12.5 C
Toronto
মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২

জন্ম মৃত্যু

- Advertisement -
ছবি/বেনজি আইয়ার্ড

যে ভয়টা গত চার মাস ধরে করে আসছিলাম, আজকে তাই হলো। গ্রীষ্ম গেলো, শরৎ গেলো কোনো খোঁজ নাই; এখন এই বিদঘুটে ঠান্ডায় তার মনে পড়লো? আমার বন্ধুর ফোন- রিপন কী খবর?
– ভালো
– শোন, জরুলী কথা আছে। তোর বাসায় আমি চারটা বাশকো রাখছিলাম না?
– হু
– আছে না ফেলে দিছিস?
– আছে
– ছুটির দিন, একটা বাশকো একজনকে দিয়ে আসতে পারবি? তোর বাসার পাশেই
– ওকে

– গুড। কিন্তু সাবধান, ভদ্রমহিলা প্রেগন্যান্ট। দুই সপ্তাহ পরে বাচ্চা হবে। এননাইন্টিফাইভ মাস্ক পরবি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার মাইখে ডেলিভারি দিবি
– দোস্ত রে, বাচ্চা হওয়ার পরে দি?
– ক্যা?
– এই সময়ে তার বাসায় যাওয়া কি ঠিক? কখন ব্যাথা উঠে না উঠে..
– কখন দিতে হবে না হবে, সেটা তুই ভালো জানিস না আমি? ব্যাটা মূর্খ! তুই শুধু বাশকো ডেলিভারি দিয়ে চলে আসবি। বাচ্চা ডেলিভারি দিতে তো কই নাই! আর না পারলে বলে দে, অন্য লোক পাঠাবো।
আমি তার বাশকো [বাক্স] নিয়ে রওনা দেই।

সে বলছিল বাসার পাশে, কিন্তু জিপিএস-এ দেখি বাসা থেকে পাক্কা সাতাশ কিলোমিটার। একেতো মারাত্মক ঠান্ডা, তার উপর স্নো। ঢাকায় থাকতেও অনেক জ্বালাতো। বলতো অমুক জায়গায় যা, দশ টাকা রিক্সা ভাড়া। রিক্সায় উঠে দেখতাম পঞ্চাশ টাকা। তার “এই তো কাছে” কথার মানে ধরে নিতে হবে পঞ্চাশ কিলো।
মাইনাস পঁচিশ ডিগ্রিতে আধা ঘন্টা ধরে গাড়ির বরফ সাফ করা যে কত কষ্টের, সেটা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে। হাত-পা জমে অসহ্য ব্যাথা শুরু হয়ে যাবে, নাক চোখ দিয়ে নেমে আসবে বন্যার পানি। এক ঘন্টা ড্রাইভ করে পৌঁছুলাম বিশাল এক বাড়ির গেইটে। ইন্টারকম সুইচ টিপতেই স্পিকারে এক ভদ্রমহিলা বলে উঠল- জাভেদ?
– জি
– ভেতরে আসুন। দরজা ওপেন।

এই বাড়ির দাম কমপক্ষে তিন মিলিয়ন তো হবেই। ঝকঝকে তকতকে, আধুনিক বাক্স আকারের বাড়ি। আমি ড্রাইভওয়ে পার হয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতে সেটাও খুলে গেলো। ভেতরে জুতার কভার রাখা, সেটা পরে ভেতরে ঢুকে সোফায় বসলাম। ভদ্রমহিলা দেয়াল ধরে ধরে সাবধানে এসে কিছুদূরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো। বলল জাভেদ, বাসায় কেউ নেই। আমার হাজবেন্ড টরন্টো গেছে। আপনাকে যে কি দিয়ে আপ্যায়ন করি..
– না না, ওসব কিচ্ছু লাগবে না। আপনি অসুস্থ। আমি পার্সেলটা দিয়ে চলে যাবো
– আপনার ভাইয়ের আসতে এখনো দুই ঘন্টা দেরি। আমার মেয়ের আসতে এখনো এক ঘন্টা লাগতে পারে; অনার্স পরীক্ষা চলছে। আমি খুব সিক ফিল করছি
– কোনো হেল্প লাগলে বলবেন
– যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি আমাকে হাসপাতালে নিতে পারবেন?
– তারচেয়ে বরং আমি এম্বুলেন্স ডেকে দেই?
– এম্বুলেন্স তো আমিও ডাকতে পারি। আমি এম্বুলেন্স এ উঠতে ভয় পাই
– ওকে, ঠিক আছে চলেন
– আমি এখন যেতে চাচ্ছি। কেন জানি ভয় লাগছে। হঠাৎ পেইন উঠেছে
– আমি গাড়িটা তাহলে গেইট দিয়ে ঢুকিয়ে দরজার পাশে আনি।

