পাগল মরলে বাত্তি জ্বলে মুন্সী মরলে জ্বলে না
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
অ+ অ-প্রিন্ট
কবে যেন বাংলাদেশ প্রতিদিনে সম্পাদক নঈম নিজামের ‘মধুচন্দ্রিমা শেষ মন্ত্রী-এমপিদের, এবার ঘোর কাটান’ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাংবাদিক সুলেখক সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘রাহুল গান্ধীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে’ দুই অসাধারণ লেখা পড়লাম। নঈম নিজাম আমার খুবই প্রিয়। মাস কয়েক আগে নাঙ্গলকোট গিয়েছিলাম। দুই যুগ আগে এক জনসভা করে গভীর রাতে নঈমের সঙ্গে নাঙ্গলকোট থেকে ঢাকায় ফিরেছিলাম। লেখাটা ছিল ফরেন সার্ভিসের ব্যর্থতা এবং বিদেশে নাগরিককে কোনো মূল্যায়ন না করা নিয়ে। আমরা যদি আমাদের অ্যাম্বাসিগুলোকে দেশের মানুষকে সেবা করার দিকে পরিচালিত করতে পারি, মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর ইচ্ছা জাগাতে পারি, ফরেন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মালিক নন, মালিক দেশের জনগণ এটা যদি বোঝাতে পারি অনেক ভালো হতো। প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সম্পর্কে বলতে গিয়ে নঈম নিজাম বড় কড়কড়ে সত্য উচ্চারণ করেছেন। এখন আর অতীতকে ভালো বলতে, অন্যের প্রশংসা করতে কেউ চায় না। সবাই নিজের প্রশংসায় ব্যস্ত। আগেও ছিল। তবে এতটা না। তখন মেয়ের প্রশংসা মায় করত, ছেলের প্রশংসা বাপে। কিন্তু এখন নিজের প্রশংসা নিজেই করে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সময় দারুণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আনন্দবাজার গ্রুপের যেন চোখ ছিলেন তিনি। মালদার মুকুটহীন সম্রাট এ বি এ গণি খান চৌধুরীর খুবই ভক্ত-অনুরক্ত। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের একনিষ্ঠ বিশ্বস্ত সাংবাদিক। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার ওপর লিখেছিলেন, ‘মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা’। সেখানে অনেকটা জায়গাজুড়ে আমি ছিলাম। তখন কাদের সিদ্দিকীর কথাই ছিল আলোচনার বিষয়। সেই সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই দামোদরদাস মোদিকে নিয়ে মারাত্মক এক সাহসী লেখা হাতে নিলেই পড়তে ইচ্ছা করে। আবার এই সময় মমতা ব্যানার্জি ব্রিগেড গ্রাউন্ডে প্রায় সব ভারতীয় নেতাকে নিয়ে মোদি হটাও আওয়াজ তুলেছেন। কী হয় ভবিতব্যই জানে। সময় বেশি নেই, বড়জোর আর মাত্র তিন মাস।

