-2.2 C
Toronto
সোমবার, জানুয়ারী ৩০, ২০২৩

রাজধানীতে ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে রামিসার নেতৃত্বে ভয়ঙ্কর রেপ ড্রাগ চক্র

রাজধানীতে ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে রামিসার নেতৃত্বে ভয়ঙ্কর রেপ ড্রাগ চক্র

মাত্র ১৯ বছরের সুন্দরী তরুণী। নাম ইডেন ডি সিলভা ওরফে রামিসা শিমরান। অনেকে তাকে ইয়াবা সুন্দরী নামেও ডেকে থাকেন। ভার্চুয়াল জগতে তার ইয়াবা সেবনের ছবিও রয়েছে। এই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান গুলশান থানা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর এক এক করে বেরিয়ে আসছে তার নেতৃত্বের এক ভয়ঙ্কর ড্রাগচক্রের কেচ্ছা-কাহিনী। তিনি থাকেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। আড্ডা দেন গুলশান অভিজাত পাড়ায়। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে বিভিন্ন সময় তাদের থেকে নানা সুবিধা নিয়ে থাকেন। সুযোগ পেলে ব্ল্যাকমেইলও করেন।

- Advertisement -

গত ৭ থেকে ৯ ডিসেম্বর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চার দফা অভিযান চালিয়ে চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের একসময়ের সহযোগী রাসেল ওরফে ভাইস্তা রাসেল এবং তাঁর বান্ধবী রামিছা শিমরানও রয়েছেন। রামিসাকে অভিজাত এলাকার মাদকসেবী ও এই কারবারে জড়িত ব্যক্তিরা ইডেন ডি সিলভা নামে চেনেন। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন রুবায়েত আলী, নাসিম ইকবাল (অপু), সৈয়দ নওশাদ, আলভী জাবরান, প্রিন্স রহমান ও সাদী রহমান। ঢাকার ভাটারা, মোহাম্মদপুর, বনানী ও তেজগাঁও থানায় এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছেন ডিএনসির ঢাকা উত্তর অঞ্চলের কর্মকর্তারা।

কারও বাবা ব্যবসায়ী, কেউ সরকারি কর্মকর্তার সন্তান। ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরায় তাঁদের বসবাস। উচ্চশিক্ষার জন্য কেউ যুক্তরাজ্য, কেউ মালয়েশিয়া, কেউ গিয়েছিলেন ভারতে। বিদেশে থাকাকালে চিনেছেন অপ্রচলিত বিভিন্ন মাদক, কেউ কেউ তা তৈরি করার কৌশলও রপ্ত করেছেন। দেশে ফিরে এসব মাদক সেবন ও তা বিক্রির চক্র গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা।

এই চক্রের আটজনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলেছেন, চক্রের সদস্যরা ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিভিন্ন ‘পার্টিতে’ মাদক সরবরাহ করে আসছিলেন। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের কাছেই তাঁরা মাদক পৌঁছে দিতেন। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘অপ্রচলিত’ বিভিন্ন মাদক দেশে এনে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। শক্তিশালী মাদক ক্রিস্টাল মেথ ও আইসের পাশাপাশি কিছু দিন ধরে তাঁরা আরও ভয়ংকর নতুন একটি মাদক সরবরাহ করছিলেন। অস্ত্রোপচারের আগে রোগীকে ইঞ্জেকশন হিসেবে চেতনানাশক কেটামিন দেওয়া হয়, সেটাকে মাদকে রূপান্তর করে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন তাঁরা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই মাদক ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। সেখানে এটি ‘পার্টি ড্রাগ’ বা ‘ডেট রেপ ড্রাগ’ নামে পরিচিত। এই মাদক দেশের মাদকসেবীরা গ্রহণ করছেন, এমন তথ্য তাঁদের কাছে ছিল না। নওশাদকে গ্রেপ্তারের পর অভিজাত এলাকার বিভিন্ন পার্টিতে এই মাদক ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার এই আটজনের মধ্যে তিনজন উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েন। রুবায়েত আলী উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর যুক্তরাজ্যে লেখাপড়া করতে যান। ২০১১ সালে তিনি দেশে ফিরে মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বাবা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারি করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বনানীতে তাঁদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। সৈয়দ নওশাদের বাবা একজন ব্যবসায়ী। তাঁদের বাসাও বনানীতে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর নওশাদ উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়ায় যান। তবে তিনি লেখাপড়া শেষ না করেই ২০০৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। নাসিম ইকবালের বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।

গ্রেপ্তার রামিসা শিমরানের বিষয়ে কর্মকর্তারা জানান, রামিসার বাবা চট্টগ্রামের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তিনি কয়েক বছর আগে ভারতে লেখাপড়া করতে গিয়েছিলেন। তবে লেখাপড়া শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন এবং মাদক চক্রে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন পার্টিতে মাদক সরবরাহ করতে গিয়েই সুব্রত বাইনের এক সময়ের সহযোগী ভাইস্তা রাসেলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

ডিএনসির ঢাকা উত্তর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, এই চক্রের সদস্যরা মুঠোফোন নম্বর দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন না। তাঁরা যোগাযোগের জন্য টেলিগ্রামের মতো বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করেন।

ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, চক্রের সদস্যরা আগে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা এনে ঢাকার অভিজাত এলাকার পার্টিতে সরবরাহ করতেন। তবে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা ইয়াবার পাশাপাশি অপ্রচলিত মাদক আইস নিয়ে আসছেন। আইস হচ্ছে ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল। ৫০০ গ্রাম আইস থেকে ১ লাখ ইয়াবা তৈরি করা যায়। এটি সেবনে ইয়াবার চেয়ে ১০ গুণ প্রতিক্রিয়া হয়। এ কারণে দ্রুতই পার্টিগুলোতে এই মাদক ব্যাপকভাবে চলতে শুরু করে। এখন নতুন করে তাঁরা আরও ভয়ংকর একটি মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যেটা চেতনানাশক কেটামিনকে রূপান্তর করে তৈরি করা হয়।

ডিএনসির কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, গত ৭ ডিসেম্বর এই চক্রের অন্যতম মাদক কারবারি রামিসা ওরফে ইডেন ডি সিলভাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের গ্রেপ্তারের পরই জানা যায়, বিভিন্ন পার্টিতে তাঁরা আইসের পাশাপাশি নতুন ওই মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এটি তৈরি করছেন বনানীর যুবক সৈয়দ নওশাদ। তিনি বনানীর বাসায় নিজস্ব পদ্ধতিতে তরল কেটামিনকে মাদকে রূপান্তর করছিলেন। তাঁর কাছ থেকে গুঁড়া হিসেবে এই মাদক সংগ্রহ করছিলেন রামিছাসহ চক্রের সদস্যরা। ৮ ডিসেম্বর বনানীতে অভিযান চালিয়ে ২ গ্রাম কেটামিনসহ নওশাদকে গ্রেপ্তার করেন ডিএনসির কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে মেহেদী হাসান বলেন, অস্ত্রোপচারের আগে রোগীদের চেতনানাশক হিসেবে কেটামিন ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। তরল এই চেতনানাশকের সঙ্গে তিনি একাধিক রাসায়নিক মিশিয়ে ভয়ংকর মাদক তৈরি করতেন। বাসার একটি কক্ষকে ল্যাব বানিয়ে তিনি সেখানে এই মাদক তৈরি করতেন। গুঁড়া হিসেবে এই মাদক তিনি সহযোগীদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেন। এক গ্রাম গুঁড়া কেটামিন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছিলেন। মালয়েশিয়ায় লেখাপড়া করতে গিয়ে তরল কেটামিনকে মাদকে রূপান্তরের কৌশল রপ্ত করেছিলেন তিনি। এই মাদক পার্টিতে আসা তরুণীদের অজান্তে কোমল পানীয়ের সঙ্গে খাইয়ে দেওয়া হতো।

জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদক কারবারে
২০২১ সালের আগস্টে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে আইস ও ইয়াবাসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেন ডিএনসির ঢাকা উত্তর অঞ্চলের কর্মকর্তারা। ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ডিএনসির কর্মকর্তা মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, দেড় বছরেরও বেশি সময় আগে গ্রেপ্তার ১০ জনও এই মাদক চক্রের সদস্য। তাঁদের মধ্যে মোহায়মিনুল ইসলাম (ইভান) ও রুবাইয়াত আলী নামে দুজন ছিলেন। পরে তাঁরা জামিনে বেরিয়ে নতুন করে মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েন। নতুন করে গ্রেপ্তার আটজনের মধ্যে রুবাইয়াত রয়েছেন। আর গত জুলাইয়ে মোহায়মিনুলকে আবারও আইসসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এখন তিনি কারাগারে আছেন।

মেহেদী হাসান বলেন, ২০২১ সালের আগস্টে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাঁরাও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। ওই ১০ জনের মধ্যে তিনজন বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

সূত্র : আমাদের সময়

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles