
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণ করে আলোচনায় আসা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একাধিক কারণ খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা। এটি কোনো ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিহিংসার ঘটনা, নাকি প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে—তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
এদিকে তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার জেরিকা তাসনিম দিশার দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
শুনানিতে দিশার রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, সাহসের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে প্রকাশ করেছিলেন তাহসিফ। তিনি ভিডিওটি ধারণ না করলে শেখ হাসিনা কীভাবে দেশ ছেড়েছিলেন, তা অজানা ও রহস্যঘেরা থেকে যেত।
পিপি আরও বলেন, ওই ভিডিও প্রকাশের কারণে কোনো ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাহসিফ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কি না, নাকি এর পেছনে প্রেমঘটিত কোনো কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, তাহসিফকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগের রাতে তিনি মামলার দুই আসামি দিশা ও আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের সঙ্গে ছিলেন। ওই রাতে দিশাকে নিয়ে ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ ও ‘সিপি ফাইভ স্টার’ রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন তাহসিফ।
পিপির ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে আসামি এখনো অনেক তথ্য গোপন করছেন বলে দাবি করেন তিনি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে দিশাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
অন্যদিকে দিশার পক্ষে রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ। তিনি দাবি করেন, তাহসিফ ও দিশা পূর্বপরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন রাতে রেস্তোরাঁয় সময় কাটানোর পর রাত ১২টার দিকে তাহসিফ নিজেই দিশাকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেন। তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলে তাহসিফ নিজে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দিতেন না বলে যুক্তি দেন তিনি।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাত ১টার দিকে পরিবারের পক্ষ থেকে ফোন করে তাহসিফকে বাসায় ফিরতে বলা হয়। তখন তিনি আধা ঘণ্টার মধ্যে ফিরবেন বলে জানিয়েছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে একসঙ্গে দেখা গেলেও রাত ১২টার পর দিশার সঙ্গে তাহসিফের আর কোনো যোগাযোগের তথ্য নেই বলে দাবি করেন তিনি।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত দিশার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত ৩০ অক্টোবর রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে বুধবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাঁকে আদালতে হাজির করে নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
যেভাবে আলোচনায় এসেছিলেন তাহসিফ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের ডাকে সাড়া দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন তিনি।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদীর রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পর আটক দ্বীপ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছিলেন, রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার শেষে উত্তরার হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে তাঁর পথ আলাদা হয়ে যায়। তবে পরে দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
একই সঙ্গে মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার বিষয়টিও পরে স্বীকার করেন দ্বীপ। তবে তাহসিফ হত্যার প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