এদিকে সখীপুর উপজেলার দাড়িয়াপুরে এক মহান আধ্যাত্মিক সাধক ফালু চাঁদের মেলা। মেলা শুরু হয়েছে মাঘী পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে। আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে রশীদ বয়াতি বাসাইলের সুন্নাতে গান গাইতে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই রশীদ বয়াতি আমার ভাবশিষ্যে পরিণত হয়েছিল। বাউলরা সাধারণত খুবই আবেগপ্রবণ, প্রাণবন্ত হয়। ভালোবাসাই বাউলের সম্পদ। ’৭২ থেকে ’৭৫ কতবার যে এসেছে তার কোনো হিসাব নেই। ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তার প্রতিবাদে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে কাটিয়ে দেশে ফিরে আবার রশীদ বয়াতিকে পাই। রশীদ গাইত সাধনার জন্য। তত দিনে রশীদের সঙ্গে মমতাজের বিয়ে হয়েছে। দুজনই গান গায়। ঠিক তারিখটা মনে নেই। সুন্নার এক আসরে মমতাজকে নিয়ে রশীদ গিয়েছিল। তখনো মমতাজের তেমন নাম হয়নি। কেবল গাইতে শুরু করেছে। অনেক জোরাজুরি করে মমতাজকে দুই হাজার, রশীদকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। রশীদ গুরু মানত তাই টাকা নিতে চাইত না, তার পরও দিতাম। এরপর ধীরে ধীরে মমতাজের পরিচিতি বাড়ে। সখীপুরের দাড়িয়াপুর, সিলিমপুরে মমতাজকে নিয়ে আসর বসে। বেশ ভালো গান গায়। সত্যিই আল্লাহ মমতাজকে অভাবনীয় গলা দিয়েছেন। এমন সুরেলা গলা খুব বেশি মানুষ পায় না। রশীদ বয়াতির সঙ্গে মমতাজের ছাড়াছাড়ির কারণও গান। রশীদের গান ছিল সাধনা, গুরুভক্তি, মুক্তির চেষ্টা। আর মমতাজের উদ্দেশ্য জনপ্রিয়তা, নামকাম। তাই তাদের সংসার টেকেনি। অথচ রশীদ মমতাজকে খুবই ভালোবাসত। মমতাজের বাবা ছিলেন রশীদের গুরু। বাচ্চা মমতাজ গাইতে গাইতে ধীরে ধীরে রশীদের সঙ্গেই বড় হয়েছিল। কালিহাতীর ভুক্তায় রশীদের গানে শুনেছিলাম, ‘পাগল মরলে বাত্তি জ্বলে, মুন্সী মরলে জ্বলে না’। গানটি আমার ওপর খুব দাগ কেটেছে। কত জায়গায় গেছি, ইল্লি-দিল্লি, আগ্রা, জয়পুর, মুর্শিদাবাদ। তাজমহল, হাজার দুয়ারী, ফতেপুর, রাজস্থানে বড় বড় প্রাসাদ দেখতে পর্যটকরা যায়। কিন্তু কত রাজা-বাদশাহর কবর বিরান পড়ে আছে বাতি জ্বালাবার কেউ নেই, পড়ে থাকা ঝরাপাতা ঝাড় দেওয়ার কেউ নেই। কিন্তু পাগলের ব্যাপার তেমন নয়। মাঘী পূর্ণিমার পূর্ণ তিথিতে দাড়িয়াপুরের ফালু চাঁদের জন্ম। মেলার শুরু ১০-১৫ দিন আগে, পূর্ণিমার পরও চলে তিন-চার দিন। ১৫-২০ দিনে না হলেও ২০-২৫ লাখ লোকসমাগম হয়। পূর্ণিমার আগে-পরে দু-তিন দিন সারা দিনে ২-৩ লাখ মানুষ আসা-যাওয়া করে। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। বাড়ি থেকে মোরগ নিয়ে ফালু চাঁদের কবরের আশপাশে কোথাও জবেহ করে রান্নাবান্না করে খেয়ে-দেয়ে, ‘ফাইলা নাচে আমিও নাচি’ বলতে বলতে যেমন আসে তেমন চলে যায়। কেউ গাছের ফলমূল, কেউ হাঁস-মুরগি, ছাগল-ভেড়া, গরু- যে যার মতো নিয়ে আসে। রান্নাবান্না করে কিছু ফালু চাঁদের মাজারে দেয়, বাকিটা নিজেরা খায়- এভাবেই চলে আসছে তার মৃত্যুর পর থেকে। কত দিন চলবে সেও দয়াময় আল্লাহই জানেন। ২০০১-০২ সালে জঙ্গিবাদের উত্থানে মাজারে বোমা ফেটেছিল। তাতে চার-পাঁচ জন নিহত, ২০-২৫ জন আহত হয়েছিল। যারা বোমা ফাটিয়েছিল তারাও তিন-চার জন দাড়িয়াপুর বহেড়াতলির উত্তরে ধোপারচালায় নিজেদের বোমায় নিজেরা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। যারা ফালু চাঁদ পাগল সম্পর্কে জানে তারা সবাই মানে যে ফালু চাঁদ একজন জাগ্রত কামেল। কতজন কত মানত করে কারও পূরণ হয়, কারও হয় না। যদিও আমি আল্লাহ, রসুল ছাড়া অন্য কিছুতে বিশ্বাস করি না। সবার ভালো করা, যে যেখানে আনন্দ পায় সেখানে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।

ফালু চাঁদকে দেখেছি কিন্তু তার সান্নিধ্য পাইনি। সান্নিধ্য পেয়েছি হজরত শাহ সুফি সামান উল্যাহর। তার কবর তক্তারচালায়। আমার জীবনে তিনি এক বিস্ময়কর মানুষ। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে জুন-জুলাই মাসে শাহ সুফি সামান উল্যাহর সঙ্গে হতেয়ায় আমার প্রথম দেখা। আমি হতেয়ায় গিয়েছিলাম- কালিয়াকৈরের কিছু রাজাকার আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিল তাদের শর্ত ছিল আমি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকলে তবেই তারা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করবে। তাই বাসাইলের কাউলজানি থেকে নৌকায় পাথরঘাটা-বাঁশতলী-পেকুয়া হয়ে হতেয়া গিয়েছিলাম। আমি ছিলাম স্কুল মাঠে, দলের কয়েকজন হতেয়া বাজারে গিয়েছিল। সেখানে তাদের সঙ্গে লাল গেরুয়া পরা শাহ সুফি সামান উল্যাহর দেখা। হাতে খমক, খালি গায়, লাল গেরুয়া, দেখতে অভাবনীয়, কথাবার্তা আরও বিচিত্র। কথাবার্তা স্বাভাবিক নয়। প্রতিটি কথায় একটা না একটা লেজ জুড়ে দিতেন। আমার সামনে খমকে টুংটাং করছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমারে অ্যারেস্ট কইরা ফালাইছে, আমারে ধইরা আনছে। তুমি কি কমান্ডার? এখন আমারে কী করবা? গুলি কইরা মাইরা ফালাবা?’ না না। আপনাকে অযথা গুলি করতে যাব কেন! আপনার বাড়ি কোথায়? কী করেন? তিনি তার নিজের অঙ্গনেই ছিলেন। আমাদের কথার তেমন যথাযথ উত্তর দিচ্ছিলেন না। তবে বুঝতে পারছিলাম এলাকার সবাই তাকে চেনে। খেতে বললে প্রথম কোনো আগ্রহ দেখালেন না। গাছের নিচে বসে টুংটাং করছিলেন, আপন তালে গান গাইছিলেন। হঠাৎ কানে এলো- ‘আহা! এবার এমন হারগিলারে কেরা দিল মাদবরী/আহা! সেই দুঃখে যে আমি মরি॥/ এবার দেখি, কত খাটাশবাবু দারগা/শিয়াল পণ্ডিত দফাদার-/হারগিলারে কেরা দিল মাদবরী।’ শুনলাম হতেয়া রাজাবাড়ীতে তার জন্ম। এলাকার মায়-মাতব্বররা পছন্দ করে না। কিন্তু গরিব মানুষ সবাই তার ভক্ত। ১২ বছর গহিন জঙ্গলে গর্ত খুঁড়ে ছিলেন। পেশাব-পায়খানা-গোসল-আসল ছাড়া কোনো দিন গর্ত ছাড়েননি। কত হবে ৬-৭ ফুট লম্বা পাশে গর্তে বছরের পর বছর কাটাতে তার কোনো কষ্ট হয়নি। এক দিনও নিজের খাবার নিজে সংগ্রহ করেননি। কোথাকার কে খাবার দিয়েছে কাউকে কখনো কিছু বলতে যায়নি। হয়তো কোনো দিন পাঁচজন খাবার এনেছে, পড়ে