21.7 C
Toronto
মঙ্গলবার, জুলাই ১৬, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : পাঁচ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : পাঁচ
তাসরীনা শিখা

রাজ্জাক ভাইদের এতদিন পর দেখে আমাদের দুই পরিবারের আনন্দের শেষ নেই। উনারা আমার দশ মাসের মেয়েটাকে এই প্রথম দেখলেন। রাজ্জাক ভাই বার বার আমার স্বামীকে অনুরোধ করতে লাগলেন আরও কিছুদিন কুয়েত থেকে একটা জব নিতে। সে নাকি অনেক ভালো চাকুরী পাবে এখানে। এখানে সব রকম সুযোগ সুবিধা আছে চাকুরীতে । আমার স্বামী একটু চিন্তা ভাবনা করে আর রাজ্জাক ভাইয়ের উৎসাহে একটা চাকুরিতে ইন্টারভিও দিতে গেলেন। আশ্চর্য জনক ভাবে চাকুরীটা হয়ে গেলো KISAR e যার পুরো নাম Kuwait institute of scientific research. অত্যান্ত আকর্ষিণীও চাকুরি। বড় মাপের বেতন, ফ্রি পুরো ফার্নিচার দিয়ে সাজানো বাড়ী । প্রতি বছর দেশে যাবার টিকেট দেবে সপরিবারে, বাচ্চাদের আমেরিকান বা ব্রিটিশ স্কুলে পড়ার খরচ সব অফিস থেকে দেয়া হবে। পরের দিন ই বাসার চাবি দিয়ে দেয়া হোল । আমরা দেশে যাবার সিধান্তটা বদলে আপাতত কুয়েত থাকার সিধান্তটা নিয়ে ফেললাম। আবার নতুন সংসার। টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র কিনে বাসায় উঠে গেলাম। মন্জু ভাবী দু তিন দিনের রান্না করে সাথে দিয়ে দিলেন এবং আমাদের উনাদের গাড়ি করে বাসায় পৌঁছে দিলেন।

বাসা দেখে মনটা ভালো হয়ে গেলো । এটা অফিসের কম্পাউন্ড । kisare er উঁচু লেবেলের কর্ম কর্তারা এই বিল্ডিং এ থাকেন পরিবার নিয়ে। এরকম বেশ কিছু বিল্ডিং ছিলো এই ইনষ্টটিউটের । একেক লেবেলের একেক ধরনের বিল্ডিং। অফিস থেকে তাদের নিয়ম অনুযায়ী টাকা দেয়া হোল আমাদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ফার্নিচার কিনে নেবার জন্য। আমরাও মনের আনন্দে নিজেদের পছন্দ মতো ফার্নিচার , কিনলাম বাড়ীতে নতুন পর্দা লাগালাম, নতুন কার্পেট লাগালাম সব কিছু ম্যাচ করে। খুব ভালো লাগছিলো বিয়ের পর এই প্রথম নিজের পছন্দ মতো বাড়ী সাজালাম। মনে হচ্ছিল এযেনো আমাদের নিজেদের বাড়ী ।

- Advertisement -

কুয়েতে কোন কিছুরই অভাব ছিলো না। বাংলাদেশী দোকান , বাংলাদেশী মাছ, শাক সবজী , পত্রিকা, ম্যাগাজিন বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট সবই ছিলো কুয়েতে। ইরাক থেকে এসে আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা বাংলাদেশেই চলে এসেছি । তবে অনেক ধনী বাংলাদেশ। যে দেশে কোন দারিদ্রতা নেই। কুয়েতে ছিলো প্রচুর বাংলাদেশীদের বসবাস। নানা ধরনের কাজে নিযুক্ত বাঙালি। অনেকে এসেছিলো খুব সাধারন কাজ নিয়ে দেশে টাকা পাঠিয়ে পরিবারকে সচ্ছল রাখার জন্য। তাদের জীবনটা খুব বেশী সুখের ছিলো না। অনেকটা পরিশ্রম করে তাদের টাকা উপার্জন করতে হতো । তবে তাদের থাকার ব্যবস্থা সে কোম্পানিরাই করতো যারা এই কাজে তাদের নিযুক্ত করে এনেছে । একেকটা বাড়ীতে বেশ কয়েকজন করে থাকতো ।এতে করে তাদের মানুষিক অবস্থা কিছু ভালো থাকতো । কারন একে অপরের কাছে তাদের অনুভুতি দুঃখ কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারতো । স্ত্রী সংসার দেশে রেখে এসে কাজ করা। অনেক কষ্টের ব্যাপার ছিলো । তাদের পরিবার আনার মতো সামর্থ্য বা অনুমতি কিছুই ছিলো না।

তবে প্রফেসনাল বাঙালীরা মোটা মোটি ভালভাবে জীবন যাপন করতেন। সেখানে একটা বড় ধরনের এলাকা ছিলো । সেখানে প্রচুর বাঙালীর বসবাস ছিলো । একই বিল্ডিং এ , একেক এপার্টমেন্ট একেক ফ্যামিলি এমন অনেক ছিলো আবার একই এলাকাতে অনেকে ছিলেন বলে দিনের বেলা মহিলারা হেটে হেটে এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়াতে যেতে পারতেন। কুয়েতে নাচ গান কবিতা শিল্পীদের কোন অভাব ছিলো না। এখানে স্বাধীনতা দিবস , পহেলা বৈশাখ , বিজয় দিবস, বসন্ত উৎসব সব কিছু হতো । তাছাড়া বড় হল ভাড়া করে অনেক বড় বড় নাটকও হতো ।

যদিও আমরা বাঙালীদের এলাকা থেকে অনেকটা দূরে থাকতাম। যারা অফিসের বাসায় থাকতেন তাদের বাড়ী গুলো কিছুটা দুরেই ছিলো । যার ফলে আমরা সবাইকে সে ভাবে চিনতাম না। তবে অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব ছিলো । আমরা কিছুদিনের মধ্যেই শ্রীলংকা থেকে এজেন্সির মাধ্যমে কাজের মহিলা আনিয়ে নিয়েছিলাম। আর গাড়ি সেতো আসার সাথে সাথেই কেনা হয়েছিলো । আমাদের জীবনের ধারাটাই বদলে গিয়েছিলো যেমন আমারা চেয়েছিলাম । কুয়েতে বাংলাদেশী দুতাবাস ছিলো । রাষ্টদুত , কাউন্সেলার এর পরিবারদের সাথে ছিলো আমাদের প্রচুর বন্ধুত্ব । তাছাড়া আমাদের আরও বেশ কিছু পরিবারের সাথে অনেক ঘনিষ্টতা হয়ে গিয়েছিলো । জীবনটা বেশ আনন্দ ময় হয়ে গেলো ।

মহিলাদের আকর্ষণীয় ব্যপার সেখানে প্রচুর শাড়ীর দোকানও ছিলো সাথে সেলোয়ার কামিজের ও আমাদের উপমহাদেশের সব রকম জিনিষের দোকানই ছিলো অনেক। মোটা মুটি সব ধরনের পণ্যই পাওয়া যেতো কুয়েতে। । শাড়ী গহনা আরো কতো রকমের জিনিসের সমারোহ এই ছোট ঝলমলে দেশটিতে ।

আমাদের বাসাটা এমন জায়গাতে ছিলো যে রাস্তা পেরুলেই কুয়েতের উপ সাগর ছিলো । সন্ধ্যার পরে তাপমাত্রা অনেকটা কমে গেলে আমরা দুজন হাঁটতে যেতাম সাগরের তীরে । এখানে এসে আমি জীবনের ধারাটা বদলে ফেললাম। আমাদের বাসার নীচেই ছিলো সুমিং পুল। সেখানে নিয়মিত সাঁতার কাটতাম । জিমে যেতাম , পার্লারে যেতাম নিজের সুন্দয্য টিকিয়ে রাখার জন্য।

আমরা মাঝে মাঝে উপ সাগরে চলে যেতাম মাছ ধরার জন্য। আমাদের বরেরা মাছ ধরতো আর আমরা তীরে বসে চা নাস্তা খেতাম বরদের সাপ্লাই দিতাম। সেটা ছিলো একটা মহা আনন্দের ব্যাপার আমাদের জন্য। তারপর সে তাজা মাছ তক্ষনি বাসায় এনে কাটা কুটি করা হতো সে ব্যাপারে আমাদের অসুবিধে হতো না। যেহেতু আমাদের যারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো তাদের সবারই কাজের লোক ছিলো , তারপর সে মাছ রান্না করে মহা হৈ চৈ করে মজা করে দেশের মতো ভাত খেতাম। এভাবে জীবনটা বেশ আনন্দেই কেটে যেতে লাগলো । ওখানে বাংলাদেশের মতো যে কোন দিন বন্ধুদের বাসায় বন্ধুরা বেড়াতে যেতো । এ জিনিষ গুলো আমাদের পক্ষে করা সম্ভব ছিলো না। কারন আমাদের বাচ্চা ছোট , ওকে সময় মতো ব্যাডে দেবার ব্যাপার ছিলো । দশটায় আমাদের ঘরের বাতি নিভে যেতো । উয়েক এন্ড ছাড়া তেমন বিশেষ কিছু না হলে দূরে বেড়াতে যেতাম না।

সময় দ্রুত গড়িয়ে চলতে লাগলো । দেখতে দেখতে এক বছর পেরিয়ে গেলো কুয়েতে। আমার মেয়ের বয়েসও দু বছর হয়ে গেলো । আমার ভাই বোন থাকে আমেরিকাতে। আমরা পরিকল্পনা করলাম এবার ছুটিতে ভাই বোনের ওখানে বেড়াতে যাবো । বাংলাদেশ থেকে আমার বাবা মা ও আসছেন। আমরা ভাই বোনরা আব্বা আম্মা ক্যনিটিকাট আমার বড় বোনের বাসায় মিলিত হলাম। সেখানে খুব আনন্দের পারিবারিক মিলন মেলা হোল আমাদের। সেখান থেকে আমরা লস এঞ্জেলেস গেলাম” ডিজনি ওয়ার্ল্ড” বেড়াতে সবাই মিলে এবং আসে পাসের দর্শনীও স্থান দেখে রাতে ফিরতাম হোটেলে। আব্বা আম্মা খুব আনন্দ পেয়েছিলেন ছেলে মেয়ে আর ছোট ছোট নাতনীদের নিয়ে বেড়াতে পেরে । অনেক ঘুরা ঘুরি করে ফিরে এসে আমরা দুজন আমাদের মেয়েকে নিয়ে চলে গিয়েছিলাম নাইগ্রা ফল দেখতে। নাইগ্রা ফল দেখে আমরা এতোই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, মন খারাপ করে বলছিলাম ইস আমরা হানিমুনে কেনো এখানে আসলাম না। যদিও আমাদের এই দুঃখ টা ছিলো একেবারেই অবাস্তব। কারন তখন আমাদের এদিকে আসার কোন রকম পরিকল্পনাই ছিলো না। যাই হোল একমাস বাবা মা ভাই বোনের সাথে থেকে একসাথে ঈদ করে সবার জন্য অনেক মন খারাপ করে কুয়েত ফিরে আসলাম।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles