
কানাডার প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে ব্র্যাম্পটনভিত্তিক সাঁজোয়া যান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রোশেল-এর হাত ধরে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা যেভাবে বেড়েছে, সেই বাস্তবতায় কানাডার এই প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই নয়, বরং ফেডারেল সরকারের বহু বিলিয়ন ডলারের সামরিক যান সরবরাহ প্রকল্পের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমানে ব্র্যাম্পটনে রোশেলের প্রায় ৪ লাখ বর্গফুটের উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু কোম্পানির দাবি, ক্রমবর্ধমান অর্ডার এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনার কারণে এই স্থাপনাটি ইতোমধ্যেই তাদের প্রয়োজনের তুলনায় ছোট হয়ে পড়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন প্রায় ২০ লাখ বর্গফুট জায়গা, যাতে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
প্রায় এক দশকের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ইউক্রেনসহ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের মতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর কাছে লাইট ইউটিলিটি ভেহিকেল সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য প্রস্তুতকারক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সামরিক যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় রোশেলের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপও দ্রুত বেড়েছে। সেই কারণেই কোম্পানিটি এখন উৎপাদন সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
রোশেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রোমান শিমোনভ মনে করেন, কানাডার অটোমোটিভ শিল্পে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি প্রতিরক্ষা শিল্প পূরণ করতে পারে। তার ভাষায়, অনেক অটোমোটিভ কোম্পানি কানাডা থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে বিশাল উৎপাদন অবকাঠামো এখন খালি পড়ে আছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প শুধু উৎপাদনই বাড়াতে পারবে না, বরং হাজার হাজার দক্ষ কর্মীকে আবারও কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে পারবে। তিনি বলেন, ব্র্যাম্পটন এমন একটি শহর যেখানে শিল্প অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয় রয়েছে। তাই এখানে প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণ বাস্তবসম্মত এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা দিয়েছেন যে, সামরিক যান সংগ্রহের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হবে। শুধু তাই নয়, সম্ভাব্য প্রতিযোগীর সংখ্যাও কমিয়ে মাত্র দুইটি প্রতিষ্ঠানে নামিয়ে আনা হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় রোশেল অন্যতম শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে অবস্থান করছে। এটি রোশেলের জন্য শুধু একটি ব্যবসায়িক সুযোগ নয়; বরং কানাডার প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য প্রকল্পের আওতায় রয়েছে : প্রায় ১,৬০০ থেকে ২,১০০টি লাইট ইউটিলিটি ভেহিকেল উৎপাদন। পাশাপাশি ৪০০ থেকে ৫০০টি ইউটিলিটি ট্রেলার সরবরাহ। প্রতিরক্ষা খাতের হিসেবে এটি একটি বহু বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প, যা সফল হলে রোশেলের উৎপাদন সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের পরিধি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
রোমান শিমোনভ জানিয়েছেন, চুক্তি চূড়ান্ত হলে এ বছরের শেষ নাগাদ কয়েকশ নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। পরবর্তীতে উৎপাদন পূর্ণমাত্রায় শুরু হলে সেই সংখ্যা হাজারে পৌঁছাতে পারে। তার মতে, প্রতিরক্ষা শিল্পে এই বিনিয়োগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়; বরং স্থানীয় অর্থনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।
রোশেলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন পর্যাপ্ত উৎপাদন অবকাঠামো নিশ্চিত করা। কোম্পানির মতে, দ্রুত উৎপাদন শুরু করার জন্য এমন একটি স্থাপনা প্রয়োজন, যেখানে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়াই উৎপাদন চালু করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে স্টেলান্টিসের খালি প্ল্যান্ট একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি সেই ধরনের বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ব্যবহার করা যায়, তাহলে নতুন কারখানা নির্মাণে দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
রোশেল যদি সরকারি এই চুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্র্যাম্পটন এবং বৃহত্তর অন্টারিও অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ার প্রেক্ষাপটে কানাডাও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে বড় প্রকল্প তুলে দেওয়া হলে কানাডার প্রতিরক্ষা শিল্প আরও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
রোশেল বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি সরকারি চুক্তি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎকে আমূল বদলে দিতে পারে। উৎপাদন সম্প্রসারণ, হাজারো নতুন কর্মসংস্থান, খালি শিল্প অবকাঠামোর পুনর্ব্যবহার এবং কানাডার প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা সব মিলিয়ে এই প্রকল্প শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, বরং দেশের শিল্পনীতি ও অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