আমি মেইন গেইট দিয়ে গাড়িটা ব্যাক ইন করে ভেতরের উঠোনে নিয়ে আসি। উনি নিজেই আস্তে আস্তে হেঁটে উঠে বসলেন। সাবধানে গাড়ি টান দিতে থাকি। হাসপাতাল খুব একটা কাছেও না। কেন যে কাছেরটা রেখে দুরেরটায় যেতে চাচ্ছে খোদা মালুম। মনে হচ্ছে খুব জেদি মহিলা, কারো কথা শুনবে না। এই হেভি স্নো এর মধ্যে বিশ কিলোমিটার যাওয়া কম কথা না। গাড়ি ছাড়ার দুই মিনিটের মাথায় কোঁকানি দিয়ে উঠে ‘আ’ বলে উঠলেন। আমি চমকে পেছনে তাকিয়ে বললাম, ঠিক আছেন?
– হা..উঃ..

আমি মারাত্মক টেনশনে পড়ে যাই। বোঝাই যাচ্ছে প্রসব বেদনা। আল্লাহ আল্লাহ করতে থাকি; বাক্স ডেলিভারি দিতে এসে শেষ পর্যন্ত বাচ্চা ডেলিভারি দেওয়া যেন না লাগে। দেশে পড়ছিলাম জুওলজি। আর কানাডা এসে নিয়েছিলাম ল্যাব টেকনিশিয়ান সার্টিফিকেট। ওটা পরে কোনো কাজে লাগে নাই, ঐ ফিল্ডে চাকরি পাই নাই। ফিলিপিনোদের সাথে কম্পিটিশনে পেরে উঠি নাই। অবশ্য কোর্স করার সময় ঐ কলেজে একবার বাচ্চা ডেলিভারির ভিডিও দেখিয়ে প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিল। সেই বীভৎস দৃশ্য মনে হলে এখনো আঁতকে উঠি। ভাই রে ভাই..

পাঁচ কিলোমিটারও এগিয়েছি কিনা সন্দেহ, ভদ্র মহিলা এবার তীব্র যন্ত্রনায় কঁকিয়ে উঠল। মিনিটখানেক পরপর চেঁচিয়ে উঠতে লাগলো। উনার কাছে অনুমুতি না নিয়েই আমি নাইন-ওয়ান-ওয়ান এ কল দিলাম। সাথে সাথে অন্য পাশ থেকে অপারেটর ফোন ধরে বলল, বলেন কী সাহায্য করতে পারি!
– আমি একটা পেশেন্ট নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছি, বাচ্চা ডেলিভারি হবে। কিন্তু রাস্তার মধ্যেই তার বেশ ব্যাথা উঠে গেছে
– আপনি এখন কোথায়?
– কার্লিং এভিনিউ তে। এখন ক্যানাডিয়ান টায়ারের সামনে দিয়ে ইস্ট এ যাচ্ছি
– কোন হসপিটালে যাচ্ছেন?
– অটোয়া জেনেরাল
– ওকে, সাবধানে ড্রাইভ করেন। লাইন কাটবেন না। এম্বুলেন্স আপনাদের গাড়ি ধরে ফেলবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে। দ্রুত যে কোনো পার্কিং লট-এ পুল ওভার করবেন। রাস্তার পাশে না থামাই ভালো। গাড়ির নাম্বার, কালার, নাম্বার প্লেট বলেন।
এবার ভদ্র মহিলা প্রচন্ড চিৎকার দিয়ে বললেন, জাভেদ, আমার হয়ে যাচ্ছে! পানি ফেটে গেছে। আর সময় নাই!
ইয়া আল্লাহ!
আমি অপারেটরকে বললাম, উনার বাচ্চা মনে হচ্ছে এক্ষুনি হবে, কী করবো?
– আপনি এক্ষুনি গাড়ি পার্ক করেন। আপনাদের ঠিক পেছনেই এম্বুলেন্স এসে গেছে। দেখতে পাচ্ছেন ?
– হ্যা!
– আমরা লাইন এ আছি, এম্বুলেন্স থেকেও আমাদের সাথে ফোনে যোগ দিচ্ছে প্যারামেডিক পার্সন। আপনাকে ইন্সট্রাকশন দিবে। শান্ত থাকবেন, টেনশন নিবেন না। গুড লাক!
সৌভাগ্যক্রমে ঠিক পাশেই একটা চার্চ এর পার্কিং লট পেয়ে ঢুকে পড়লাম। এম্বুলেন্সটাও পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার গাড়ির মধ্যে তখন চলছে ভয়ার্ত চিৎকার। জীবনে এরকম ভয়াবহ দৃশ্য আর দেখি নাই। এতো কষ্ট! ও আল্লাহ রক্ষা করো!

