19.6 C
Toronto
সোমবার, জুন ২৭, ২০২২

নর্থ ডেকোডা

- Advertisement -
নর্থ ডেকোডা - The Bengali Times
হুমায়ূন আহমেদ

নর্থ ডেকোডার ফারগো শহর । প্রতি বছরেই ভাবি সেখান থেকে ঘুরে আসা উচিৎ আমাদের। এখন ফারগো যাওয়াটা একটা দায়িত্ব হয়ে গেছে। কারন সেখানে থাকে আমার ভাসুরের মেয়ে শীলা তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে। সব সময়ই শীলার অনুরোধ , চাচা চাচী আসুন ঘুরে যান এসে আমাদের এখানে। অবশেষে যাওয়ার সিধান্ত হোল । আমাদের ভাবি শীলার মা এসেছেন বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে মেয়ের কাছে। ভাবির সাথে দেখা করতে যাওয়াটাও আমাদের একটা দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ালো । তাছাড়া শীলার অনুরোধ আর ভালোবাসার আকর্ষণ তো আছেই।
যাওয়ার দিন ঠিক করে শীলাদের জানালাম আমরা আসছি। আমার যাচ্ছি শুনে শীলার আনন্দের শেষ নেই। তারপর মনে হয় একটু চিন্তিত হোল । ভাবছিলো আমাদের কতো টুকু ভাললাগবে ওদের ছোট শহরটা। বারবার বলতে লাগলো, চাচী আমাদের শহরটা খুবই ছোট শহর যাকে বলা যেতে পারে ইউনিভার্সিটি শহর । দেখার তেমন কিছুই নাই। আমি জবাবে বললাম তাতে কি? বহু দেশ ঘুরেছি অনেক কিছু দেখেছি, দেখা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। আমরা সবাই এক সাথে হবো , আড্ডা হবে রাত জেগে। অনেক গল্প করবো। অনেক মজা হবে তুমি কিছু ভেবো না।

আমরা টরন্টো থেকে উনিপেগ ফ্লাই করলাম, মানে ক্যানাডার এক শহর থেকে আরেক শহরে । কারন সরাসরি ওদের শহরে যাওয়াটা একটু ঝামেলার ব্যপার ছিলো । যাহোক উনিপেগ এয়ার পোর্ট থেকে আমাদের নিতে আসলো শীলার বর গুলজার আর অদের ছেলে বিস্ময় । উইনিপেগ থেকে ফারগো তিন ঘণ্টার ড্রাইভ । গুলজার ( শীলার বর) আমাদের নিয়ে গেলো ওর ভাইএর বাড়িতে কিছুতা বিশ্রামের জন্য। সেখানে গুলজারের ভাইরা তাদের পরিবারের সবাই একসাথে হয়েছিলো আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। একদম অচেনা মানুষদের আন্তরিকতা আর ভালোবাসায় আমরা মুগ্ধ হলাম। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা ফারগোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। গাড়ীতে বসেই একটা ক্লান্তিময় ড্রাইভিং জন্য তৈরি হয়ে গেলাম।
কিন্তু শহরের রাস্তাটা পার হবার পরই শুরু হোল আমার মুগ্ধতা। একদন খালি রাস্তা । মাঝে মধ্যে দু একটা গাড়ি চোখে পরলেও মনে হচ্ছিলো পুরো পথটাই আমাদের দখলে। দুপাশে অসাধারন সবুজের মেলা। গাড়িতে সিডি বাজছে নানা রকম প্রিয় বাংলা গানের ও রবিন্দ্র সংগীতের । আমি ডুবে গেলাম গানে এবং চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যে । কিভাবে যে তিন ঘণ্টা কেটে গেলো বুঝতেই পারলাম না। যাত্রা শুরু আগে যে ক্লান্তিময় একটা ভাবনা এসেছিলো , বাস্তবে ঘটলো তার বিপরীত ।

পৌঁছে গেলাম শীলাদের বাড়িতে । গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকালাম। আহা কি যে সুন্দর এলাকাটা । নিরিবিলি পরিষ্কার পরিছন্ন । প্রতিটি বাড়ির সামনে সুসজ্জিত ফুলের বাগান। এলাকাটা নতুন বলে সবকিছুর মাঝে একটা ঝলমলে ভাব। মনে হচ্ছে সব কিছু যেন নিজেদের আত্মতৃপ্তি নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে আছে।

শীলাদের বাড়িতে ঢুকে মনটা আরো ভালো হয়ে গেলো । সুন্দর করে সাজানো গুছানো শীলার সংসার। শীলা ওর ছেলে মেয়েরা খুব আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের স্বাগতম জানালো । শীলা আর গুলজারের আদর যত্নের কোন ক্রোটি নাই। আমিও আনন্দের সাথে উপভোগ করতে লাগলাম ওদের আদর যত্ন । আমার সংসারের চিন্তা নেই রান্নার চিন্তা নেই। আমাদের সব কিছুর চিন্তা ওরাই করছে। আমরা খাচ্ছি দাচ্ছি, গল্প গুজব করছি ব্যাক ইয়ার্ডের দোলনায় দোল খাচ্ছি। বিকাল হলে ঘুরতে বের হচ্ছি। কি যে চিন্তামুক্ত জীবন। ফারগোর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখলাম। লেকের পাশে ঘুরে বেড়ালাম । সব কিছুর সাথে মাছ ধরা, বনভোজন কিছুই বাদ পরলো না। তার ফাঁকে ফাঁকে চললো আমাদের চাচি ভাজতির শপিং । শীলা যত টানা আমার ভাজতি তার চাইতে বেশি বন্ধু । আমরা ঘুরে ঘুরে কত কিযে কিনলাম। এক রকম ড্রেস কিনে দুজনে কতো যে ছবি তুললাম ।

তারমাঝে শীলা ও ওর বর মিলে বাসায় আয়োজন করলো একটি সংগীত সন্ধ্যার । শীলার বর গুলজার সেখানকার ইউনিভারসিটির প্রফেসার । স্বাভাবিক ভাবে ওদের সামাজিক গণ্ডিটা ইউনিভাসিটির সবাইকে ঘিরে। অতিথিরা মোটা মোটি সবাই ছিলো ছাত্র ও শিক্ষক ।ছাত্র ছাত্রীদের গান শুনে মুগ্ধ হলাম। দেশ ছেড়ে এতো দূরে এসেও যে ওরা সংগীত চর্চাটা চালিয়ে যাচ্ছে দেখে ভালো লাগলো । আমার নিজের কিছু লেখা ওদের শুনিয়ে প্রশংসা অর্জন করলাম।

সব চাইতে মজার ব্যাপার ছিলো এই ছোট শহরটিতে শীলার চাচি একজন রূপবতী ও গুণবতী মহিলা।( যদিও আমার দৃষ্টিতে আমি বিন্দু মাত্রও রূপবতী না।) কারণটা ছিলো ওরা মানুষিক ভাবে তৈরি হয়ে এসেছিলো একজন মা, খালা, চাচি যেমন হয় আমি সেরকম একজনই হবো । কিন্তু আমি তার কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলাম বলে হয়তো ওদের ভালো লেগেছে।
প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। স্বয়ং সৃষ্টি কর্তা ও চান আমরা তাঁর প্রশংসা করি আর আমিতো তাঁর সৃষ্টি করা ক্ষুদ্র একটি প্রাণী । তাই নিজের প্রশংসা শুনে পুলকিত এবং কিছুটা লজ্জিত হোলাম ।

ফিরে আসার দিন এগিয়ে এলো। মনে পড়লো’ নর্থ ডেকোডা স্টেট ইউনিভারসিটি’ টা দেখা হয়নি যেখান থেকে আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ পি এইচ ডি ডিগ্রী নিয়েছেন । তাঁর কতো বইতে পড়েছি ফাড়গো শহর আর এই উনিভারসিটির কথা । সেটা না দেখে আমরা চলে যাই কি করে ? যে কথা সে কাজ পৌঁছে গেলাম ইউনিভারছিটি ক্যাম্পাসে । গাড়ি থেকে নেমে কেমন যেন একটা অদ্ভুতো অনুভুতি কাজ করতে লাগলো আমার ভেতরে। এগিয়ে গেলাম মেইন গেটের দিকে। কি অপরুপ রুপে সাজানো প্রবেশ পথ টুকু । মসৃণ পথ চলে গেছে মুল বিল্ডিং এর দিকে। দুপাশে নানা রকম ফুলের সমারোহ । খোলা মাঠে বড় বড় গাছ গুলো তাদের নিজস্ব পরিমিতো আয়তনে ছায়া বিছিয়ে চলেছে । আমরা হেটে চলেছি সে মসৃণ পথ ধরে। হঠাৎ করে চোখে পরলো একটা মানুষ আমাদের চাইতে একটু দূরে হেঁটে চলেছে। চোখে চশমা , হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটছে । আমি থমকে দাড়িয়ে গেলাম। এটা আমি কাকে দেখলাম? এযে লেখক হুমায়ুন আহমেদ । আমার ছুটে গিয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করলো । আমার সাথের সঙ্গিরা আমাকে তাড়া দিলো তুমি ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? আমরা তো এপথে যাবো । আমি কোন জবাব না দিয়ে ওদের সাথে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আমার এখনো মনে হচ্ছে তিনি হেটে চলেছেন আমাদের চাইতে একটু দ্রুত গতিতে।

