সোনাগাছির সুখী মেয়েরা
বচ্চন গিরি
অ+ অ-প্রিন্ট
শুভজিৎ বসাক
একগাল দাঁড়ি গোঁফ। চোখে চশমা। বেশ হাসি হাসি মুখ। সুন্দর ভাবে বাস্তব ফুটে ওঠে যার কলমে তিনি শুভজিৎ বসাক। বছর ছাব্বিশের শুভজিৎ গল্প লেখেন।কলকাতার সাউথ সিটি রোডের বাসিন্দা শুভজিৎ একটি ঔষধ কোম্পানিতে চাকুরি করেন।নেশা গল্প লেখা। জীবনের অন্তিম পর্যায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবন যখন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মানব জীবনে যখন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে শুভজিতের গল্প ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। কখনো আনন্দ কখনো দুঃখ কখনোবা হাসি কান্নার মিশেল তার গল্পকে করে তোলে অতুলনীয়। ইতিমধ্যে দেশ ও বিদেশের বহু পত্র পত্রিকায় শুভজিতের বহু গল্প স্থান পেয়েছে। তার মধ্যে 'এখানে তবুও প্রয়াস', 'বোধী পর্না', 'শ্রীজন' ছাড়াও বিদেশের একটি অনলাইন পত্রিকায় গত দু বছরে মোট ১২৭ টি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। 'এই সময় 'সংবাদপত্রে প্রায়ই শুভজিতের লেখা প্রকাশিত হয়। প্রত্যেকটি গল্প অনন্য ও রুচিশীল সমাজব্যবস্থা সম্পর্কিত। মাত্র কয়েকদিন আগে প্রকাশ পেল তার গল্প 'সোনাগাছির সুখী মেয়েরা'।মোট দশটি পর্বে বিভক্ত এই গল্পে গল্পকার সমাজের পতিতা নারীদের প্রেম ও জীবন সংগ্রাম সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বারবার পড়লাম গল্পটা। গল্পে গল্পকার বেশ্যা পল্লীর এক নারীর জীবনচিত্র ও তার আনুষঙ্গিক পটভূমি তৈরী করেছেন।পারমিতা এই গল্পের নায়িকা। যে স্বামীকে হারিয়ে তাঁর একমাত্র শিশু সন্তানকে নিয়ে সব অত্যাচার সহ্য করেও শ্বশুর বাড়িতে একমুঠো ভাত আর শান্তির আশায় দিন যাপন করছিল।কিছুদিন পর অজানা এক জ্বরে তার বাঁচার একমাত্র অবলম্বন শিশু সন্তানও মারা যায়। ডাইনি অপবাদ দিয়ে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। গল্পের শুরু এখানেই। শুভজিৎ গল্পে সমাজব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন এটা মেনে নিতেই হবে। যতোই গল্পের ভিতরে প্রবেশ করলাম ততোই অবাক হলাম। দিকভ্রস্ট এক নারী বেঁচে থাকার জন্য উদ্দেশ্যহীন ভাবে ট্রেনে উঠে পড়েছেন। বিষন্ন সেই নারী পারমিতা যিনি এই গল্পের নায়িকা। পারমিতাকে দেখে বেশ্যা পল্লীর এক দালাল বুঝে যান যে সেই নারী সব কিছু খুইয়ে নিঃসঙ্গ। গল্পকার এখানেই অর্থাৎ তৃতীয় পর্বে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন সম্পূর্ণ ভাবে। গল্পটি পড়তে পড়তে সত্যিই বারবার ভাবছিলাম সেই মেয়েগুলোর কথা যারা একমুঠো ভাতের বিনিময়ে শরীর বিলিয়ে দিচ্ছে আজ। তবে গল্পকার বেশ সুন্দর ভাবে পারমিতার প্রেমকেও পরিস্ফুট করেছেন। রাহুল, এই গল্পের নায়ক। যে একাকী জীবন থেকে মুক্তি পেতে সোনাগাছিতে পা রেখেছিল। সেই পারমিতাকে প্রথম দেখেই ভালবেসে ফেলে। সোনাগাছির মতো জায়গায় প্রেম নিষিদ্ধ।সেখানে টাকার বিনিময়ে উলঙ্গ শরীর বিক্রি হয় প্রতিনিয়ত। তবু সেসব কিছুর তোয়াক্কা না করেই পারমিতা ও রাহুলের প্রেম শুরু হয়। বলু যে গল্পের খলনায়ক এবং বেশ্যা পল্লীর দালাল সে সব কিছু প্রত্যক্ষ করেছিল এবং পারমিতাকে নিষেধ করেছিল। পারমিতা বলুর কথায় কর্নপাত না করায় পারমিতার উপর শারিরীক অত্যাচার শুরু করে বলু| শেষ পর্যন্ত বেশ্যা পল্লীর তিতির নামে অন্য এক যৌন কর্মীর সহায়তায় বলু সাময়িক দমে যায়।কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি পারমিতা ও তিতিরের।বলুর হাতে খুন হয় পারমিতা ও তিতির।গল্পটি পাঠক মনকে গভীর ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে এটা জোর দিয়েই বলা যায়।গল্পকারের স্বার্থকতা এখানেই। 'সোনাগাছির সুখী মেয়েরা ' গল্পে অনুঘটকের মতোই বিট্টুকে উপস্থিত করেছেন গল্পকার।বিট্টু সোনাগাছিতেই ছোটর থেকে থাকে।পরিবার পরিজন হারিয়ে সোনাগাছি হয়ে ওঠে তার বাঁচার এক নিস্ফলা বসতি। সোনাগাছির যৌনকর্মীদের সকলের কাছেই বিট্টু খুব প্রিয়। সেখানকার সব নারীরাই তার ভগিনীসম।গল্পটি লিখতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে গল্পকারকে বলেই মনে হল।তবে গল্পকার যে খুব কাছ থেকে সোনাগাছির নারীদের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করেছেন তা নিশ্চিতভাবেই বলার অপেক্ষা রাখেনা। গল্পটি অনন্য এক লহমায় সমাজব্যবস্থাকে চোখে আঙুল দিয়ে নৈতিক পরিমাপ বুঝিয়ে দিয়েছে। পাঠকদের কাছে গল্পটি সমাদৃত হবে বলেই আশা রাখি।

 

২২ জুন, ২০১৬ ০১:২৫:৫৩