এম্বুলেন্স থেকে প্যারামেডিক এর লোক এসে আমাকে বলল, আপনি এম্বুলেন্স এর সামনে প্যাসেঞ্জার সিটে গিয়ে বসুন। বাচ্চা ডেলিভারি শুরু হয়ে গেছে। আমরা দুঃখিত এই অবস্থায় রোগীকে এম্বুলেন্সে ট্রান্সফার করা যাবে না। আপনার গাড়িতেই ডেলিভারি করানো হচ্ছে। আপনার আপত্তি নেই তো?
– কোনো সমস্যা নাই।
আমি তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স এর সামনে গিয়ে বসি। বাইরে এখনো মাইনাস পঁচিশ ডিগ্রি। দুই মিনিটের মাথায় দেখি তারা কম্বলের মধ্যে নবজাতক বাচ্চা মুড়িয়ে এম্বুলেন্সের পেছনে নিয়ে ঢুকালো। একজন এসে বলল, আপনি বাচ্চার কে হন?
– মামা
– কংগ্রাচুলেশন্স! আপনি এখন লাভলী কিউট মেয়ে বাচ্চার গর্বিত মামা!
– থ্যাংক ইউ! আলহামদুলিল্লাহ!
– হোয়াট?
– না কিছু না।

একটু পরে তারা স্ট্রেচারে করে মা কেও দ্রুত গাড়ি থেকে বের করে এম্বুলেন্সে তুলে আমার কাছে এসে বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার বোন আর ভাগ্নি দুজনই বেশ ভালো আছে। আপনি যা করেছেন, একদম পারফেক্ট! পার্কিং লটটা বাচ্চা ডেলিভারির জন্য দারুন!
– হা হা
– আপনার গাড়ি আমরা ক্লিন করে দিচ্ছি। পাঁচটা মিনিট সময় দিতে পারবেন?
– শিওর!
– আমরা বাচ্চা আর মা কে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, আপনি কি যেতে ইচ্ছুক?
– অবশ্যই!
আমি অপেক্ষা করতে থাকি এম্বুলেন্সের মধ্যে। প্রযুক্তিতে ঠাসা। এমার্জেন্সি রেডার আছে মনে হয়। এদের এম্বুলেন্স যে আসলে কত বড়, ভেতরে না বসলে বোঝার উপায় নেই। মাঝারি সাইজের ট্রাকের সমান। এসব দেখাও কম ভাগ্যের ব্যাপার নয়। এজন্য আমার বন্ধু একটা বড়সড় ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।
ছেলেটা আবার এসে বলল, আপনি কি মুসলিম?
– হু
– আপনার বোন জিজ্ঞেস করল আপনি আধান [আজান] দিতে পারবেন কি না
– অবশ্যই!
– একটু কষ্ট করে যদি গাড়ির পেছনে আসতেন..

আমি বাচ্চার ডান কানের কাছে ফিসফিস করে “আল্লাহু আকবর” বলে আযান দিতে থাকি। যদিও বাচ্চাটা ইনকিউবেটরে, আমার আযান তার কানে পৌঁছাচ্ছে কিনা সন্দেহ। বাচ্চাটা ঘুরে থাকায় চেহারা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না। বাচ্চার মায়ের দু চোখ বেয়ে খুশির অশ্রুধারা নেমে আসছে। পাশে বসা প্যারামেডিক বিস্ময়ে আমার দিয়ে চেয়ে থাকে..