থেকেছে, কুত্তা-বিড়াল-শিয়াল-শকুনে খেয়েছে আবার কোনো দিন কোনো খাবারই আসেনি। এই সাধক পুরুষ কীভাবে কীভাবে যেন আমাদের লোক হয়ে গিয়েছিলেন, হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যেখানেই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প সেখানেই তিনি। একবার আমাদের পাথরঘাটা ঘাঁটির পতন হয়েছিল। ঘাঁটি ছেড়ে মুক্তিযোদ্ধারা রতনপুরে জসিমের বাজার পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছিল। খবর পেয়ে রা রা করে জসিমের বাজার গিয়েছিলেন এই আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুফি সামান উল্যাহ। কমান্ডারসহ যোদ্ধাদের একচোট বকাঝকা করছিলেন। তারপর লাফালাফি, নাচানাচি করে গাইছিলেন, ‘আরে তোরা সব জয়ধ্বনি কর,/তোরা সব জয়ধ্বনি কর।/মারো লাথি, ভাংগো ছাতি, আছে যত রাজাকর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ এ রকম গান শুনতে শুনতে দলনেতার সম্বিত ফিরে আসে। পরদিন সকালে তিনি নতুন উদ্যমে বেদখল হওয়া ঘাঁটি দখল নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন হানাদারদের ওপর। কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া হানাদারদের বিতাড়িত করে বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ দখল করে নেন। এমনই ছিলেন আমাদের সামান পাগল। কত জায়গায় কোনো খবর নেই হঠাৎ দেখি সামান উল্যাহ। কমান্ডাররা সবাই তাকে অপরিসীম সম্মান করত। কারণ আমি তাকে মান্য করতাম এটা দেখে কেউ তার কথা অমান্য করতে সাহস করত না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর হাতে অস্ত্র দেওয়া- নানা জায়গায় কীভাবে শাহ সুফি সামান উল্যাহ হাজির হতেন আমরা জানতেও পারতাম না। বঙ্গবন্ধু তাকে খুব পছন্দ করতেন। ঘাতকের হাতে নিহতের দু-তিন মাস আগে বার বার বলছিলেন, ‘বঙ্গপীর আমাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে চল। তাকে দেখব।’ নিয়ে গিয়েছিলাম গণভবনে। সামান ফকিরকে পেয়ে বঙ্গবন্ধু খুব খুশি হয়েছিলেন। মুখোমুখি আমার বামে সামান ফকির, ডানে অধ্যাপক ইউসুফ আলী অথবা মনসুর ভাই কেউ একজন ছিলেন। এ কথা ও কথা, নাশতা দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে সামান ফকির বার বার খোঁচা দিচ্ছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কই, আমি তো বঙ্গবন্ধু দেখি না।’ ফকিরের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘এই যে আমি, আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না?’ এই বলে চেয়ার থেকে উঠে ফকিরের দুই কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকি দিয়ে বলছিলেন, ‘এই যে এই আমি। আপনি আমাকে দেখছেন না!’ বঙ্গবন্ধুর থেকে সামান ফকির কম করে এক ফুট বেঁটেখাটো। শূন্যের দিকে মুখ তুলে একটু রাগান্বিত সুরে বলেছিলেন, ‘আমি তো বঙ্গবন্ধু দেখি না। না দেখলে কী করে বলব?’ বঙ্গবন্ধু হো হো করে হেসেছিলেন। আমি হাসতে পারিনি। অন্যেরা হেসেছিলেন কিনা জানি না। এই সাক্ষাতের ৬০-৬২ দিন পর বিপথগামী ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হন। আমরা বঙ্গবন্ধুকে দেখলেও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অলি এ কামেল সামান ফকির তার রুহানি চোখে দুই মাস আগেই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পাননি।

তার মৃত্যুটাও বিচিত্র। অনেক জায়গায় তিনি আস্তানা গাড়তেন। একসময় ৮-১০ বছর সখীপুর সদরে ছিলেন। একেবারে শেষে তক্তারচালা। এক বিকালে টাঙ্গাইলের বাড়িতে বসে ছিলাম। সামান ফকিরের ছোট ছেলে মোশারফ। আমার মতো একটু বাউণ্ডুলে স্বভাবের। স্বাধীনতা আমার বাউণ্ডুলে দস্যিপনা কেড়ে নিয়ে দেশের মানুষের ভালোবাসার গণ্ডিতে বেঁধে ফেলেছে। কিন্তু সামান ফকিরের ছেলের দস্যিপনা তখনো যায়নি। আমাকে দেখেই, ‘কাকা, বাবাকে যদি দেখতে চান তাহলে তাড়াতাড়ি দেখা করুন। বাবা হয়তো আর বেশিদিন বাঁচবে না। খুব শরীর খারাপ।’ জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোর বাবা বলেছে? ‘না। আমি নিজেই বলছি।’ কেন যেন হঠাৎ করে বলেছিলাম, তোর বাবা চলে যাবে আমি একটুও জানব না! তোর কাছ থেকে খবর নিতে হবে! বুকের ভিতর নাড়া লাগবে না! এরপর প্রায় ছয়-সাত মাস চলে গিয়েছিল। দু-তিনবার লোকজন দিয়ে এটা-ওটা পাঠিয়েছি। কিন্তু আর দেখা করতে যাইনি। হঠাৎই মনে হয়েছিল, আমি অত জোর দিয়ে বললাম, একবারও যে গেলাম না। সত্যিই যদি ফকির চলে যান তখন কী হবে। নানা কিছু ভাবতে ভাবতে গিয়েছিলাম তক্তারচালায়। তক্তারচালা বাজার থেকে এক-দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে এক অতি সাধারণ বাড়িতে ঢেঁকিঘরে ছিলেন। এক মহিলা তার সেবাযত্ন করতেন। আমি যাওয়ার পর খুব খুশি হয়েছিলেন। সন্ধ্যার আগে আগে গিয়েছিলাম। আমি যাওয়ার মিনিট বিশেক পর বাড়ির উঠানে এসে শুইলেন। আরও মিনিট বিশেক পর উঠে বসলেন। গত ছয়-সাত দিন নাকি এপাশ-ওপাশ করতে পারতেন না। একেবারে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন। আমাকে চেপে ধরলেন, ‘বঙ্গপীর, নবীনকে বলছি আমাকে জায়গা দিতে। ও দিচ্ছে না। আমি তো খাঁচা বদল করব, বডি চেঞ্জ।’ সঙ্গে সঙ্গেই নবীনকে বলেছিলাম, তুমি ফকিরকে জায়গা লিখে দাও। সে ১০ ডিসেমল জায়গা পরদিন রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিল। রেজিস্ট্রি দলিলের একটা ফটোকপি নিয়ে মিষ্টিসহ নবীন যখন তার সঙ্গে দেখা করে সে খুব খুশি হয়। নবীনকে খুব দোয়া করে। সেই রাতেই ১১টায় সে ইহলোক ত্যাগ করে। আমি রাত ২টায় খবর পেয়ে সকালে গিয়ে তাকে সখীপুর হাসপাতালে দেখি। আমার মনে হয়েছিল সামান ফকির যেদিন থাকবে না সেদিন সমস্ত সখীপুর বেদনায় মুহ্যমান হয়ে পড়বে। কিন্তু তেমন দেখিনি। অন্য দিনের মতোই ছিল সখীপুর। ৮ অক্টোবর পূর্ণতিথিতে সামান ফকিরের মেলায় প্রচুর লোক হয়। কিন্তু ফালু চাঁদের মতো নয়।

ফালু চাঁদের আদি বাড়ি বাসাইল থানার দেউলীতে। দুটি বা তিনটি বিয়ে করেছিলেন। মানুষজনকে কাছে ভিড়তে দিতেন না। থুথু ছিটাতেন, গালি দিতেন। কামেলরা ধরা পড়তে বা প্রকাশ হতে চায় না। ফালু চাঁদের ব্যাপারও তাই। এখানে ওখানে নানা জায়গায় দিন কাটাতেন। শেষের দিকে দাড়িয়াপুরের এক ধনী আদিবাসী মান্দাইর বাড়িতে থাকতেন। ইচ্ছা হলে কাজ করতেন, ইচ্ছা না হলে করতেন না। বাড়ির মালিককে কখনো আদর করতেন, কখনো গালাগাল করতেন। মনে হতো বাড়ির মালিক মান্দাই নয়, ফালু চাঁদই যেন প্রকৃত মালিক। মান্দাইয়ের স্ত্রী ছিলেন ফালু চাঁদের অসম্ভব ভক্ত। একবার মান্দাই কোথায় কোনো কাজে গিয়েছিল। স্ত্রীকে বলে গিয়েছিল বাড়ির পাশের জমিটা বোনার সময় হয়েছে। তার আসতে দেরি হলে যেন সময়মতো বুনে ফেলে। কাজের লোকেরা জমি তৈরি করে যেদিন বীজ ছিটাতে যাবে সেদিন ফালু চাঁদ রেগেমেগে অস্থির। অকথ্য গালাগাল করে কাজের লোকদের তাড়িয়ে দেয়, ‘তোরা কেউ জমিতে যাবি না। আমি বীজ ছিটাব।’ যে জমিতে ৮-১০ ধামা বীজের দরকার সেই জমিতে আধা ধামা ছিটিয়ে বাকিটা ফিরিয়ে এনেছে দেখে মান্দাইর স্ত্রী ভীষণ চিন্তিত। শুধু ১০ ধামার জায়গায় আধা ধামা বীজ ছিটানো নয়, সাত দিনের মধ্যে কেউ যদি জমিতে যায় তাকে কেটে টুকরো করে ফেলবে। এক দিন পর মান্দাই এসে সব শুনে মহাচিন্তিত। সারা বছরের খাবার যে জমিতে হয় সেখানে ১০ ধামার জায়গায় আধা ধামা বীজ ছিটিয়েছে। খেতটা যে পতিত যাবে। আবার নতুন করে যে বীজ ছিটাবে তাতেও পাগলের বারণ। আগেই বলেছি মান্দাইর স্ত্রী পাগলের খুবই ভক্ত। সে স্বামীকে বোঝায়, ঠিক আছে পাগল যখন বলছে ওর কথা শুনো। আমাদের তো শুধু ওই জমিই নয়, আরও অনেক আছে। তাই কোনো অসুবিধা হবে না। মান্দাই মেনে নেয়। কিন্তু একটা ভালো জমি পতিত থাকবে সে চিন্তা মাথা থেকে দূর করতে পারে না। সাত-আট দিন পর পাগলের অনুমতি নিয়ে খেতে গিয়ে মান্দাই অবাক! চারপাশের খেতের চাইতে তার চারা ভালো হয়েছে। সে অবাক হয়ে বাড়ি ফেরে। স্ত্রীকে বলে এ কী করে সম্ভব। এত অল্প বীজে এত চারা হলো কী করে? গাছ বড় হতে থাকে। চারপাশের সব খেতের চাইতে পাগলের বোনা খেতের ধান হৃষ্টপুষ্ট। একসময় ধান পেকে বেরোলে কেটে ঘরে তোলা হয়। দেখা যায় আশপাশের সব জমির চাইতে পাগলের বোনা ধান দ্বিগুণ হয়েছে। এমনি অনেক কেরামতি ছিল ফাইলা পাগলের। অনেকেই জানে না ফালু চাঁদ কে, কী তার পরিচয়। কিন্তু ছনের ঘর পাকা মাজার হয়েছে, লাখো মানুষের মেলা হচ্ছে। আশপাশের লোকেরা মেলাতে যা বেচাকেনা করে তাতেই তাদের সারা বছর চলে। পায়ের ওপর পা তুলে খায়, সংসার চালায়। তাই মনে হয় রশীদ বয়াতির কথাই সত্য- ‘পাগল মরলে বাত্তি জ্বলে মুন্সী মরলে জ্বলে না।’  লেখক : রাজনীতিক।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৭:৩৯:৩২