
আমি বরাবরের মত আজও শেষের সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। সবার যখন সব কথা শেষ তখন আমার শুরু। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী পালন হলো দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায়। আমি মন ভরে, কান পেতে দেখলাম শুনলাম রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা। কিন্তু আমিও যে আমার ক্ষুদ্র ক্ষমতায়, ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছু প্রকাশ করতে এবং পেছনের সারি হলেও দাঁড়াতে পারি, সে চিন্তাটাও আসলো অনেক পরে। আমি যতটুকুই জানি ততটুকুই লিখতে বড্ড ইচ্ছে হলো। রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পেরিয়ে চলে এলো মৃত্যুবার্ষিকী ২২শে শ্রাবণ। আমি আজ লিখতে বসেছি রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীর মাঝখানে বসে। সত্যি কথা বলতে কি, আমি রবীন্দ্রনাথকে আমার হৃদয়ে নিয়েই চলি।
রবীন্দ্রনাথকে চিনতে শিখেছি সে ছোটবেলায় আমার মায়ের সাথে মাথা নেড়ে নেড়ে পড়তে পড়তে, ‘আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে’ কবিতাটি দিয়ে। তারপর জীবনের বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ এসেছে আমার প্রাণে বিভিন্নভাবে। কখনো এসেছে, ‘সখী ভালোবাসা কারে কয়’ আবার কখনো এসেছে, ‘আমার পরানো যাহা চায় তুমি তাই’ আবার এসেছে ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’। প্রতিটি দিন, প্রতিটি পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের গানে আমি খুঁজেছি আমার প্রেম,আমার আবেগ, আমার বিরহ, আমার ক্লান্ত মনের সান্ত্বনা। যখন আনন্দে মেতে উঠেছি, নিজের মনে কতবার গেয়ে উঠেছি ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ুরের মত নাচে রে’। গ্রামের পথ দিয়ে চলতে চলতে কতদিন যে ভাই-বোনরা চিৎকার করে করে গেয়েছি, ‘গ্রাম ছাড়া ঔ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভোলায় রে’।
রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা বিভিন্ন ঋতুতে এসেছে বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন আবেগে। মানুষের জীবনের এমন কোনো অনভুতি, আবেগ সুখ দঃখ নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখে যাননি। রবীন্দ্রনাথ বিরাজ করছেন আমাদের অন্তরে, বাহির সর্বত্র।
এবার আবার রেখা প্রসঙ্গে আসি। আমরা কাজিনরা যখন ঈদ কিংবা স্কুল ছুটির সময় একসাথে হতাম তখন রেখার বানানো গল্প শোনার জন্য উদগ্রীব থাকতাম। রোজ রাতে রেখা ওর গল্পের ঝুড়ি আমাদের সামনে খুলে বসতো। ওর গল্পের নায়ক ছিল গোয়েন্দা খালেক। গোয়েন্দা খালেক জীবনে কী কী দুর্দান্ত গোয়েন্দা গিরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে সব রেখা ওর মন থেকে বানিয়ে দারুণ উত্তেজনা নিয়ে আমাদের শোনাতো। আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধকর শ্রোতা হয়ে সে গল্পগুলো শুনতাম এবং পরদিন রাতে রেখা আমাদের কী গল্প শোনাবে সেটা ভেবে খুব উত্তেজিত থাকতাম। গোয়েন্দার নাম রেখা কেন খালেক পছন্দ করেছিল সেটা কখনো জানা হয়নি। এবার দেখা হলে জিজ্ঞেস করবো ভাবছি। প্রতিদিন বিকালে রেখার আরেকটি কাজ ছিল আমরা যারা ওর চাইতে ছোট ছিলাম তাদের সবাইকে পিছনের উঠানে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে লেফট রাইট করাত। সেটা ছিল ওর সেনাবাহিনী ট্রেনিং। আমরাও বাধ্য সৈনিকের মতো লেফট রাইট করে ট্রেনিং গ্রহণ করতাম। এখন এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে দৃশ্যটা মনে হয়ে খুব হাসি পাচ্ছে। ছোটবেলায় মানুষ কত সহজ সরল থাকে। কিন্তু বড় হতে হতে সে সহজ সরলতাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
আমাদের কুমিল্লা শহরে তখন মইনুউদ্দিন বেকারি নতুন খোলা হয়েছে। ভীষণ জমজমাট ব্যবসা। আধুনিক ফ্রেশ নাস্তা তৈরি করা হতো এই বেকারিতে। পেস্ট্রি, পেটিজ, কাপ কেক, নানারকমের বিস্কুট আরো কত কী যে বিক্রি হতো। তখন মিষ্টি নিমকি দিয়ে মেহেমান্দারি করা হতো। মইনুদ্দিন সাহেব বেকারি খুলে বসে অতিথি আপ্যায়নে একটা নতুন স্বাদ এনে দিয়েছিল কুমিল্লা শহরে। মইনুউদ্দিন বেকারি আমাদের বাসার খুব কাছেই ছিল। দু-একদিন পর পর বা কোনো কোনো সময় প্রতিদিনই রেখার ইচ্ছে হতো বেকারি থেকে আনিয়ে কখনো কাপ কেক কখনো পেস্ট্রি খেতে। তখন আমাদের বাসায় চারু এবং বারেক নামে দুটি সম বয়েসী ছেলে কাজ করতো। বারেক ছিল কালো কুচকুচে মাথা ভর্তি চুল, অত্যন্তÍ হাসি খুশি। অনেক মজার মজার কথা বলে আমাদের হাসাতো। বারেক কখনো রাতে মশারি লাগিয়ে ঘুমাতো না। আম্মা ধমক দিয়ে বলতেন, বারেক তুই মশারী লাগাস না কেন? বারেক তার সবগুলো দাঁত বের করে হেসে বলতো, ‘কী যে কন খাল্লামা এত কালা মাইনশেরেকি মশা চোখে দেহে। আর চারু ছিল দাঁত উঁচু কপাল কুচকে রাখা রসকসহীন একটি ছেলে। চারুর কথা ওঠাতে চারু প্রসঙ্গে একটি কথা মনে হয়ে গেলো, আমরা একদিন কোথাও বেড়াতে গেছিলাম, ফিরে আসার পরে চারু খবর দিল, খাল্লামা একজন মাইয়া মানুষ আইছিল আফনাদের খুঁজে।
ম্যল্টন, কানাডা

