রা থেকে। বোটে চড়ে নীল রঙের রেইন কোর্ট জড়িয়ে ফলের কাছাকাছি ঘুরে আসার ট্রিপ নেয়া হোল কয়েকবার।

আমার ছেলের বিশেষ আকর্ষণ ছিলো নায়গ্রার মেরি ল্যান্ড যাওয়া । ডলফিনের ও অন্যান্য জলে বাস জল প্রাণীদের খেলা দেখা। কিছু বছর পরে যখন একটু বড় হলো তখন আর কখনো যায়নি । এভাবে সাগরে বাস করা ডলফিনদের ধরে এনে এদের বন্ধ পানিতে আটকে রেখে তাদের নানা ভাবে ট্রেনিং দিয়ে মানুষকে খেলা দেখিয়ে পয়সা উপার্জনটা আমার ছোট ছেলেটার কাছে খুব নিষ্ঠুরতা মনে হয়েছে তারপর থেকে আমার ছেলে কখনো আর মেরিন ল্যান্ড যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করে নি। যখনি যারা বেড়াতে এসেছে তাদের নিয়ে নায়গ্রা ফল দেখানোটাই ছিলো বিশেষ আকর্ষণ। তাছাড়া নায়গ্রার আশেপাশে আছে অনেক কিছুর দেখার। এতো বার যাওয়া হয়েছে নায়গ্রাতে এখন আর বিশেষ আকর্ষণ খুঁজে পাইনা এর মাঝে। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক আসে এখানে নায়গ্রা ফল দেখতে।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles