
এক সময় মনে হতো জীবনটা অনেক বেশী বড় , একদম সামনের দিকে এগুতেই যেনো চায় না। আর এখন মনে হয় জীবনটা বড্ড বেশী ছোট ।এইতো সেদিন শুরু হোল এখনই আবার ফুরিয়ে যাবার সংবাদ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
একটা বিশাল লম্বা মই ছিলো আমার। জীবনের প্রথম দিন থেকেই মইয়ের প্রথম সিড়িতে পা রেখে উঠতে লাগলাম । ধীরে ধীরে উঠতে উঠতে অনেক গুলো সিঁড়িই উঠে গেলাম। বুঝতেই পারলাম না চোখের পলকে কি করে এতো গুলো সিঁড়ি পেছনে ফেলে এলাম।মাঝে মাঝে ভাবি মইয়ের প্রায় শেষ প্রান্তে যদি চলে আসি তাহলে কি হবে আমার? আমিতো ভাবি আমি এখনো মইয়ের মাঝা মাঝি পথের যাত্রী ।
বয়েস বাড়ার কথা মোটেও চিন্তা করি না ভাবি বয়েস তো শুধুই একটা সংখ্যা ।কিন্তু আমার মনের চিন্তাকে আমার দেহ থোরাই পাত্তা দিচ্ছে। সে বলে তুমি বুড়িয়ে যাচ্ছ কেনো ভাবো তুমি যুবতী। বুড়িয়ে যাওয়াটা অস্বভাবিক কিছু না এটাই নিয়ম। কিন্তু আমি দেহের কথা মানতে রাজী নই। তাই প্রতিদিন বিবাদ চলছে দেহ আর মনের। দেহ বলে , রজনী ফুরিয়ে এলো , আর আমার মন বলে, না যাবো না , রজনী এখনো বাকী ।
একটু হাঁটু ব্যথা হচ্ছে, আগের মতো ছুটে বেড়াতে পারছি না। এক নাগারে দুই তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রান্না করাটা অনেক ক্লান্তিময় মনে হয়। শুরু হয় ব্যক পেইন। তখন মনকে সাহস যোগাতে গুন গুন করে কবি গুরুর গান গাই,” ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু,পথে যেনো পিছিয়ে , পিছয়ে না পরি কভু। আজকাল আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বড্ড অচেনা লাগে। মনে হয় এই আমি কি সে আমি? চেহারায় বয়েসের ছাপ পরে গেছে। মাথার চুল কমে গেছে, চুলের এদিক সেদিক রুপালি রঙ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। চোখের নীচে বালিরেখা। আয়নাটাকে এখন আমার সব চাইতে বড় শত্রু মনে হয়। দেহ আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাঁসে । সে আমার মনকে বলে, কথায় আছে না, যৌবনে কাকও সুন্দরী , শ্রাবণে নদীও রূপসী ।বলেই দেহ অট্ট হাসি হাসে। আমি আমার দেহকে মনের কাছে আসতেই দিতে চাই না। আমি এখনো কপালে বড় টিপ দেই। চুলে ফুল গুঁজি , হাত ভরা চুরি পরি। পহেলা বৈশাখ , ফাগুনের উৎসবে কপালে টিকলি পরি । এখনো নিজের মনের মতো নিজেকে সাজাই। কারন আমার মন যে আমাকে বলে তুমি এখনো যুবতী ।
কেনা কাটাটা আমার চিরকালের অভ্যাস । এখনো সে অভ্যাস থেকে মুক্তি পাইনি। যা ভালো লাগে তাই কিনি। যাকে মোটামোটি অপচয়ের পর্যায় ফেলা যায়। সব কিছু বুঝেও যেনো আমি কিছুই বুঝি না। ঐ যে মনটা আমার অবুঝ মনে বন্ধি। আবারো কবিগুরুর কথায় বলি, আমার মুক্তি আলোয় আলোয় । নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেই, আমার মনের ইচ্ছে গুলোকে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি আকাশে উড়ে বেড়াতে।
কেউ বয়েসের কথা বললে আমি মন খারাপেরে ভেলায় ভেসে যাই।অনেকে বলে আপা আপনি তো চিরসবুজ আপনার বয়েস বুঝাই যায় না। এসব কথা শুনে আমি মোটেও আপ্লূত হই না। বুঝি সবই খুশি করার কথা। মনে মনে বলি তোমরা কি ভেবেছো আমি কি সত্তর বা আশি বছর পেরিয়ে যাওয়া বুড়ি? মোটেও না। লোকের কথায় কান দিয়ে কি লাভ? সে তো রোজই উড়ে বেড়ায় আকাশে। তাই আমি তাদের কথায় কানে তুলো দেই।
দুই তিন বছর আগেও জীবন নিয়ে কোন ভয় ছিলো না। কখনো মনে হয় নি জীবনের মইটির প্রায় শেষ প্রান্তে এসে গেছি।এখন মনে হলে বুকের ভেতর মোচর দেয়। তাহলে আমার মন কি হেরে গেলো আমার দেহের কাছে? তবে এই কথা সত্যি হার জিৎ নিয়েই জীবনের খেলা। এ কথা মেনে নিতেই হবে , তার থেকে কোন নিস্তার নেই। তাই মনকে বুঝানোর চেষ্টা করি এ দুঃখে জড়িয়ে লাভ নেই।
দুঃখ এড়াবার আশা নেই এ জীবনে ।
দুঃখ সইবার শক্তি যেনো পাই এই মনে।

