26.6 C
Toronto
মঙ্গলবার, মে ২১, ২০২৪

‘পর্বত হতে চায় বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ’

'পর্বত হতে চায় বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ'

 

- Advertisement -

[ বলাকা/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]
টরন্টোয় ‘আর্ট গ্যালারি অব অন্টারিও’তে পিকাসোর ড্রয়িং-এর একটা প্রদর্শনী হয়েছিল। বেশ কিছু মাস স্থায়ী ছিল সেই প্রদর্শনী। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল পিকাসোর অসংখ্য ড্রয়িং দেখার। অসংখ্য শব্দের আগে ‘অনবদ্য’ শব্দটি অনিবার্যভাবে জুড়ে দিতেই হয়।পিকাসোর এই ড্রয়িং দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এ কি দেখছি! শিল্পী পিকাসোর যে কাজ দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত, এই কাজ তো সেই ধরনের নয় মোটেই! একি রেমব্রান্টের ড্রয়িং নাকি অন্য আর কোনো ‘মাস্টার’ শিল্পীর! পিকাসোর আঁকা ফ্রাঁসোয়া জিলোর মুখাকৃতির কাজটি কল্পনা করলে, এই ড্রয়িং এর মুখোমুখি হলে হতবাক হয়ে যেতে হয়, নিজেকে বারবার ভেঙ্গে নতুন রূপে ও প্রকরণে তাঁর প্রকাশ দেখে। মূলত শিল্পকলায় যে কোন মহৎ ও বড় শিল্পীর কাজে নিজস্ব একটি ‘ধরন’ ‘স্টাইল’ ‘নমুনা’ আয়ত্ত হয়ই। অথবা, অন্যভাবে বললে, সেই ধরন বা স্টাইলটি তিনি রপ্ত করেন। এমনকি এইসব মাস্টার শিল্পীর কাজের প্রভাব এমনই বহুদা বিস্তৃত হয় যে, তাঁর
প্রভাববিস্তারকারীদেরকে ঘরানা, স্কুল হিসেবে খ্যাতিলাভ করে। কবি জীবনানন্দ দাশের উদাহরণই মনে হয় হাতের কাছে সবচেয়ে সহজ হয়। সঙ্গীতপ্রিয় বা শিল্পপ্রিয় যে কোন বাঙালিকে রবীন্দ্রনাথের যে কোন গানের সুর শুনিয়ে প্রশ্ন করলে যেমন বলতে সময় ক্ষেপণ করবেন না, এটা রবীন্দ্রনাথের বলে; তেমনি, শাহ মোহাম্মদ সুলতানের যে কোন কাজের একটি আঁচড় দেখিয়ে দিলেও তিনি বলে দিতে পারবেন, এটি কার তুলির কারিশমা।

রবীন্দ্রনাথও ভারতীয় পুরান উপনিষদের ভাবদর্শনের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক প্রকাশে বিশ্বজয় করে থেমে থাকেননি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও অক্টোবর বিপ্লব তাঁকেও নিজের গড়া অনিন্দ্য বেষ্টনীর আবহ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রভাব ফেলেছে৷ তিনিও নতুন যুগের ডাকে সাড়া দিয়েছেন৷ ‘ঘরে বাইরে’ ‘বলাকা’ ‘শেষের কবিতা’ ‘রক্তকরবী’ এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
আমরা, এই টরন্টোবাসীরাও যে ক্রমে ক্রমে নিজেদের শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার চর্চিত চেনা ক্ষেত্র থেকে আরো আরো অগ্রসরমানতার দিকে ধাবমান হবো, এ তো সময়েরই দাবী। কিন্তু, সময় দাবী করলেও সেই সময়কে তার চাহিদা অনুযায়ী নির্মাণকারীরও তো
সময়কে ধারণ করার ক্ষমতা ও বুকের পাটা থাকতে হবে!