ইচ্ছা হোল কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টটা দেখে যাই । সেখান থেকেইতো হুমায়ুন আহমেদ পড়া শুনা শেষ করেছেন। সে ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । কি আশ্চর্য্য আবারো তাঁকে দেখলাম তিনি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছেন । আমি ছুটে গেলাম তার পিছনে পিছনে কিন্তু তাকে ধরতে পারলাম না। তিনি ঢুকে গেছেন রুমের ভেতর। আমার সঙ্গীরা ভাবছে আমি উত্তেজিত হয়ে ছুটা ছুটি করছি। ইউনিভারসিটির অন্য আরেক দিক আছে যেটা দিয়েও হেঁটে চলে যাওয়া যায় । সে পথটিতে অসাধারন একটা প্রাণীর ভাস্করয্য উঁচু একটা স্টোনের উপর বসানো ।সেখানেও লিখা ‘নর্থ ডেকোডা স্টেট উনিভারসিটি ‘। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা অনেক ছবি উঠালাম ।আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি পুরো ইউনিভারসিটি এলাকাটা । আর এই ঘুরা ঘুরিতে আমার মনে হচ্ছিল তিনি আমার পাশেই আছেন। হাঁটতে হাঁটতে অন্য দিকে চলে এলাম। বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী ক্লাস শেষে গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে । তাদের পেছনে কিছুটা দূরত্ব রেখে হুমায়ুন আহমেদ হেঁটে চলেছেন চশমা চোখে , কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে। ইউনিভারসিটির উল্টো দিকে একটা বড় এপার্টমেন্ট বিল্ডিং । যার নাম’ উনিভাসিটি ভিলেজ’ সেখানে PHD student থাকে বিশেষ করে যারা বিবাহিত। তিনিও সেখানে থাকতেন। আমরা সেখানে এসে দাঁড়ালাম । আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম তিনি হেঁটে চলে গেলেন ভেতরে। সেখানে নিশ্চয় গুলতেকিন গরম চা নিয়ে অপেক্ষা করছেন এক সাথে খাবেন বলে।

আমাদের ফেরার সময় হয়ে গেলো । সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি অদ্ভুত এক হ্যালোসিনিসান নিয়ে এক ঘণ্টা দুঘণ্টা ঘুরে বেরালাম আমার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের সাথে। গাড়িতে উঠে শীলা গুলজার আমাকে জিজ্ঞেস করলো , কেমন লাগলো চাচি আপনার প্রিয় লেখকের পড়া শোনার স্থানটি দেখে। আমি মৃদু স্বরে জবাব দিলাম অসাধারন। গাড়িতে চলতে চলতে মনে হচ্ছিল এমন হ্যালোসিনিসান কি কোন মানুষের হয়? যে মানুষটা পৃথিবীতে নেই তার সাথে আমি এতক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম । হুমায়ুন আহমেদ বেঁচে থাকলে তিনি হয়তো একটা গল্প লিখে ফেলতেন, “ এক মহিলার ভুতে ধরার কাহিনী” নাম দিয়ে। তবে আমাকে বলতেই হবে এটা ছিলো নর্থ ডেকোডায় আমার শ্রেষ্ঠ দর্শন ।

লেখাটা বেশ দীর্ঘ । তারপরও ইচ্ছে হোল হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিনে লিখাটা পোস্ট করতে।

ম্যাল্টন, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles