আগৈলঝাড়ার শুটকি পল্লীর শুটকী মাছের চাহিদা দেশ ছাড়িয়ে এখন বিদেশেও
তপন বসু, বরিশাল
অ+ অ-প্রিন্ট
স্বাদু পানির দেশী প্রজাতির মৎস্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বরিশালের আগৈলঝাড়ার রাজাপুর শুটকি পল¬ীতে দেশী মাছ শুটকীর চলছে এখন ভরা মৌসুম। প্রকৃতিক পরিবেশে স্বাস্থ্য সম্মতভাবে উৎপাদিত এই শুটকী পল¬ীর শুটকী মাছের কদর এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। তবে আগের মত দেশী প্রজাতির মাছের স্বল্পতার কারণে হতাশায় ভুগছেন শুটকী পল¬¬ীর সাথে জীবিকা নির্বাহ করা মৎস্যজীবি পরিবারগুলো।

আগৈলঝাড়া উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের পশ্চিম সীমান্তবর্তী রাজাপুর গ্রাম। এই গ্রামের সাথেই ভৌগলকিভাবে জড়িত রয়েছে রামশীল, জহরেরকান্দি, ত্রিমুখিগ্রাম।  

রাজাপুর গ্রামের শুটকী ব্যবসায়ী অবনী রায় জানান, তিনি গত এক যুগ যাবত এই মৌসুমে শুটকী মাছের  ব্যবসা করে আসছেন। অবনী বাড়ৈ বলেন, রাজাপুর, রামশীল, জহরেরেকান্দি গ্রামসহ এ অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক পরিবার শুটকী মাছের ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে এক পাশে সন্ধ্যা নদী অববাহিকা এলাকা অন্য পাশে কোটালীপাড়ার বিল এলাকার মধ্যবর্তী উপজেলার পয়সারহাট-ত্রিমুখী-রাজাপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শুটকি পল¬ী। 

বিলাঞ্চলের স্বাদু ও মিঠা পানির নানা প্রজাতির শুটকী মাছ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানী করা হচ্ছে। কোন প্রকার রাসায়নিক বা কেমিক্যাল ব্যবহার না করায় শুধুমাত্র প্রকৃতির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা শুটকী পল্লীর বিভিন্ন প্রজাতির দেশী মাছ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলসহ এখন ভারতের আগরতলা পর্যন্ত ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

তবে আগের তুলনায় দেশী ছোট পুটি, দেশী সরপুটি, পাবদা, কৈ, শোল, রয়না, খলশা, মাছসহ দেশী প্রজাতীর অনেক মাছের সংখ্যা এখন অনেক কমে গেছে। দু¯প্রাপ্য হয়ে উঠেছে অনেক প্রজাতির দেশী মাছ। শুটকী পল্লীর সাথে জড়িত পরিবারগুলো মৌসুমী লাভের আশায় বছরের আশ্বিন মাসের প্রথম থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত ছয় মাস এই পেশায় নিয়োজিত থাকে। এই শুটকী পল্লীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাহিদা রয়েছে সিধঁল শুটকীর। যার প্রধান চাহিদা রয়েছে ঢাকা ও চট্টগামের বাজারে। সৌখিন ক্রেতারাও এই শুটকী পল¬ী দেখতে এসে তাদের চাহিদানুযায়ি শুটকী মাছ ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। 

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বাজার থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যায়। আবার ঢাকার কাওরান বাজার মোকামে গিয়েও পাইকারী মাছ বিক্রি করেন ব্যবসায়িরা। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরাই মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যমে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে শুটকী মাছের ব্যবসা করলেও মৌসুম শেষে ওই দাদন ও ঋণের টাকা পরিশোধ করে তাদের হাতে আর তেমন লাভ থাকে না। মৌসুম শেষে তাদের জীবনে নেমে আসে হতাশা।

স্থানীয়রা জানান, একযুগ আগে ভৌগলিক পরিবেশের কারণে বানিজ্যিক ভাবে গড়ে ওঠা পয়সারহাট-রাজাপুর-ত্রিমূখী শুটকী পল¬ীতে দেশী প্রজাতির বিভিন্ন প্রকার মাছের মধ্যে পুঁঠি, শৌল, টেংরা, খলশা, পাবদা, কৈ, শিং, মাগুর, মেনি, ফলি, বজুরী, বাইন মাছ অন্যতম। এ শুটকী পল¬ীতে দেশী প্রজাতির মাছগুলো আশ ছাড়িয়ে কেটে, পানিতে পরিস্কার করে প্রাকৃতিক নিয়মে রোদে শুকিয়ে বিক্রির জন্য মজুদ করা হয়। এখানে ফরমালিনের মতো বিষাক্ত কোন রাসায়নিক দ্রব্য মাছে মেশানো হয়না। 

অবনী রায় আরো জানান, চাহিদার মধ্যে ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ থাকে পুটি মাছের ওপর। প্রতি মন পুঠি মাছ সাইজ ভেদে তাদের ক্রয় করতে হচ্ছে দুই হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকায়।  প্রতি মন বাইন মাছের দাম আট থেকে ১০ হাজার টাকা, বুজরী চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, যা এখন প্রায় পাওয়াই যায় না।

পল্লীর অপর ব্যবসায়ী মনমথ রায়, অশোক রায়, নরেশ তালুকদার বলেন, বাজার থেকে একমন কাঁচা মাছ ক্রয় করে শুকালে ১৫-২০ কেজি শুটকি মাছ পাওয়া যায়। গড়ে প্রায় তিন মন কাঁচা মাছ শুকালে এক মন শুটকি মাছ পাওয়া যায়। একমন শুটকি পুঁটি মাছ সাত থেকে আট হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। 

শুটকী পল্লীর মাছ কাটার কাজে নিয়োজিত রাজাপুর গ্রামের সন্ধ্যা অধিকারী, আয়না বেগম, পপি অধিকারী, শোভা রানী জানান, বছরে ছয় মাস মাছ কাটার সাথে তারা নিয়োজিত থাকলেও বাকি ছয়মাস কাটে তাদের অনাহারে-অর্ধাহারে। তারা বলেন, ছেলে-মেয়েরা স্কুলে লেখাপড়া করছে। মাছ কেটে যা আয় করি তা দিয়ে বহুকষ্ঠে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বর্তমানে শুকনা মৌসুমের শুরুতে মাছ বেশী পাওয়া গেলেও কার্তিক মাসের পর বিলে মাছ কম থাকায় তাদের দুঃখ দুর্দশা আরো বেড়ে যায়। 

শুটকী ব্যবসায়ী রাজাপুরের অবনী রায় বলেন, সরকারীভাবে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় প্রতি বছরই তারা ঋণগ্রস্থ হয়ে পরছেন। তাই শুটকী পল্লীর সাথে জড়িত মৎস্যজীবিরা বছরের পর বছর সরকারের সংশি¬ষ্ঠ মৎস্য বিভাগের কাছে সহজ শর্তে ঋণ দাবি করে আসলেও বরাবরই তা উপেক্ষিত হয়ে আসছে।

 

 

 

 

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:৩৩:২৮