জুয়ার বাজারে জুয়াড়িদের সঙ্গে খেলবেন না
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
বহুল আলোচিত শেয়ারবাজার দীর্ঘ বিপর্যয়ের পর আবার তেজিই নয়, যেন অগ্নিমুখর হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। জুয়াড়ি সিন্ডিকেটগুলো মাঠে নেমেছে। লুটেরা খেলোয়াড়রা হাতে নাটাই রেখে সুতা ছাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগমন ঘটছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আগমনে ব্রোকার হাউসগুলো সরগরম। আগে যেখানে বসে বসে মশা মারতেন, এখন সেখানে সূর্যাস্তের পর অফিস করছেন। সর্বত্র আবার আলোচিত শেয়ারবাজার।   বাজারের লেনদেন ও সূচক এতটাই বাড়ছে যে, গণমাধ্যমে খবর নতুন বছরের জানুয়ারি ১৪ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে প্রধান সূচক প্রায় সাড়ে ৪০০ পয়েন্ট বেড়েছে। আর লেনদেন বেড়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। বাজারের এই টানা উত্থানে কিছুটা শঙ্কিত বিশ্লেষক ও বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এমনকি এফবিসিসিআইর সাবেক প্রেসিডেন্ট সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী থেকে সব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। থামাতে বলেছেন। তার বক্তব্য পর্যবেক্ষণই নয়, নানাভাবে বিশ্লেষণ করার মতোন।

অন্যদিকে, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের করুণ পরিণতির পর যেসব বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারকে লুটেরাদের স্বর্গভূমি হিসেবে অভিশাপ দিয়ে চলে গিয়েছিলেন, তারা সেখানে আবার ফিরে আসছেন। এমনকি, নতুন বিনিয়োগকারীদেরও আগমন ঘটেছে। গত নভেম্বর থেকে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক উত্থান পর্বের শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিএসইর প্রধান সূচক পাঁচ হাজারের পর সাড়ে পাঁচ হাজারের মনস্তাত্ত্বিক সীমাও অতিক্রম করেছে। লেনদেন ২০১০ সালের অবস্থানকে অতিক্রম করেছে।

যদিও গত বছরের জুন-জুলাই থেকে বাজারে মুখে মুখে আলোচনা ছিল এ বছর হবে শেয়ার ব্যবসার বাজার। বছরের শুরুতেই সেটি সত্য হয়েছে। গত ডিসেম্বরে তিন দিনব্যাপী পুঁজিবাজার মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেন বলেছিলেন, শেয়ারবাজারের সূচক নিয়ে সরকারসহ কারও ভয় বা উদ্বেগের কিছু নেই। বাজারের নিজস্ব শক্তি বা গতিতে সূচক যদি ১০ হাজারও হয়, তাতে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। তার এ বক্তব্যের পর বাজার আরও গতি পায়। কিন্তু খায়রুল হোসেনের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন মাত্র সাতটি খারাপ কোম্পানির তদন্ত করছেন? কেন ২৫টির নয়? কেন খারাপ কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসার অনুমতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যেখানে সতর্ক করছেন, অর্থমন্ত্রী সেখানে কেন বলতে গেলেন, সরকারের দুই বছর মেয়াদে বাজার আরও শক্ত হবে; যদি পতন হয় কে নেবে দায়?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ জানুয়ারি ‘বিএসইসি’র দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করতে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে পরিষ্কার বলেছেন, গুজবে বিনিয়োগ করলে তার দায় নিতে হবে নিজেকে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যেখানে সেখানে একটা বিনিয়োগ করে তারপর সব হারিয়ে... তারপর আসে কি, সব সরকারের, সব দোষ অর্থমন্ত্রীর। এটা যেন না হয়। ’ একই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ পূর্তির আরও দুই বছর বাকি। এ সময়ে পুঁজিবাজার আরও শক্ত ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এটা আমার দৃঢ়বিশ্বাস। পরবর্তীতে জেলায় জেলায় উন্নয়ন মেলায় পুঁজিবাজারের উপস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অনেকে মনে করেন অর্থমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, সরকারের আরও দুই বছর মেয়াদ রয়েছে। এতে করে পর্যবেক্ষক বা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে যে, এই দুই বছরে শেয়ারবাজার চাঙ্গাই থাকবে। কারণ নির্বাচনের আগে শেয়ারবাজারে বিপর্যয় ঘটলে সরকারের দায় না থাকলেও সমালোচনার ঝড়ের ধাক্কা তাকেই নিতে হবে। কিন্তু যে বাজারের দায় সরকারের নেই সে বাজারের আকস্মিক পতন এলে দায় কি তখন অর্থমন্ত্রী এড়াতে পারবেন? সরকার কি সমালোচনার তীরে  ক্ষতবিক্ষত হবে না। বিএসইসির চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর তিন মাসের মধ্যে বাজার চাঙ্গা করার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা বহু আগেই ব্যর্থতায় বাসি হয়েছে। তিনি যে মন্তব্য করেছেন তাতে তৃপ্তির ঢেঁকুর উঠেছে। সরকারও দেশবাসীর সামনে বাজার চাঙ্গা হওয়ার কৃতিত্ব নিচ্ছেন। কিন্তু ’৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ার বিপর্যয়ের পরে দুটি সত্য জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে। এক. শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়করা বিনিয়োগকারীদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে নিরাপদ জীবনযাপন করেছেন। অনেকে মামলা-মোকদ্দমার জাল থেকে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে বহাল তবিয়তে। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে দুই হাতে টাকা কামিয়েছেন। মাঝখানে ৩২ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী যাদের সঙ্গে দেশের এক কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত তাদের রিক্ত, নিঃস্ব হতে হয়েছে। শেয়ারবাজারের অতীত বেদনা ও কলঙ্কের। লুটেরা সিন্ডিকেট, জুয়াড়ি সিন্ডিকেট পর্দার অন্তরালে থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে শেয়ারের দাম ওঠানামা করিয়ে লাভবান হয়ে চলে যায়। অন্যদিকে বাজার যখন চাঙ্গা হয়, পতঙ্গ যেমন আগুনে পড়ে আত্মাহুতি দেয় তেমনি লোভের বশবর্তী হয়ে বেহিসাবি লাভের আশায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পেনশনের টাকা, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, গহনা বিক্রির অর্থ, জমি বিক্রিই নয়; ঋণ করে টাকা এনেও সর্বস্ব বিনিয়োগ করেন। বাজার যখন পতন হয় তখন রিক্ত, নিঃস্ব হয়ে ভিক্ষা করেন, ক্রন্দন করেন। আর তাদের তপ্ত দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে নীতিহীন, লোভী, লুটেরা জুয়াড়িদের কারণে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি শেয়ারবাজার হয়ে পড়ে অভিশপ্ত। মানুষের কাছে হয়ে ওঠে ভয় আর ভীতিকর জায়গা। অথচ অর্থনীতিতে শিল্পের বিকাশে অন্যতম সহায়ক শক্তি হচ্ছে শেয়ারবাজার। শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নিয়ন্ত্রণ থাকে লুটেরা ও বিনিয়োগকারীদের। লুটেরারা তাদের ছকটা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন না।

এখানে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের নিরাপত্তার স্বার্থে হিসাব-নিকাশের জায়গাটিকে পরিষ্কার ধ্যান-ধারণার মধ্যে অভিজ্ঞতার আলোকে আনতে হবে। শেয়ার কিনবেন কিন্তু জানবেন না, কোন শেয়ার কিনছেন? মন্দ শেয়ার নাকি ভালো শেয়ার? মন্দ শেয়ারে লাভের চিত্র যত দ্রুতই ঊর্ধ্বমুখী থাকুক না কেন, তার পতনও ততটা আসন্ন থাকে। অন্যদিকে, ভালো শেয়ার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে পতিত হলেও ধৈর্য ধারণ করে পড়ে থাকলে বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব হয়ে ফিরতে হয় না।

খোঁজখবর নিয়ে যতদূর জেনেছি, বর্তমানে প্রায় ৬০টি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ২০-২৫টি কোম্পানির শেয়ার হচ্ছে খারাপ শেয়ার-জেড ক্যাটাগরি। কিন্তু বাজারের সূচক বৃদ্ধিতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন বা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাত্র সাতটি কোম্পানির তদন্ত করছে। বাকিদের তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন? এটা বড় চিন্তার বিষয়।

২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির পর সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রধান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। বর্তমান বাজার ফের যেভাবে পাগলা ঘোড়ার মতো তেজিভাব নিয়েছে তা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে খুব বেশি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বলে আমার মনে হচ্ছে না। এদিকে ব্যাংকে আমানতের সুদহার কম, তাই কিছু মানুষ বাড়তি মুনাফার আশায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকেছেন। আর পুরনো খেলোয়াড়রা সেটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো খেলাধুলা চালাচ্ছেন। তাই এ অবস্থায় নতুন করে যারা বাজারে ঝুঁকছেন, তাদের অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ এটা বাজারের স্বাভাবিক শক্তি নয়।

কিন্তু তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী। সবাই জানেন শেয়ারবাজারে তার ক্লিন ইমেজ রয়েছে। তিনি বলেছেন, বাজার নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তবে ঊর্ধ্বমুখী বাজারে লাভের প্রলোভনে পড়ে ঋণ বা ধারদেনা করে কারও বিনিয়োগে আসা উচিত নয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলেছেন, শেয়ারবাজারে বর্তমান সূচক যে পর্যায়ে গেছে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যাবে না। সূচক নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আর বাজারের লেনদেন যেখানে পৌঁছেছে তা সামলানোর দক্ষতা ও সক্ষমতা দুই-ই তাদের রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়েছে, সরকার, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ডিএসইসহ বিভিন্ন মহলের নানা উদ্যোগের ফলে অর্থনীতির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজার ভালো একটি জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। তারাও প্রধানমন্ত্রী ও শাকিল রিজভীর ভাষায় বলেছেন, ধারদেনা, বউয়ের গয়না, জমি বিক্রি করে কেউ বাজারে বিনিয়োগ করবেন না। কেবল তারা বাজারে আসুন, যাদের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে। তাও আবার উদ্বৃত্ত অর্থের পুরোটা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবেন না। কারণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও প্রতিটি শেয়ারের অপর নাম ঝুঁকি।

সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন বাজার চাঙ্গা করার তৃপ্তিতে আত্মহারা। ব্রোকারেজ  হাউসগুলো নিয়ে  ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বাজার চাঙ্গা করার জন্য যেমন ভূমিকা রেখেছেন তেমনি বাজার যত ঊর্ধ্বমুখী বা চাঙ্গা হবে যত সুন্দর কথাই বলুন না কেন; তাদের নিজেদের লাভটাই বড় করে দেখবেন। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধস নামার পর ব্রোকারেজ হাউসগুলো রীতিমতো বিনিয়োগকারী শূন্য হয়ে পড়েছিল। অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও সেগুলোর শাখা অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা যত বিনিয়োগ করবেন, মন্দ শেয়ার কিনুন আর ভালো শেয়ার কিনুন তাদের আপত্তি জানানোর দায়িত্ব নয়। পরামর্শদানের দায়ও তাদের নয়। বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনলেই তারা তাদের কমিশন পেয়ে যাবেন। এখানে যত বিনিয়োগ তাদের ততই লাভ। শেয়ারবাজার বিশেষ করে ডিএসই, ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশনের দিকে তাকালে দুই-চারটা মার্কামারা মুখ চোখে ভাসে মানুষের। মানুষ জানে তাদের নাম। তারা ’৯৬ ও ২০১০-এর লুটের সাম্রাজ্যে খলনায়কের আসন পেয়েছেন। এদের সঙ্গেই পর্দার অন্তরালে রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা শক্তিধর লুটেরাদের নাম। তাদের সঙ্গে ধরি মাছ, না ছুঁই পানি— এমন জুয়াড়িদেরও সিন্ডিকেট রয়েছে। অ্যালসেসিয়ান কুকুরের মতো পর্যবেক্ষকদের অনুসন্ধিত্সু মন নানা গ্রুপে বিভক্ত জুয়াড়ি সিন্ডিকেটদের খবর পায়। কিন্তু তাদের নাম নেওয়া যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। এমনকি ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযুক্ত বিদেশে পলাতক মাফিয়ার হাতও খেলছে বাজারের ভিতরে। ভয়টা এখানেই। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও এখনই বাজারের ভিতর চোখ ঘুরাতে হবে। আমরা চাই, শেয়ারবাজার চাঙ্গা থাক। কিন্তু স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল থাক। বড় ধরনের উত্থান কাম্য নয় যদি তার নেপথ্যে কারসাজির মাধ্যমে অনিবার্য পতন বিনিয়োগকারীদের কপালে লেখা থাকে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাক, নিরাপদ থাক। আমরা চাই না, ’৯৬ সালের মতো শেয়ার কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা ঘটুক। শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়করা অগাধ অর্থবিত্ত কামিয়ে নিয়ে সমাজে প্রতাপের সঙ্গে সবকিছুর ঊর্ধ্বে বাস করুক। আমরা চাই না, ২০১০  সালের মতো আকাশছোঁয়া জুয়ার বাজার শেয়ারবাজার একদিনে ভূমিধসে পরিণত হোক। রিক্ত-নিঃস্ব বিনিয়োগকারীদের গলায় আত্মহত্যার দড়ি পড়ুক। আমরা চাই না, তাদের কান্নায় ভারি হোক বাতাস। ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত হোক তদন্ত কমিশন। চিহ্নিত হওয়া লুটেরারা নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাক। আর মহান সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী বলুন, ‘ওদের হাত লম্বা, তাই ব্যবস্থা নিতে পারিনি। ’ মানুষের বুকের গহিন থেকে উঠে আসুক বেদনার সুপ্ত কথা, রাষ্ট্রের চেয়ে ওদের হাত কত লম্বা!

’৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারি নায়কদের বিচার হলে আজকের চাঙ্গা শেয়ারবাজার নিয়ে মানুষের ভয় ও উদ্বেগ দেখা দিত না। কথায় আছে, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই, ভয় হয়। বিনিয়োগকারীদের কাছে সবিনয় নিবেদন, বিনিয়োগ করুন, ভালো কোম্পানির ভালো শেয়ার কিনুন। উত্থান-পতনে অধৈর্য হবেন না। ঋণ করে ঘি খেতে আসবেন না। যেসব কোম্পানির উৎপাদন নেই, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তাদের শেয়ার লোভের বশবর্তী হয়ে কিনে বিপদ ডেকে আনবেন না। একেকটি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য গত পাঁচ বছরে কি ছিল সেটি যাচাই করুন। ১২ ধরনের কারসাজি রয়েছে শেয়ারবাজারে। আপনি বিনিয়োগ করছেন জুয়ার বাজারে লাভবান হওয়ার জন্য। জুয়াড়িরা খেলছে আপনাকে নিঃস্ব করে মোটা দান মেরে বেরিয়ে যেতে। জুয়াড়িদের সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পাঞ্জা লড়ার শখ মানেই রিক্ত-নিঃস্ব হওয়া, আত্মাহুতি দেওয়ার। ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করলে আপনার বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিজেই দিতে পারবেন। জুয়ার বাজারে গিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে খেলবেন না। আপনার সর্বনাশে বিনিয়োগের নিরাপত্তা কেউ দিতে পারবে না। কারণ শেয়ারবাজার কার্যত জুয়ার বাজার। আপনার লোভের লাগাম টেনে ধরার অগ্নিপরীক্ষা আপনাকেই দিতে হবে। উত্তীর্ণ হলেই নিজের সর্বনাশ নিজে ঠেকাতে পারবেন।   আর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ডিএসই ও ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

সর্বশেষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীর কাছে সবিনয় অনুরোধ, বাজারে পতন ঘণ্টা বাজলে ধাক্কা সরকারের গায়েই সজোরে আঘাত হানে। তাই কয়েকটি বিষয় এখনই ভাবতে হবে। যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আইসিবিকে কোনোভাবেই খেলার অংশ হতে দেওয়া যাবে না। ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টটির অ্যাক্ট পাস হলেও কাউন্সিল গঠন হয়নি। দ্রুত গঠন করতে হবে। উদ্যোক্তা পরিচালকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।   প্রতিটি কোম্পানির ওপর মনিটরিং বাড়াতে হবে। যেখানেই জুয়াড়ি সিন্ডিকেটের তৎপরতা সেখানেই খড়গ নামাতে হবে। শাস্তির আওতায় আনতে হবে। -বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ।

 

২৫ জানুয়ারি, ২০১৭ ০৭:০৩:১৪