সহসা কেউ সোনার কাটির পরশ দিয়ে যেন টরন্টোর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমাদের জন্য কাউকে কাউকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এঁদের কাজ দেখে বিস্ময় ও মুগ্ধতায় আপ্লুত হয়েই আমাদের শুধু নির্বাক হয়ে বসে থাকার পালা৷ যে উচ্চতার শিখর স্পর্শ করার জন্য টরন্টোর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীরা অক্লান্ত সাধনায় নিজেদের প্রস্তুতি পর্বটি পার করছেন – ঠিক সেই সময়েই যাদুর পরশ নিয়ে যেন কেউ কেউ নিঃশব্দে এসে বলে দিয়ে যায় – আমরা সাফল্যের চূড়ায় ওঠেই ক্ষান্ত দেবো না, আমাদেরকে পর্বত চূড়া স্পর্শের সাফল্যের চেয়েও আরো উপরে যেতে হবে। বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘের মতো অবারিত উড়ে যেতে হবে, মুক্ত বাঁধাহীন হয়ে আকাশে আকাশে!

কথাগুলো বলছি এই কারণে যে, আমরা, অগণিত টরন্টোবাসী নির্বাক হয়ে আছি উদীচী কানাডার পঁচিশ বছর পুর্তির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে। আমি তবু আনমনে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলাম ‘বাহ্!’ এমনিই বেলায়েত খাঁ সাহেব আমাকে ধমক দিয়ে সাবধান করে দিয়েছেন। খবরদার বাবা শুনলে সপাটে থাপ্পড় দেবেন!
শহরে সঙ্গীতের জলসা হবে। দেশের বড় বড় ওস্তাদেরা এসে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন বন্ধু ওস্তাদ এনায়েত খাঁ সাহেবের বাড়িতে। শিল্পীরা একসাথে হলে যা হয়! শেষ রাতে গান শুরু হয়েছে৷ এক ওস্তাদজীর গান শেষ হতেই বালক বেলায়েত খাঁ স্বতস্ফূর্তভাবে বলে ফেলেছিলেন ‘বাহ্!’ বেলায়তে খাঁর এই বাহ্ শব্দটি শোনামাত্র পিতা ওস্তাদ এনায়েত খাঁ বেলায়েতকে কাছে ডেকে নিয়ে সপাটে থাপ্পড় খসিয়ে দিয়েছেন গালে! বেয়াদব! ওস্তাদজীর গানের প্রশংসা করার মতো স্পর্ধা হয়েছে তোমার!

আমরা প্রশংসা করে সেই স্পর্ধা নাইবা দেখালাম। কিন্তু মাথার উপরে যে দায়িত্বটি উদীচী কানাডা, মহীতোষ তালুকদার তাপস, ইত্তেলা আলী, মিঠুন রেজার টিমের মাধ্যমে এই টরন্টোবাসী সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীদের অর্পণ করেছেন অত্যুচ্চ শিল্পের চর্চা ও প্রকাশের জন্য, তা এগিয়ে নেওয়ার শপথ দুইদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কর্মীরা নীরবে নিয়ে নিয়েছেন বলে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি।

আজ বাঙালি বলে আমার বড় গর্ব হয়। প্রতি মুহূর্তে ভাবতে ভালো লাগে – রবীন্দ্রনাথ আমাদের সঙ্গে আছেন। ভাবতে ভালো লাগে আমি এই শহরে বসবাস করি। ভাবতে ভালো লাগে নন্দিনীকে মঞ্চে দেখাতে চাইলে মিঠুন রেজার পাশে শায়লা শবনম তনুকা আছেন এই শহরে। ভাবতে ভালো লাগে – একজন মাহমুদুল ইসলাম সেলিম এখন আমাদেরই একজন। ইত্তেলা আলী কি করেছেন – মায়ার খেলার যাদুমঞ্চে! আমাদেরকে অবাক করে দিয়েছেন। অসাধারণ হয়েছে ছোট্ট সোনামণিদের স্বপ্ন দেখার মতো পরিবেশনা। কী পোশাক, কী লাইট, কী সঙ্গীতায়োজন! অসাধারণ।
অভিনন্দন ও অভিবাদন সুমন সাইয়েদ ও মিঠুন রেজার নেতৃত্বে উদীচী কানাডার সবাইকে।

[ আকাশে যে মেঘ ছিল এতোদিন
আজ কেন সে হলো স্বপ্ন রঙ্গীন ]

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles