14.1 C
Toronto
বুধবার, মে ২৯, ২০২৪

ভাড়ায় যুদ্ধ করা যাদের পেশা, অতীত থেকে বর্তমান

ভাড়ায় যুদ্ধ করা যাদের পেশা, অতীত থেকে বর্তমান

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে আলোচনার কেন্দ্রে ভাড়াটে সেনাগোষ্ঠী ওয়াগনার। এই গোষ্ঠীর সদস্যরা রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কেউ না হলেও ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

- Advertisement -

সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি থেকে শুরু করে ভাড়াটে খুনিরাও রয়েছেন ওয়াগনারে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারাও কাজ করেন এখানে। ইউক্রেনে ওয়াগনার গ্রুপের কয়েক হাজার সৈন্য যুদ্ধরত।

মূলত, ওয়াগনার গ্রুপের সদস্যরা ভাড়াটে যোদ্ধা, যাদের মার্সেনারি বলা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এদের ব্যবহার করেন। রাশিয়ার বেসরকারি সেনার ভূমিকা পালন করেন এই মার্সেনারিরা।

কিন্তু গত মাসে হঠাৎ করেই ওয়াগনার গ্রুপ ইউটার্ন নেয়। পুতিনের হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আপত্তি জানায় গ্রুপটি।

সম্প্রতি ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিপক্ষে লড়াইয়ে রুশ সেনাদের সমর্থন ফিরিয়ে নেয় ওয়াগনার গ্রুপ, যে কারণে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয় ভাড়াটে আধাসামরিক বাহিনীটির। এক পর্যায়ে ওয়াগনার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা ইয়েভজেনি প্রিগোজিন সশস্ত্র বিদ্রোহ করে বসেন। তবে তার এই বিদ্রোহ ২৪ ঘণ্টা না যেতেই শেষ হয়ে যায়।

এরপর পুতিনের সঙ্গে ওয়াগনার গ্রুপের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

রাশিয়ায় সশস্ত্র বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া ওয়াগনার প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন এখন কোথায় আছেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর দাবি, প্রিগোজিন বর্তমানে রাশিয়াতেই অবস্থান করছেন। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো কিছু বলা হচ্ছে না।

শুধু রাশিয়া-ইউক্রেনই নয়; আলোচিত ওয়াগনার গ্রুপের ভাড়াটে যোদ্ধারা সিরিয়া, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।

ওয়াগনারই বিশ্বে একমাত্র ভাড়াটে সেনাগোষ্ঠী নয়। প্রাচীনকাল থেকেই ভাড়াটে বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়েছে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী বা দেশের প্রধানরা। বর্তমানেও ওয়াগনারের মতো বেশ কয়েকটি ভাড়াটে যোদ্ধা সংগঠন রয়েছে।

অর্থের বিনিময়ে কোনো সংঘাতে একটি পক্ষের হয়ে লড়াই করে তারা। ভাড়াটে যোদ্ধারা সারা বিশ্বে যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছে। তাদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছেই। আর এ কারণেই ভাড়াটে যোদ্ধা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও তৈরি হয়েছে একাধিক।

ভাড়াটে যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকায় ২০২১ সালেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক সংগঠনটি তখন বলেছিল, ভাড়াটে সেনা এবং নিরাপত্তা কোম্পানির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞ শন ম্যাকফেট তার বিখ্যাত বই ‘দ্য মডার্ন মার্সেনারি: প্রাইভেট আর্মিস অ্যান্ড হোয়াট দে মিন ফর ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এ বলছেন, ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বিশ্বে নিরাপত্তা ঠিকাদারের সংখ্যা আগের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে।

আধুনিক ভাড়াটে যোদ্ধাদের যাত্রা শুরু ব্রিটিশদের হাত ধরে। ১৯৬৫ সালে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একদল সাবেক কর্মকর্তা গড়ে তোলেন ওয়াচগার্ড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

ওয়াগনার গ্রুপ ছাড়াও বর্তমানে বিশ্বের শক্তিশালী মার্সেনারি গ্রুপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সিকিউরিটি জায়ান্ট জিফোরএস, এরিনিস ইন্টারন্যাশনাল, এশিয়া সিকিউরিটি গ্রুপ, ট্রিপল ক্যানোপি, ইজিস ডিফেন্স সার্ভিসেস, ডেফিওন ইন্টারনাসিওনালে ও একাডেমি।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক শাসকই তাদের নিয়মিত সৈনিকদের বাইরেও ভাড়াটে যোদ্ধাদের ব্যবহার করতেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জেনোফোনের বই ‘আনাব্যাসিস: দ্য মার্চ অব দ্য টেন থাউজেন্ড’-এ একটি ভাড়াটে বাহিনীর কথা জানা যায়। প্রায় দশ হাজার গ্রিক যোদ্ধা নিয়ে বাহিনীটি গঠিত হয়েছিল। এই যোদ্ধাদের ক্ষমতা দখল করতে চাওয়া সাইরাস দ্য ইয়ংগার নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তার ভাই রাজা দ্বিতীয় আর্টক্সারক্সেসকে পারস্যের সিংহাসন থেকে বিতাড়িত করা।

ইতিহাসে কুখ্যাত মার্সেনারি বাহিনী হিসেবে পরিচিত ‘দ্য হোয়াইট কোম্পানি’। এই বাহিনী ১৪ শতকে ইতালির বেশিরভাগ যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৩৬০ এর দিকে বাহিনীটি সর্বপ্রথম পরিচিতি লাভ করে। পরে স্যার জন হকউড নামের এক ইংরেজ বাহিনীটির কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ‘দ্য হানড্রেড ইয়ারস’ যুদ্ধে নাইট উপাধিতে ভূষিত হন।

২১ শতকের যুদ্ধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পিটার ওয়ারেন সিঙ্গার তার ‘করপোরেট ওয়ারিয়র্স: দ্য রাইজ অব দ্য প্রাইভেটাইজড মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি’ বইয়ে লিখেছেন, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর রাষ্ট্রের সুমেরীয় রাজা শুলঘি (খ্রিস্টপূর্ব ২০৯৪-২০৪৭) ভাড়াটে সৈন্যদের কাজে লাগান। পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের বিখ্যাত সুইস গার্ড বাহিনীতেও ছিল ভাড়াটে সৈন্য। সে সময় ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের ডাক আসত, যেহেতু তারা যুদ্ধে যথেষ্ট পারদর্শী ছিল।

এভাবে বিশ্বজুড়ে পেশাদার, ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে সুইস গার্ড বাহিনীর সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ইউরোপের রেনেসাঁ যুগে তারা খ্যাতির শিখরে পৌঁছায়। সুইস মার্সেনারিরা বিভিন্ন রাজকীয় বাহিনীতে সৈনিক ও গার্ড হিসেবে কাজ করত। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- ডাচ, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ ও ব্রিটিশ রাজকীয় সেনাবাহিনী। বর্তমানে ভ্যাটিকান সিটিতে পোপের সঙ্গে ডোরাকাটা-ইউনিফর্মধারী রক্ষক হিসেবে যাদের দেখা যায়, তারাই একসময়ের ‘দ্য সুইস গার্ড’।

যুক্তরাষ্টের ভলান্টিয়ার গ্রুপ নামে পরিচিত ‘দ্য ফ্লাইং টাইগার্স’ ছিল ফাইটার পাইলটদের একটি মার্সেনারি বাহিনী। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছিল।

১৩০২ সালে অভিযাত্রী রজার ডি ফ্লোর ‘কাতালান গ্র্যান্ড কোম্পানি’ নামে মার্সেনারি বাহিনীটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার সৈন্যের শক্তিশালী কাতালান কোম্পানি তুর্কিদের কনস্টান্টিনোপল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সফল হয়েছিল। এরা ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রিসের বিশাল অংশে শাসন করেছিল। এরপর ফ্লোরেন্সের একটি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের শাসনামলের পতন ঘটে।

‘দ্য ভারাঙ্গিয়ান গার্ড’ ছিল নর্সেম্যানদের বংশধর যারা মূলত জলদস্যু এবং ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করতেন। এরা ছিল মূলত একটি মার্সেনারি ভাইকিং দল যারা বাইজেন্টাইন সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

শুরুর দিকে, ভারাঙ্গিয়ান গার্ড ভাইকিংদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। তবে ১১ শতকের শেষের দিকে বাহিনীটিতে ইংরেজ, নরম্যান এবং ডেনিসরাও যুক্ত হতে থাকে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে এভাবেই ভাড়াটে যোদ্ধাদের ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখনও বিভিন্ন স্বার্থে ভাড়াটে যোদ্ধাদের রণক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যার সুস্পষ্ট উদাহরণ ওয়াগনার।

সূত্র : বাংলানিউজ

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles