4.9 C
Toronto
মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৬, ২০২১

রেড স্যালুট টু ইউ কমরেড

চে’ গুয়েভারা

জানুয়ারীর রৌদ্রস্নাত সকালে হাভানার পার্ক সেন্ট্রাল হোটেল থেকে বেরিয়ে টেক্সিওয়ালাকে যখন বল্লাম, চে’ গুয়েভারার বাড়িতে যাবো, শুনে ভাঙা ইংরেজিতে আমাকে যা বুঝাতে চাইলেন কিংবা আমি যতটুকু বুঝলাম তা হল, ওখানে যেতে হলে টানেল দিয়ে যেতে হবে এবং আমি রাজি আছি কিনা। আলবৎ রাজি, জানতে চাইলাম, কেন কোনও অসুবিধা আছে? টেক্সিওয়ালা বললেন, মাঝেমাঝে অই টানেল বন্ধ থাকে। আমরা বাঙালি, তার উপর বাড়ি বরিশাল, দমিবার পাত্র নই মোটে, বল্লাম, যাবো। ওকে আমিগো। চব্বিশ কিলোমিটার পথ, যেতে তেত্রিশ মিনিট। কিছুদূর এসেই টানেল, নদীর তলদেশে। ভিড়বাট্টা নেই। টানেলের ভিতর আলোর স্বল্পতা চোখে পড়ার মতো। মাথার উপর নদীর স্রোত, একটু গা ছমছমভাব হয় যাবার পথে, ফেরার পথে মনে হ’ল, এপথ যেন কতো কালের চেনা।

যার পায়ে এখনো মফস্বলের কাদা লেগে আছেÑ ভাবতেই পারি না সেই আমি, অবশেষে দাঁড়িয়ে আছি চে’গুয়েভারার বাড়ির সামনে, স্বপ্নের একটি দৃশ্যচিত্র যেন, দেয়ালে লাল হলুদের খেলা ও সোনালী আলোয় ভরা দিন আর উপকুলীয় বাতাস ‘চে’ নামের বাড়িটিকে বড় আপন করে তুলেছে। যেন বিলাসের যক্ষা নিরাময় আশ্রয়স্থল ‘গোলাপ সুন্দরী’র স্বাস্থ্যকর সেই স্যানাটোরিয়াম অতল গহবর থেকে উঁকি দেয় সহসা, এবং যথেষ্ট খোলামেলা ও আকাশে মেঘ নেই বলে আলো এখানে প্রভূত বিস্তৃত, ফলে বাড়িটির প্রবেশ মুখে লাল হরফে ‘চে’ লেখাটি দীপ্র হয়ে দেখাচ্ছে যেন আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধা। আর অনতিদূরে কংক্রিটে নির্মিত সেন্ট চার্লস এর বিশাল ভাস্কর্য, যিশু খৃীষ্টের মতো দেখতে অনেকটা এবং প্রকৃতপক্ষে তিনিই যিশু কিনা কেউ বলতে পারলো না, কেতাব হাতে তাকিয়ে আছেন সমুদ্রের দিকে। তাঁর পোষাক ধবধবে সাদা।

চে’ নামের বাড়িটিও একবারে সাদামাটা, কোনও আদিখ্যেতা নেই, ছিমছাম, একতলা। খোলা ছাঁদ, যেখান থেকে দেখা যায় অবারিত আকাশ আর অনতিদূরের হাভানা; শোনা যায় সমুদ্রের গর্জন। একতলার ছাঁদে একটি চিলে কোঠা আছে। কেয়ারটেকার মহিলাদের একজন জানালেন, ‘ওখানে কেউ থাকে না। নিয়ম নেই’। সর্বসাকুল্যে পাঁচ-ছ’টি কক্ষ মাত্র, সযত্নে সাজানো। ছোটো ছোটো। চে’র দৈনন্দিন ব্যবহৃত তৈজসপত্র, পাইপ, কফি বানানোর ছোট্ট পট সাজানো দুটো শোকেসে। যে কক্ষটিকে শোবার ঘর বলে সনাক্ত করা যায় সেখানে একটি খাট, ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা। আছে খাবার প্লেট, রেডিও, ও একটি টাইপ রাইটার। কিউবান পতাকা, টেবল চেয়ার আর কালো রঙের ফোন নিয়ে ছোট্ট অফিস কক্ষ, এই বাড়িতে থাকাকালিন সময়ে কমরেড চে’ এখানে বসেই অফিস করতেন। এই কক্ষটির দেয়ালে রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল কেস্ত্রোর সঙ্গে আলাপরত চে’র সাদাকালো একটি ছবি।

রোগের কাছে পরাভুত হবার মতো মানুষ ছিলেন না তিনি। মধ্যরাত পর্যন্ত অফিস করতেন, পাশের কক্ষটি অপেক্ষাকৃত বড় আকারের, চে’ এই কক্ষে নিয়মিত সভা করতেন সহযোদ্ধাদের নিয়ে। কক্ষটিতে জনা পঞ্চাশেক লোক বসতে পারে। চেয়ারগুলো এখনো অইভাবে সাজানো রয়েছে। দেখে মনে হ’ল, এইমাত্র সভা করে চলে গেছেন প্রিয় কমরেড।

রাজধানী হাভানার হাতের নাগালের ভেতরেই লা’ কাবানায় [ আসল নাম : ফোর্ট অব সেন্ট চার্লস ] সমুদ্র উপকুলীয় টারারা নামের ক্ষুদ্র শহরে এই বাড়িটি। স্বৈরশাসক জেনারেল বাতিস্তার আমলে অভিজাতদের দখলে ছিল পুরো এলাকা, তখন এই বাড়িটিতে থাকতেন কাষ্টম্সের এক কর্মকর্তা। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারী মাসে ইতিহাসের মহানায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও চে’ গুয়েভারার নেতৃত্বে কিউবান বিপ্লবীরা লা’ কাবানা দখল করে নেয় কোনও ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই, বাতিস্তার সৈন্যরা আত্মসমর্পন করে, পালিয়ে যায় তার অভিজাতরাও।

চে গুয়েভারা বিপ্লবউত্তর কিউবার প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে ১৯৫৯ সালের ২রা জানুয়ারী থেকে ১২ জুন লা’ কাবানায় ছিলেন। এখানে বসেই তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দন্ড কার্যকর প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতেন। ‘চে’ নামের বাড়িটিতে তিনি মাস দুয়েক ছিলেন। বাড়িটি তাঁর স্ত্রী আলিদা মার্চের পছন্দ না হলেও পরবর্তী সময়ে হানিমুন করার জন্য এই বাড়িটিকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আরো কয়েকবার এসেছিলেন এই বাড়িতে। তখন অবশ্য বাড়িটির নাম ‘চে’ ছিল না। পরবর্তি সময়ে চে’ নিহত হবার পর বাড়িটিকে ম্যুজিয়াম এর আবহ দেয়া হয়। বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘চে’।

বিপ্লবের শেষ দিকে বনজঙ্গলের ভিতর তিনি অ্যাজমায় আক্রান্ত হলে মুক্ত বাতাস ও সমুদ্র-সান্নিধ্য জরুরি হয়ে ওঠে তাঁর জন্য। কেয়ারটেকার মহিলা বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বললেন, প্রেমিকা এবং পরবর্তিতে স্ত্রী আলিদা মার্চ’কে নিয়ে সমুদ্র উপকুলীয় এই বাড়িটিতে উঠে আসেন তিনি। স্বয়ং কমরেড ফিদেল ক্যাস্ত্রো নাকি তাঁকে আপাতত এই বাড়িতে বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এবং বিভিন্ন তথ্য চিত্রে দেখা যায় যে, অসুস্থ চে’কে দেখার জন্য রাষ্ট্রপ্রধান ফিদেল ক্যাস্ত্রো এই বাড়িতে এসেছেন বহুবার। অ্যাজমা তখন প্রায় কাবু করে ফেলেছিল কমরেড চে’কে। টানা দুমাস এই বাড়িতে কাটানোর পর এখানকার মাইক্রোক্লাইমেট, বিশেষ করে পরিশুদ্ধ বাতাস আর বিশুদ্ধ জল এবং প্রেমিকা নার্স আলিদা মার্চের সার্বক্ষনিক পরিষেবায় তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

প্রথম স্ত্রী পেরুভিয়ান মার্কস্বাদী হিলদা গাডেনকে তিনি বিয়ে করেন ছাত্রাবস্থায়, এ সংসারে এক সন্তান হলেও তাঁদের এ বিয়ে টেকেনি। হিলদার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর ১৯৫৮ সালে সান্তাক্লারা অভিযানের সময় তিনি প্রেমে পড়েন আলিদা মার্চের। বিপ্লবের সহযোদ্ধা আলিদা মার্চকে বিয়ে করেন ১৯৬০ সালে এবং এ সংসারে তাঁদের রয়েছে চার সন্তান।

১৯২৮ সাল। ১৪ জুন। বিশ্বের সর্বজনশ্রদ্ধেয় মহান বিপ্লবী চে’ গুয়েভারার জন্ম দিন। জন্মস্থান আর্জেন্টিনার রোজারিও। বাবা আর্জেন্টাইন- আইরিশ। পেশায় স্থপতি। চিকিৎসা শাস্ত্রে শিক্ষা শেষে দু’বছর চে’ গুয়েভারা দক্ষিন আমেরিকা ঘুরে বেড়ান। এবং এক পর্যায়ে মেক্সিকোতে কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। তাঁরা পরিকল্পনা করেন, মার্কিনীদের পদলেহনকারী, চরম দূর্নীতিবাজ একনায়ক জেনারেল বাতিস্তাকে উৎখাত করে শোষিত-চিরবঞ্চিত জনগনের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা তুলে দেয়া। এই সময় তাঁকে চে’ নামটি দেয়া হয়, যার অর্থ সকলের বন্ধু। বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত শোষিত মানুষের অধিকার আদায় আর সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মউৎসর্গকারী এই মহাপুরুষ আজ শুধু কিউবায় নয়- যেন সারা পৃথিবীর মানবমুক্তির প্রতিক, সকলের বন্ধু।

আর ‘চে’ নামের অই বাড়িটি থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে হ’ল, যেন বাড়িটি স্যুররিয়াল, বাস্তব-অবাস্তবের মাঝামাঝি এক টুকরো মেঘের মতোন ভাসমান জীবন্ত মন্দির, যেন একটি দীর্ঘশ্বাস। আর ভিতরের সব কিছু দেখে আমার ভাবতে অবাক লাগে, বিস্মিত হই এই ভেবে, যে এতো সামান্য কিছু দিয়েও একজন বিশ্বখ্যাত বিপ্লবীর চলে, যার রাষ্ট্রব্যবস্থা পাল্টে দেবার দর্শন ছাড়া অন্যকিছুর প্রয়োজন নেই তেমন।

শুধু ফেরার সময় আমার এই বাংলাদেশী পোড়া কপালে তিন আঙুল ঠেকিয়ে মনে মনে বললাম, রেড স্যালুট টু ইউ কমরেড।

ইস্টইয়র্ক, কানাডা

- Advertisement - Visit the MDN site

Related Articles

- Advertisement - Visit the MDN site

Latest Articles