এম্বুলেন্স চলা শুরু করার আগে ছেলেটা এসে বলল, আপনি ইচ্ছে করলে বাসায় চলে যেতে পারেন। বাচ্চার বাবা আর খালা হসপিটালে অপেক্ষা করছে। ভদ্রমহিলা আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এই দেখেন আপনার ভাগ্নির ছবি- বলে সে তার মোবাইল স্ক্রিনে একটা রাজকন্যার ছবি দেখালো। বলল আপনাকে যেন টেক্সট করে পাঠিয়ে দেই।
আমি আনন্দে কেঁদে ফেলি। মাশাল্লাহ!
ছেলেটা আবার এসে বলল, আপনার বোন আপনাকে অনুরোধ করেছে তার মেয়ের জন্য একটা নাম ঠিক করে দিতে। ভালো নাম মনে হলে যেন তাকে জানাই। উনি আসলে খুব আবেগতাড়িত হয়ে আছেন
– এখনই বলি? একটা নাম মনে এসেছে
– কি?
– ‘নুহা’

– বিউটিফুল! আপনি এই কাগজে স্পেলিং লিখে দেন প্লিজ, হয়তো বার্থ সার্টিফিকেটেও দেবে।
আচ্ছা হঠাৎ এই নুহা নামটা কেন আমার মাথায় আসলো?
আমি ওদের বিদায় দিয়ে রিলাক্স হয়ে সিটে বসলাম। কেমন একটা স্বর্গীয় শান্তি অনুভব করতে থাকি। ঠিক পাশেই টিম হর্টন্স থেকে কফি এনে গাড়িতে বসতেই দেখি বেআইনি পার্ক করার জন্য উইনশিল্ডে পার্কিং পুলিশ টিকিট দিয়ে গেছে দেড়শো ডলারের! ঠিক এ সময়ে চিশতির ফোন- রিপন ‘বাশকো’ দিতে পারছিলি?

– হু
– কিছু কইলো?
– কিছু বলার সময় পায়নি। বাচ্চা হয়ে গেছে
– মানে, কখন?
– একটু আগে আমার গাড়ির মধ্যে। হাসপাতালে নিতে নিতেই..
– এম্বুলেন্স ছিল না? সব ব্যাপারে তোর এতো মাতব্বরি ক্যা!
– অনুরোধ করছিল নিয়ে যেতে
– বলল আর তুই উল্লুকের মতো নাচতে নাচতে নিয়ে গেলি! কোন দায়িত্বটা এ পর্যন্ত ঠিকমতো করছিস বল তো? বাচ্চা কিডা ডেলিভারি দিলো? তুই?
আমি উত্তর দেবার আগেই মোবাইল বন্ধ হয়ে গেলো। চার্জ শেষ।

যাক গে, ভালোই হলো; গালি খাওয়ার অনেক টাইম আছে। সে কমপক্ষে একশোটা প্রশ্ন করে যুক্তি দেখিয়ে আমাকে সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে যে আমি টরন্টোর হাই পার্কের মিনি চিড়িয়াখানায় বাস করার একজন যোগ্য চিড়িয়া! টরন্টো জু তে ঠাঁই পাবার যোগ্যতা আমার এখনো হয় নাই..
.
উত্তেজনায় এখনো নরমাল হতে পারিনি।
কফিটা শেষ করে সিটে হেলান দিয়ে রিলাক্সড হয়ে বসি। গাড়ির সিট ভালো করেই ক্লিন করে গেছে। হাসপাতাল হাসপাতাল গন্ধ পাচ্ছি। কিছুটা ধাতস্থ হতেই দেখি লাইন ধরে হ্যাজার্ড আলো জ্বালিয়ে কালো গাড়ির বহর পার্কিং লট এর জায়গা দখল নিচ্ছে। মানুষজন কালো পোশাকে সাজগোজ করে, ফুলের তোড়া হাতে চার্চের মধ্যে ঢুকছে। পুরুষ-মহিলা সবাই খুব সচেতন সাজগোজ নিয়ে। নামার আগে আয়নায় ফাইনালী লিপস্টিক, চোখের নকল পাঁপড়ি ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। পুরুষগুলো পারফেক্টলি স্যুটেড-বুটেড। কেউ মারা গেছে। ব্ল্যাক কমিউনিটির ফিউনারেল অনুষ্ঠান।
আমি বসে বসে এদের কীর্তিকলাপ দেখতে থাকি। সবাই দুঃখী দুঃখী ভাব আনার চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের চেহারায় কৌতুক কৌতুক ভাব নিয়ে এসেছে।
আমি বাসার দিকে রওনা দেই।
ভালোই হলো; অটোয়ায় আমার কিছু আত্মীয় বাড়লো। যদিও সোমালিয়ান। এ জন্যও আমার বন্ধু চিশতীকে স্পেশাল থ্যাংকস জানাই মনে মনে। সমস্যা হলো তার রেখে যাওয়া এখনো তিনটা ‘বাশকো’ আমার বাসার স্টোর রুমে পড়ে আছে।

কপালে আরও কী আছে কে জানে!

অটোয়া, কানাডা

Related Articles

Latest Articles