মদিনা শরিফের জুমার খুতবা
আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো গতি নেই
শায়খ ড. হুসাইন বিন আবদুল আজিজ ইসলাম
অ+ অ-প্রিন্ট
বর্তমানে যখন নানা সংকট ও বিপর্যয় দানা বেঁধেছে, বিপদাপদ মাত্রা ছাড়িয়েছে, মুসলিম জাতির ওপর শত্রুরা আধিপত্য কায়েম করেছে, যার ফলে বিভিন্ন বিপত্তি ও সমূহ দুর্দশা জন্ম নিয়েছে এরকম ক্রান্তিকালে মুসলিম জাতিকে এমন কিছু নিশ্চিত পথের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া বড়ই প্রয়োজন, যা তাদের সব আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করবে। এমন কিছু উপায় যা সব সংকট ও আপদ থেকে তাদের মুক্ত রাখবে। এ ক্ষণস্থায়ী জীবন পদে পদে ভোগান্তি ও কঠিন দুর্ভোগে ঠাসা। ‘নিশ্চয় আমি মানুষকে কষ্টনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা বালাদ : ৪)।

জীবনের এ কষ্ট ও দুশ্চিন্তা থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে বড় ভিত্তিটি নিহিত আছে গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর ভয়, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন, রাত-দিন তাঁর প্রতি মনোনিবেশ, তাঁর বড়ত্বের প্রতি নমনীয়তা ও সুখে-দুঃখে তাঁর সামনে নতজানু হওয়ার মধ্যে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার বিষয়কে সহজ করে দেন।’ (সূরা তালাক : ৪)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে কথা ও কাজে, আচরণ ও স্বভাবে এবং আত্মিক ও দৈহিক সবক্ষেত্রে যেসব শিক্ষা, নির্দেশনা ও উপদেশ প্রদান করেছেন সেখানেই পাওয়া যায় আল্লাহর প্রতি এ ধরনের নমনীয়তা, কাকুতি-মিনতি ও আত্মসমর্পণ। তিনি আবু মুসা (রা.) কে বলেন, “তুমি বলো ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি’। কেননা এটি জান্নাতের একটি রত্নভাণ্ডার।” (বোখারি ও মুসলিম)। আবু জর (রা.) বলেন, “আমার প্রিয় রাসুল আমাকে বেশি বেশি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি’ বলার উপদেশ দিয়েছেন।” এটি মহান একটি জিকিরের গুরুত্বপূর্ণ অসিয়ত। যার শব্দ অল্প, তাৎপর্য বিশাল, যা মুখে ধ্বনিত হবে, অন্তর নিশ্চিতরূপে ধারণ করবে তার মর্ম। ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় কল্যাণ বাস্তবায়নে আল্লাহ ছাড়া কোনো সহায়তাকারী নেই। তিনি যাকে সাহায্য করবেন, সেই সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। যাকে সাহায্য করবেন না, সেই হবে অসহায়। এটি এমন এক জিকির, যার দ্বারা বান্দা বিশ্বাস করে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় যাওয়ার কোনো ক্ষমতা তার বা অন্য কারোরই নেই। কোনো বিষয়ে বা পরিস্থিতিতে অথবা যে কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর প্রতাপ ও ভয় ছাড়া বান্দার কোনো শক্তি-সামর্থ্য নেই। এটি এমন এক জিকির যাতে বিশ্বাসী বান্দা তার প্রকৃত অভাব ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। কঠিন বিপদ ও প্রয়োজনের মুহূর্তে মহাপ্রতাপশালী স্রষ্টার প্রতি বান্দা তার বিনয় প্রকাশ করে। সে তাঁর কাছে সব ধরনের সফলতা ও বিজয় কামনা করে। আল্লাহ বলেন, ‘অচিরেই আল্লাহ কঠিন বিপদের পর সহজ পথ তৈরি করে দেবেন।’ (সূরা তালাক : ৭)।

ইবনুল কায়িম (রহ.) বলেন, কঠিন বিপদাপদ, দুঃসহ পরিস্থিতি, শাসকদের কাছে গমন ও মারাত্মক ঝুঁকির মুহূর্তে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি’ এ বাণীটির বিস্ময়কর প্রভাব রয়েছে। এ সম্পর্কে একটি অবাক করা ঘটনা শুনুন। যাতে সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর একক ক্ষমতার প্রমাণ প্রকাশ পায়। মোশরেকরা আউফ ইবনে মালেক আশজাঈর ছেলে সালেমকে ধরে বন্দি করার পর তিনি নবী করিম (সা.) এর কাছে এসে তা জানালেন। তার দারিদ্র্যের কথাও বললেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বললেন, “মুহাম্মদের পরিবারে সামান্য অবলম্বন ছাড়া কিছুই নেই, তুমি আল্লাহকে ভয় করো আর ধৈর্য ধর। আর বেশি বেশি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি’ বলতে থাক।” তিনি তাই করলেন। যখন তিনি বাড়িতে গেলেন হঠাৎ দেখলেন, তার ছেলে শত্রুর অগোচরে একটি উট নিয়ে চলে এসেছে। তিনি দরিদ্র ছিলেন। রাসুলের কাছে এলে তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি এ উটের বিষয়ে যা ইচ্ছা তাই করো। তুমি কী করবে তোমার উট দিয়ে?’ তখন আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য পথ বের করে দেন।’ (সূরা তালাক : ২)। সাহাবায়ে কেরাম তাদের পবিত্র জীবনে এ উপদেশগুলো পালন করতেন। তৌহিদ ও আনুগত্যের শক্তি তাদের কাছে প্রকৃত শক্তি ছিল। এটাই আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক ও তাঁর ওপর ভরসা। মুখে আল্লাহর জিকির থাকলে বিপদ যত কঠিনই হোক, তা সহজ হয়ে যায়। ফুজাইল (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি যদি সৃষ্টজীবের প্রতি নিরাশ হয়ে তাদের কাছে কোনো কিছু না চাও তাহলে তোমার মাওলা অবশ্যই তোমাকে দিবেন যখনই তুমি চাইবে।’ 

বিপদাপদ থেকে মুক্ত থাকার উপায় হলো, মানুষ যখন অনেক দোয়া ও কাকুতি-মিনতি করার পর বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়াকে সুদূরপরাহত মনে করবে, দোয়া কবুলের আলামত প্রকাশ পাবে না, তখন সে নিজেকে ধিক্কার দেবে। আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করবে। মনে করবে সে এ বিপদের উপযুক্ত। দোয়া কবুলের যোগ্য সে নয়। আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার প্রত্যাশী হবে। আর তখনই দোয়া কবুলের ও বিপদমুক্তির মুহূর্ত চলে আসবে। আল্লাহ ভগ্ন হৃদয়ের কাছেই থাকেন। তাই উম্মতের আজ এ পথ অবলম্বন খুবই জরুরি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “পৃথিবীতে যে ব্যক্তিই বলবে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া সুবহানাল্লাহি, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি’ তার গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার চেয়ে বেশি হয়।” (আহমাদ)।

হে মুসলিম, তুমি তোমার তৌহিদের বিশ্বাস ও শক্তি নিয়ে প্রশান্ত-হৃদয় হও, সুস্থির ও নিশ্চিন্ত হও। মুক্তি-পথের বিশ্বাসী হও। গোটা জাতিই যেন এমন হয়। বিশ্বের সব কিছুই আল্লাহর ক্ষমতার অধীন। জগতের যা কিছু আছে তার শক্তি যত বড়ই হোক আল্লাহর ক্ষমতা, প্রতাপ ও আদেশের কাছে নতি স্বীকার করবেই।

২২ মার্চ, ২০১৭ ১১:০৭:২৯