জঙ্গি-দুর্নীতির বাইরের বাংলাদেশ
গোলাম মোর্তোজা
অ+ অ-প্রিন্ট
গোলাম মোর্তোজা
‘সমগ্র বাংলাদেশ’ ট্রাকের গায়ে লেখা থাকে, আমাদের চোখের সামনে ভাসে না। দেখি না হৃদয় দিয়ে। সেই বাংলাদেশকে অনুধাবন করি না। গ্রাম বাংলাদেশের প্রাণ। আমাদের চিন্তায় থাকে না প্রাণ। নাগরিক জীবন আমাদের বিভ্রান্ত করে দেয়। নিরাপত্তা, জঙ্গি-চুরি-দুর্নীতি-সন্ত্রাস-রাজনৈতিক অশ্লীলতা, আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। বাংলাদেশ মানেই হতাশা, নিরাপত্তাহীন আতঙ্কের জীবন। এর বাইরের যে জীবন, এর বাইরের যে মানুষ, যে বাংলাদেশ- একটু জানা এবং বোঝার চেষ্টা করি সেই বাংলাদেশকে।

১. সরকারি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ প্রায় ১৬ কোটি। বাস্তবে কমপক্ষে ১৮ কোটি। যখন লোক সংখ্যা ছিল ৭.৫০ কোটি, তখনও আমাদের খাদ্য ঘাটতি ছিল। খাদ্যের অভাব-অনটন ছিল। আজ খাদ্যে ঘাটতি নেই। ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য বাংলাদেশের কৃষক নিজে উৎপাদন করেন। গর্ব করে আমরা চাল রফতানির কথা বলি। অথচ স্বাধীনতার পর থেকেই সরকার পরিচালনাকারীরা কৃষকের কথা আলাদা করে ভাবেনি। কারও ভাবনার ওপরে নির্ভর করে কৃষক বসে থাকেননি। ৪৫ বছরের বাংলাদেশে তার জীবনে কোনও রাজনীতি-হরতাল-ধর্মঘট ছিল না। তারা শুধু উৎপাদন করেছেন। খালেদা জিয়া সরকারের কাছে সার চেয়ে (করুণা নয়, কিনতে চেয়ে) তাদের প্রাণ দিতে হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সত্যিকার অর্থেই কৃষকের বন্ধু। আওয়ামী লীগ সরকার সার-বীজের জোগান দিয়েছে, কৃষক উৎপাদন করে তার প্রতিদান দিয়েছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। উৎপাদন খরচের চেয়ে অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হলেও, কৃষক উৎপাদন বন্ধ করে দেননি। এই কৃষক আমাদের হৃদয়ে থাকে না, আলাদা করে তাদের আমরা শ্রদ্ধা-সম্মান করি না।

২. একবারও কি ভেবে দেখেছি ১৮ কোটি মানুষের ওষুধের ৯৫% আমরা নিজেরা উৎপাদন করি। প্রায় ৫০টি দেশে আমরা ওষুধ রফতানি করি। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ওষুধ রফতানি করে ৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার আয় করেছে। আগামী ৬ বছরে তা ১০০ গুণ বৃদ্ধির টার্গেট নেওয়া হয়েছে। এই টার্গেট পূরণ মোটেই অসম্ভব নয়। আমরা জানিনা যে, আমাদের চার-পাঁচটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি আমেরিকায় ফ্যাক্টরি করছে। আমেরিকার ফ্যাক্টরিতে ওষুধ উৎপাদন করে, সেই ওষুধ আমেরিকা-ইউরোপের বাজারে বিক্রি করবে বাংলাদেশের কোম্পানি! এটা কিন্তু কল্পনা নয়, সম্পূর্ণ বাস্তবতা।

৩. তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে দ্বিতীয়। চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। গত বছর, এ খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ২৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার। যা প্রতিদিন বাড়ছে। প্রায় ৫০ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে পোশাক শিল্প খাতে। সমস্যা আছে, শ্রমিকের বঞ্চনা আছে, অর্জনও তো আছে।

৪. ইলেকট্রনিক পণ্যে বিপ্লবের নাম ওয়ালটন। টেলিভিশন-ফ্রিজ-এসি-মোবাইলফোন-মোটরসাইকেল নির্মাণ করে ওয়ালটন। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রতিষ্ঠান। ঘরের প্রায় সব পণ্য এখন তারা বিশাল ফ্যাক্টরিতে বাংলাদেশে উৎপাদন করছে। বাংলাদেশে যত ফ্রিজ, মোটরসাইকেলের চাহিদা, ওয়ালটন একা তার পুরোটা নির্মাণ করতে পারে। ওয়ালটনের ফ্রিজ ইতোমধ্যে বিশ্বের ১০-১৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। সরকার যদি আমদানিকৃত ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ওয়ালটনের মতো দেশি প্রতিষ্ঠানের সুবিধা আরও নিশ্চিত করত, বাংলাদেশের বাজার থেকে চীন-ভারতের মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি এমনিতেই উধাও হয়ে যেত। চীন ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও ওয়ালটন দানবীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠা করেছে, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড। দেশীয় প্রতিষ্ঠান পিএইচপি গ্রুপ মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গাড়ি নির্মাণ করছে বাংলাদেশে। আগামী দু’বছরের মধ্যে দেশীয় নতুন গাড়ি পাওয়া যাবে বাজারে।

৫. বিশ্বমানের ব্যাটারি নির্মাণ করে রহিম আফরোজ। রফতানি করে জাপানসহ পৃথিবীর বহু দেশে। পাদুকা শিল্পে অ্যাপেক্সসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি করছে।

৬. মানুষই তো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ঠিক কত মানুষ প্রবাসে থাকে সঠিক হিসাব নেই। ধারণা করা হয় এক কোটির ওপরে। এই এক কোটি মানুষ বিদেশ থেকে আয় করে দেশে পাঠিয়েছেন ১৫.৩১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। ভারতের (৩৬৩ বিলিয়ন ডলার) পরে পাকিস্তানের (২৩ বিলিয়ন ডলার) ওপরে বাংলাদেশের অবস্থান।

৭. এক সময় ঢাকার বাজার সয়লাব ছিল ভারতীয় মশলায়। এখন দেশের বাজারে ভারতীয় মশলা পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়নি। ভারতীয় মশলার জায়গা দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশের মশলা। প্রাণের সামগ্রী ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে পাওয়া যায়। টিস্যু, টয়লেট পেপার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক সামগ্রী উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, বাংলাদেশ রফতানিও করে। ভারতের সেভেন সিস্টারস রাজ্যগুলো, নেপাল, ভুটান বাংলাদেশের এসব পণ্যের বড় বাজার।

আম, লিচু উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভারতীয় আম লিচুর ওপর নির্ভর করতে হয় না। দেশীয় ফল, সবজি উৎপাদনে বিপ্লব করেছে বাংলাদেশ। মাছ-চাষেও বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বয়কর।

৮. এই সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশের মানুষ। মানুষের গতির সঙ্গে সরকারগুলো তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে সরকার নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তা দিয়ে মানুষকে ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। মালিকদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সস্তা শ্রমের কারণে পোশাক শিল্পের আজকের এত শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। সরকার পরবর্তীতে নানা সুবিধা দিয়েছে। তবে মূল কৃতিত্ব ব্যক্তি মালিকদেরই।

বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে গেছেন প্রায় সম্পূর্ণ নিজেদের চেষ্টায়। এখানে সরকারের ভূমিকা খুবই নগণ্য। নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থানে সরকারের চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংকের মতো এনজিও। ব্র্যাকের ওরস্যালাইন প্রজেক্ট তো সারা পৃথিবীর মডেল। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আলোচনা বেশি হলে, ওরস্যালাইন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন একটি অসাধারণ সাফল্য।

৯. মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জিডিপি, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, এসব হিসেবে নানা প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার ব্যাপার আছে। তা সত্ত্বেও উন্নয়ন যে হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের মানুষের যতটা শক্তি, সরকার ঠিক ততটাই দুর্বল। সরকারের ব্যবস্থাপনা যদি আর একটু ভালো হতো, অনিয়ম দুর্নীতি যদি আর একটু কমানো যেত, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি কাগজের চেয়ে বাস্তবে আরও অনেক বৃদ্ধি পেত।

মালয়েশিয়া থেকে দরিদ্র কর্মীরা অর্থ আয় করে দেশে পাঠায়। দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী কেউ অর্থ পাচার করে মালয়েশিয়া নিয়ে ‘সেকেন্ড হোম’ করে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরি সরকার ঠেকাতে পারে না, সরকারি ব্যাংক ডাকাতি হয়ে যায়। ধনীরা হাজার হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে ফেরত দেয় না। সরকারের সহায়তায় বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ লুটপাট করার সুযোগ পেয়ে যায়।

১০. সরকার যদি আর একটু আন্তরিক হয়, অন্যায়-অনিয়ম থেকে যদি একটু বেরিয়ে আসার নীতি নেয়, দেশ ও মানুষের প্রতি যদি আর একটু প্রেম-ভালোবাসার নীতি নিয়ে কাজ করে, বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন করে, সুবিধা নেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অল্প কিছু সংখ্যক জঙ্গি-সন্ত্রাসের কাছে ১৮ কোটি মানুষ পরাজিত হতে পারে না।

উৎপাদনের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন জনমানুষ, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির বাংলাদেশ নয়, আইনের শাসনের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে সরকারকে। -বাংলাট্রিবিউন

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

 

২৮ জুলাই, ২০১৬ ০৯:০৯:২২