টিডিএসবির প্রতি ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বাতিলের আহ্বান

টিডিএসবির প্রতি ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বাতিলের আহ্বান - the Bengali Times
স্কুল বোর্ডের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিয়ে এবার সরব হলেন একদল অভিভাবক

টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিয়ে এবার সরব হলেন একদল অভিভাবক। প্রাদেশিকভাবে নিয়োজিত টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের তত্ত্বাবধায়কের কাছে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জানিয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে যেসব পদক্ষেপের ফলে স্কুলের পরিষেবা, কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যবস্থায় কাটছাঁট হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন, সেগুলির কিছু পুনর্বিবেচনারও দাবি উঠেছে। অভিভাবকদের বক্তব্য, আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলায় খরচ কমানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষ, স্কুলের কর্মীসংখ্যা, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং পরিবারগুলির সঙ্গে স্কুলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর। বিশেষ করে কিছু স্কুলে কাটছাঁটের মাত্রা এতটাই বেশি যে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলি।

অভিভাবকদের লেখা প্রতিটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট স্কুলের নিজস্ব পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে চিঠিগুলিতে বেশ কিছু সাধারণ উদ্বেগও উঠে এসেছে। অভিভাবকদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব, চলমান বাজেট ও কর্মী হ্রাস, স্কুল পরিচালনায় বাবা-মায়েদের অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও সহায়তা পরিষেবা সংকুচিত করা। তাঁদের যুক্তি, স্কুলের বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত কেবল হিসাবের খাতায় খরচ কমানোর বিষয় নয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষাজীবনে। ফলে কোনও পদ বাতিল বা কোনও পরিষেবা কমানোর আগে তার শিক্ষাগত ও সামাজিক প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

- Advertisement -

এই পরিস্থিতির অন্যতম উদাহরণ গ্রেনোবল পাবলিক স্কুল। প্রায় এক দশক ধরে এই স্কুল কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত সামির সাইদ নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাইদের আশঙ্কা, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে সীমা রয়েছে, সেটি যদি তুলে দেওয়া হয়, তাহলে একটি শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী থাকবে তার কার্যকর ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। বিশেষ করে বড় স্কুলগুলিতে এই পরিবর্তনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে বলে তাঁর দাবি। গ্রেনোবল পাবলিক স্কুলে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাঁদের পরিবারগুলির মধ্যে বহু ভাষাভাষী মানুষ রয়েছেন বাড়িতে প্রায় ৭০টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলা হয় বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এই ধরনের স্কুলে শুধু সাধারণ শ্রেণিকক্ষ শিক্ষা নয়, পরিবার ও কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা ব্যবস্থার গুরুত্বও অনেক বেশি। অভিভাবকদের অভিযোগ, এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবক, পরিচর্যাকারী ও কমিউনিটি সম্পৃক্তকরণ কার্যালয়ের মতো পরিষেবার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই পরিষেবাগুলির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অভিভাবকদের বক্তব্য, টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের আওতায় থাকা কয়েকশো স্কুল এমন সব এলাকার শিক্ষার্থীদের পরিষেবা দেয়, যেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা রয়েছে। ফলে এই স্কুলগুলিতে কোনও সহায়তা পরিষেবা কমানো হলে তার প্রভাব সাধারণ স্কুলের তুলনায় আরও গভীর হতে পারে। অভিভাবকদের মতে, যে শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, বাজেট কমানোর ফলে অনেক সময় সেই শিক্ষার্থীরাই প্রথমে পরিষেবা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। এ কারণেই তাঁরা মনে করছেন, শুধুমাত্র আর্থিক হিসাবের ভিত্তিতে স্কুলের পরিষেবা পুনর্গঠন না করে প্রতিটি স্কুলের সামাজিক বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত।

টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের কিছু সিদ্ধান্ত পুরো বোর্ডজুড়েই প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে আউটডোর এডুকেশন সেন্টার বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ রয়েছে। আবার কিছু পরিবর্তন নির্দিষ্ট স্কুলকে বেশি প্রভাবিত করছে। কোথাও উপাধ্যক্ষের পদ কমানো বা খালি পদ পূরণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও লাঞ্চ মনিটরের সংখ্যা কমানো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আবার অ্যানেক স্ট্রিট পাবলিক স্কুলের মতো কিছু জায়গায় শ্রেণিকক্ষ বন্ধ বা সিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও অভিভাবকরা আপত্তি জানিয়েছেন। অভিভাবকদের বক্তব্য, বাইরে থেকে দেখলে এগুলিকে ছোটখাটো প্রশাসনিক বা ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্কুলের দৈনন্দিন কাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ জড়িয়ে রয়েছে। একজন লাঞ্চ মনিটর কমে গেলে তার প্রভাব নজরদারিতে পড়তে পারে, শিক্ষক পদ খালি থাকলে শ্রেণিকক্ষের চাপ বাড়তে পারে এবং কোনও অতিরিক্ত শিক্ষা কর্মসূচি কমলে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।

অ্যানেক স্ট্রিট পাবলিক স্কুল কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে যুক্ত থাকা জেসিকা বেসার-রোজেনবার্গও এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, খরচ কমানোর জন্য শিক্ষকের পদ পূরণ না করা, আউটডোর এডুকেশনের সুযোগ কমানো কিংবা স্কুলের শ্রেণিকক্ষ বন্ধ করে দেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের শেষ প্রভাব গিয়ে পড়বে শিশুদের উপর। অর্থাৎ প্রশাসনিক খরচ কমানোর হিসাবের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে, একটি সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশকে কতটা বদলে দিচ্ছে। অভিভাবকদের দাবি, এই মূল্যায়ন ছাড়া একের পর এক কাটছাঁট করা হলে দীর্ঘমেয়াদে স্কুলের শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।

অভিভাবকদের এই অভিযোগ ও উদ্বেগ নিয়ে টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক রোহিত গুপ্তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। তবে টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের এক মুখপাত্র লিখিত বিবৃতিতে জানান, পরিবারের উদ্বেগগুলি শোনা এবং সেগুলির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড বিষয়টি বুঝতে পারছে। মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব উদ্বেগ বোর্ডের আওতাভুক্ত, সেগুলি সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়গুলি বিবেচনা করা হবে। তবে অভিভাবকদের প্রশ্ন, শুধু অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? তাঁদের দাবি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন এবং কোনও কাটছাঁটের আগে স্কুল কমিউনিটির সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা করতে হবে।

টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের বর্তমান পরিস্থিতি মূলত একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রশাসনকে ব্যয় কমানোর প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে? অভিভাবকদের বক্তব্য, তাঁরা সব ধরনের পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন না। তাঁদের আপত্তি মূলত এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, যার ফলে স্কুলে কর্মী কমে যায়, শিক্ষার্থীদের সহায়তা সীমিত হয় অথবা পরিবারগুলির সঙ্গে স্কুলের যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁদের আশঙ্কা, একেকটি ছোট কাটছাঁট আলাদাভাবে দেখলে তার প্রভাব সীমিত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শিক্ষক, সহায়ক কর্মী, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, আউটডোর শিক্ষা এবং অন্যান্য পরিষেবায় একসঙ্গে পরিবর্তন এলে তার সম্মিলিত প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপর অনেক বেশি হতে পারে।

এই কারণেই টরন্টোর বিভিন্ন স্কুলের অভিভাবকেরা এখন শুধু নির্দিষ্ট কোনও পদ বা পরিষেবা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করছেন না। তাঁরা চাইছেন, টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের ভবিষ্যৎ বাজেট ও নীতিগত সিদ্ধান্তে স্কুল কমিউনিটির মতামতকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হোক এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার শিক্ষাগত ও সামাজিক প্রভাব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হোক। শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক শুধু বাজেট কমানো বা কিছু পদ বাঁচানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর কেন্দ্রে রয়েছে টরন্টোর সরকারি স্কুল ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অভিভাবক ও স্কুল কমিউনিটির কণ্ঠস্বর কতটা গুরুত্ব পাবে।

সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles