
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের অবসান ঘটেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের প্রেক্ষাপটে নতুন ডেটা সেন্টারের কাজ এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছে হ্যামিল্টন সিটি কাউন্সিল। এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি স্থানীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে না; বরং এটি কানাডার অন্যান্য মিউনিসিপালিটির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে বিশাল আকারের ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন। এই ডেটা সেন্টারগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, অনলাইন সেবা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার মূল অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন উদ্বেগও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি সার্ভার ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয় প্রচুর পানি এবং কুলিং সিস্টেম, যা স্থানীয় পরিবেশ ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া এসব স্থাপনা থেকে উৎপন্ন শব্দদূষণ নিয়েও বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ উঠছে। এই বাস্তবতায় হ্যামিল্টনে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ এক বছরের জন্য বন্ধ রাখার প্রস্তাব আনা হয়েছিল, যাতে প্রশাসন সম্ভাব্য পরিবেশগত, অবকাঠামোগত এবং সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়নের সুযোগ পায়।
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে এটি হতো কানাডার ইতিহাসে ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ। ফলে দেশজুড়ে বিভিন্ন পৌরসভা ও নীতিনির্ধারকরা হ্যামিল্টনের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রেখেছিলেন। বর্তমানে কানাডার বিভিন্ন শহরেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে ডেটা সেন্টারের অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করা হবে, নাকি আগে পরিবেশ ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে যাচাই করা হবে।
দীর্ঘ আলোচনার পর এবং সিটির আইনি বিভাগের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে বিষয়টি ভোটাভুটিতে তোলা হয়। ভোটের ফলাফল ছিল : স্থগিতাদেশের বিপক্ষে ভোট: ১০ এবং স্থগিতাদেশের পক্ষে ভোট: ৬। ফলে এক বছরের জন্য ডেটা সেন্টারের কাজ বন্ধ রাখার প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।
ভোটের আগে হ্যামিল্টনের মেয়র আন্দ্রিয়া হরওয়াথ স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন। তার ভাষায়, এই ধরনের স্থগিতাদেশ হ্যামিল্টনের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে পিছিয়ে দিতে পারে। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মেয়রের মতে, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ক্রমেই ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তাই বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার মতো সিদ্ধান্ত শহরের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভোটের আগে কাউন্সিল সদস্যরা সিটির আইনজীবীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেন। পরে কয়েকজন কাউন্সিলর জানান, আইনি পরামর্শ অনুযায়ী এই ধরনের স্থগিতাদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারত। তাদের আশঙ্কা ছিল, এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সিটির জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারত।
স্থগিতাদেশের প্রস্তাবকারী কাউন্সিলর নৃন্দার নানন ভোটে পরাজিত হলেও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তিনি বলেন, জনস্বার্থ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় এনে এই প্রস্তাব আনা হয়েছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দায়িত্বশীল পরিকল্পনা করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তার মতে, সমালোচকদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, এই যুক্তিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটি জনমনে অযথা ভয় তৈরির চেষ্টা।
এই ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং সেই উন্নয়নের পরিবেশগত মূল্যও এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ডেটা সেন্টার নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানির চাহিদা, কার্বন নিঃসরণ এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপের মতো বিষয়। ফলে বিশ্বের অনেক দেশ ও শহর এখন এমন নীতিমালা তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।
হ্যামিল্টন সিটি কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমানে স্থানীয় সরকারগুলো প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয় যে ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির বিস্তার যত বাড়বে, ততই নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রয়োজন বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়বে বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিগত বিতর্কও। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখা এবং একই সঙ্গে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা। হ্যামিল্টনের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি শহরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং কানাডাজুড়ে ডেটা সেন্টার, এআই এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে চলমান জাতীয় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

