
কানাডার অন্টারিও প্রদেশে সরকার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড তার সরকার যে ফ্রিডম অব ইনফরমেশন আইন থেকে নিজেকে এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের কার্যালয়কে বাইরে রাখার পরিকল্পনা করছে, তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই সমালোচনার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। স্কারবোরো সাউথ ওয়েস্টের এনডিপির ক্রিটিক রাশেদ আহমেদ বললেন, আইনের বাইরে কেউ নয়।
তারা এমন একটি আইন আনতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রিমিয়ার, মন্ত্রিসভার মন্ত্রী এবং সংসদীয় সহকারীদের কার্যালয়কে এফওআই আইনের আওতার বাইরে রাখা হবে। এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রেক্ষাপট। সম্প্রতি একটি মামলায় গ্লোবাল নিউজ প্রিমিয়ারের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড চেয়ে আবেদন করে। আদালতে সেই মামলায় সরকার পরাজিত হয়। এর পরপরই সরকার প্রশাসনিক নথিপত্র ও যোগাযোগের ওপর গোপনীয়তা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড সরকারি কাজের জন্য প্রায়ই অফিসিয়াল ফোনের বদলে ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহার করেন যা ভবিষ্যতে তথ্যপ্রাপ্তি সংক্রান্ত বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সোমবার প্রিমিয়ার ফোর্ড তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, এই পরিবর্তন “অপরিহার্য”। তার দাবি, প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করেন, এবং এসব তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা তার দায়িত্ব। তিনি বলেন, “আমি আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হতে দিতে পারি না। আমি তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করতে শপথবদ্ধ।” এছাড়াও তিনি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন। তার মতে, বিদেশি শক্তি বিশেষ করে চিন কানাডাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করছে। তিনি দাবি করেন, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি খাত পর্যন্ত এই প্রভাব বিস্তৃত, এবং তথ্য সুরক্ষার জন্য এই আইন প্রয়োজন।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা উঠেছে। বিরোধী দল, স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত সংগঠন এবং গণমাধ্যমের অনেকেই মনে করছেন, এই উদ্যোগ সরকারের জবাবদিহিতা কমিয়ে দেবে। সমালোচকদের মতে, প্রিমিয়ারের ফোন রেকর্ড বা যোগাযোগের তথ্য গোপন রাখা মানে হলো তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কার সঙ্গে আলোচনা করছেন, কোন কোম্পানি বা গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে এসব তথ্য জনসাধারণ জানতে পারবে না। এতে করে সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠতে পারে এবং স্বার্থের সংঘাত চিহ্নিত করাও কঠিন হবে।
এই ইস্যুটি মূলত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধের সংঘাতকে সামনে এনেছে একদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তা, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। একদিকে সরকার বলছে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এই আইন বাস্তবায়িত হলে সরকারের ওপর গণতান্ত্রিক নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়বে।
অন্টারিও সরকারের এই প্রস্তাবিত আইন এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে এটি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ভবিষ্যতে এই আইন কার্যকর হলে তা শুধু অন্টারিও নয়, বরং কানাডার অন্যান্য প্রদেশেও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মানদণ্ডকে প্রভাবিত করতে পারে। গোপনীয়তা রক্ষার আড়ালে যদি তথ্যপ্রবাহ সীমিত হয়ে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

