10.6 C
Toronto
শনিবার, অক্টোবর ১৬, ২০২১

ভেরিয়েন্ট এখন প্রায় আশি শতাংশ জায়গা দখল করেছে

ভেরিয়েন্ট এখন প্রায় আশি শতাংশ জায়গা দখল করেছে

আজকে বাজারে যাওয়া ফরজ হয়ে গেছে। অন্তত সপ্তাহ খানেক যাতে আর না যাওয়া লাগে, এরকম একটা লিস্ট করে ফেললাম। কাল থেকে কাজ, তার ওপর করোনা রেকর্ড গড়ছে। ভয়াবহ অবস্থা। ভেরিয়েন্ট এখন প্রায় আশি শতাংশ জায়গা দখল করে ফেলেছে। ছোট-বড় কাউকে ছাড়ছে না। বাজারে যেতে সত্যি খুব ভয় লাগে।

বাইরে বৃষ্টি। আমার খুব প্রিয় আবহাওয়া। ‘নো ফ্রিলস’ দোকানে বড়সড় ট্রলি নিয়ে ঢুকে টপাটপ জিনিস তুলে ফেলি। কিছু জিনিস কখনোই শেষ হয় না, তবুও কিনতে ইচ্ছা করে। যেমন ধনিয়া পাতা, সেলেরি, বেগল। অর্ধেকের বেশি নষ্ট হবে জেনেও নিলাম। আর আমার গিন্নি ঘৃতকুমারী পাতা দেখলেই কিনবে। দশ পার্সেন্টও ব্যবহার করবে না। ওগুলা আসলে ফুলের মতো জিনিস; জাস্ট ফ্রিজে সাজিয়ে রেখে প্রতিদিন খুলে খুলে দেখা আর ভাবা; কী করা যায়। এসবের ভ্যালুও অবশ্য কম না।

বাচ্চাদের ম্যাপল সিরাপ শেষ হওয়ায় সেদিন অন্য ধরণের সিরাপ কিনেছিলাম আড়াই ডলার দিয়ে। পুরাটাই লস। বাচ্চারা চোখ রাঙিয়ে বলেছে, এটা ম্যাপল? ইদানিং তাদের এটার ওপর খুব ঝোক বেড়েছে; প্যান কেক-এ মুক্ত হস্তে ঢালবে। ম্যাপল গাছের বাকল ফুটো করলেই টপ টপ করে রস বেরোতে থাকে। অনেকটা খেজুরের রসের মতো পাতলা। তারপর জ্বাল দিয়ে বানানো হয় পাতলা ঝোলা গুড়ের মতো। আমিও মাঝে মাঝে চামচে করে এমনি এমনি খাই। পনেরো ডলার দিয়ে এক লিটার নিলাম, অনেকদিন যাওয়ার কথা।

বেছে সুন্দর এক ছড়ি কলা নিতেই এক কানাডিয়ান বৃদ্ধ ভদ্রলোক পাশ থেকে দাঁত বের করে বলল, তুমি দেখি সবচাইতে সুন্দর কলা নিয়ে ফেললে! আমি ঠিক ওরকমই খুঁজছিলাম!

– আপনি চাইলে এটা নিতে পারেন

– ধুর.. এদেশের সব কলাই এক। দিনটা উপভোগ করো আর সাবধানে থেকো!

– তুমিও!

কিঞ্চিৎ সন্দেহ হলো। আমি কি বেশি বাছা-বাছি করছিলাম? সেটা দেখেই লোকটা আমাকে বিব্রত করলো? এদেশের বৃদ্ধ/বৃদ্ধা মানুষগুলো সুপার রসিক। এশিয়ানরা খুব বেশি রস হজম করতে পারে না। আমি যদিও রসিকতা করি, কিন্তু সেটারও নিশ্চয়ই সীমাবদ্ধতা আছে? সেদিন গেলাম ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে, গাড়ি সারতে ক্যাশ লাগবে। ব্যাংকের বাইরে এক ভ্দ্রলোক দাঁড়ানো দেখে মনে হলো লাইনে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এটিএম এর লাইনে?

– না, তুমি ঢোকো। টাকা তুলে আমাকে কিছু দিয়ো তো?

আমি তার আপাদমস্তক নজর বুলাতে থাকি। ফকির কি না বুঝবার চেষ্টা করছিলাম। এদেশে ব্যাংক, সাবওয়ে, শপিং মলের সামনে ফকির থাকে। টাকা চায় কফি খাবার নাম করে। ভদ্রলোককে দেখে আমি খুব কনফিউজড। দুইটা ডলার দিতে গেলে যদি বেইজ্জতী হই? আমি কাষ্ঠ হেসে কেটে পড়তেই এক ব্যাংক কর্মী এসে তাকে ডেকে ভেতরে ঢোকালো।

ফকির না। এমনি ফাজলামি করলো।

আরেকদিন পড়েছিলাম মহা বিব্রতকর রসিকতার ফাঁদে। এক কপোলের সাথে কথা হচ্ছিলো। দুজনেই সেভেন্টি ফাইভ প্লাস। স্বামী স্ত্রী কি না বোঝা মুশকিল। আমার ধারণা বৃদ্ধ বয়সে এরা আরো বেশি সঙ্গী পাল্টায়। বৃদ্ধ ভদ্রলোক এগিয়ে যেতেই বৃদ্ধা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “জানো হানি, ওর ইয়েটা না এট্টুক!”- বলে তার কেনি আঙুলের অর্ধেকটা মেপে দেখিয়ে খিক খিক করে হাসলো। আমি দুইশ বিশ ভোল্টের ইলেকট্রিক শক খেয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে হজম করতে থাকি…

আশেপাশে বড় পাকিস্তানী কমিউনিটি থাকায় এই দোকানে বড় হালাল কাউন্টার আছে। পাঁচ টাকা করে পাউন্ড ভেড়ার মাংস পেয়ে গেলাম। সস্তাই বলতে হবে। প্যাকেটজাত মাছ মাংসের ওপর এখন ভরসা বেশি, খোলা মাংসে করোনার ভয়। মরগীর গিলা’ও নিলাম দুই পাউন্ড, যদিও খোলা। আর এক পাউন্ড ভেড়ার কিডনি। যদিও লিস্ট এর বাইরে…

রোজা শুরু হচ্ছে। সারা টরন্টো শহর রূহ-আফজা, খেজুরে টইটম্বুর। বাসায় আগের বছরের রূহ-আফজা এখনো অর্ধেকের বেশি আছে। ইফতারির জন্য হানি ডিউ আর তরমুজ নিয়ে রাখলাম। মিডিয়াম সাইজের হন্ডুরাসের তরমুজ সাত ডলার। কানাডিয়ানগুলা আমার বেশি পছন্দ। তবে বাংলাদেশের মতো মজার তরমুজ মনে হয় না বিশ্বে আর কোথাও আছে।

দোকানের কর্মীগুলো অনবরত সদাই এনে এনে সাজিয়ে রাখছে। ম্যানেজার দেখে যাচ্ছে ঠিক আছে কী না। এই মানুষগুলো প্রচন্ড গতি নিয়ে কাজ করে, সময়ের অনেক দাম। অনবরত ভারী জিনিসপত্র সাজানো চাট্টিখানি কথা না। আমার খুব ইচ্ছা করে শনি কিংবা রবিবারে ছুটির দিনে একদিন এরকম একটা পার্ট টাইম কাজ করতে। মাত্র এক দিন হয়তো দেবে না। দেখা যাবে ভারী উঠাতে গিয়ে মাজায় ব্যাথা। কাজটা খুব সহজ না। এরাও ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার। মানুষের অপরিহার্য জিনিসপত্রের যোগান দেয় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে।

বের হবার সময় দরজার কাছ থেকে কিছু ডিসিনফেক্ট্যান্ড ওয়াইপার ছিঁড়ে নিয়ে গাড়ির কাছে গিয়ে মুছে মুছে জিনিসপত্র তুলতে থাকি। যদিও এভাবে করোনা ছড়ানোর সম্ভাবনা কম, তবুও কোনো সুযোগই দিতে চাই না। মন মানে না। সত্যি আর ভালো লাগে না! এইভাবে আর কতদিন? কঠিন বাস্তবতা! নিজের অজান্তেই খুব অস্বাভাবিক হয়ে গেছি।

আচ্ছা, মানুষ শুধু দুঃখ কষ্টকেই কেন বাস্তবতা বলে? সুখ, আনন্দ, রসিকতা, ভালোলাগা সবই তো বাস্তবতার মধ্যেই পড়ে।

এ জগতে অবাস্তব বলে কিছু কি আছে? আমার কাছে জীবনের আনন্দটুকুই যেন বেশি বাস্তবতা।

- Advertisement - Visit the MDN site

Related Articles

- Advertisement - Visit the MDN site

Latest Articles