
উইনিপেগে জন্ম নেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক কিম্বার্লি প্রোস্টকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কানাডার পররাষ্ট্রনীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করেছেন প্রোস্ট। তবে এই মামলায় নিজেদের নাগরিকের পক্ষে অবস্থান নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বার্তা দেয়নি কানাডা সরকার।
প্রায় এক বছর আগে আইসিসির বিচারক কিম্বার্লি প্রোস্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযোগ, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। প্রোস্টের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে তার আর্থিক ও দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছেন। এমনকি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাও গ্রহণ করতে পারছেন না। এর আগে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে ভ্রমণ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অ্যামাজনের স্মার্ট স্পিকার কেনা বা থিয়েটারের টিকিট বুকিংয়ের মতো সাধারণ কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তার ভাষায়, এটি কেবল ব্যক্তিগত অসুবিধা নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।
এই নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করেছেন কিম্বার্লি প্রোস্ট এবং আরও দুই আইসিসি বিচারক। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন আইনি এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলাটি তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালনা করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নিজে এই মামলার পক্ষ নয় এবং আদালতের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততাও নেই।
প্রোস্ট কানাডার উইনিপেগে জন্মগ্রহণ করলেও তার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেয়নি অটোয়া। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তেরও প্রকাশ্য সমালোচনা করেনি কানাডা সরকার। অন্যদিকে, ফ্রান্স শুরু থেকেই বিচারকদের বিরুদ্ধে এমন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে কানাডার নীরবতা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
কানাডার সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক সাবিন নোলকে মনে করেন, এই ইস্যুতে কানাডার আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থানের দাবি করে আসছে। সেই বিবেচনায় একজন কানাডীয় বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক বিচারকের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে দেশটির আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। নোলকের ভাষায়, কানাডা এখন পর্যন্ত কার্যত নীরব থেকেছে, যা তাদের ঘোষিত মানবাধিকার নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কিম্বার্লি প্রোস্টের মামলায় কানাডা সরকার কোনো ধরনের সহায়তা দেবে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেয়নি। সংস্থাটির মুখপাত্র থিডা ইথ বলেন, বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। তাই চলমান আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকার বিস্তারিত মন্তব্য করতে চায় না। ফলে এখনো পরিষ্কার নয়, আন্তর্জাতিক আদালতের এই বিচারকের পক্ষে ভবিষ্যতে কানাডা কোনো কূটনৈতিক বা আইনি সহায়তা প্রদান করবে কি না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্তের উদ্যোগকে ওয়াশিংটন বারবার নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে, আইসিসির অবস্থান হলো যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার নিশ্চিত করাই তাদের দায়িত্ব। ফলে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং বিচারকদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
কিম্বার্লি প্রোস্টের মামলাটি এখন শুধু একজন বিচারকের ব্যক্তিগত আইনি লড়াই নয়; এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং মানবাধিকার বিষয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালতের রায় যেদিকেই যাক না কেন, কানাডার নীরব কূটনৈতিক অবস্থান ভবিষ্যতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

