কানাডায় সেচ্ছায় মৃত্যু আবেদন অনুমোদন করে

কানাডায় সেচ্ছায় মৃত্যু আবেদন অনুমোদন করে - the Bengali Times
কানাডায় সেচ্ছায় মৃত্যু আবেদন অনুমোদন করে যদি সেটা খুব যন্ত্রনাকাতর হয়ে থাকে আর যদি ডাক্তারী পরীক্ষায় ধরা পড়ে

আমরা পিটারের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম ক্লিনিকে।

কানাডায় সেচ্ছায় মৃত্যু আবেদন অনুমোদন করে, যদি সেটা খুব যন্ত্রনাকাতর হয়ে থাকে, আর যদি ডাক্তারী পরীক্ষায় ধরা পড়ে। তখন নিজ আর পরিবারের সম্মতি নিয়ে ডাক্তারের সহায়তায় আপনি মারা যেতে পারেন। কষ্ট লাঘব করতে পারেন।

- Advertisement -

হসপিটালের ওয়েটিং রুমে কিছু দূরে এলিজাবেথ বসে বই পড়ছেন। উনি খাস কানাডিয়ান, বয়স প্রায় আশি। ভুলে থাকতে চান তার প্রিয় সঙ্গীর মৃত্যুকাল। পেশেন্টকে ভেতরে রেখে এসে উনি কাঁদলেন বেশ খানিক্ষন। শব্দ করে নাক ঝেরে দুই বাক্স টিস্যু শেষ করলেন।

মেরে ফেলার লম্বা সিরিয়াল। আরও ঘন্টাকখানেক অপেক্ষা করা লাগতে পারে। অনেক জটিল প্রক্রিয়া।

আমার বন্ধু গম্ভীর মুখে বসে আছে, দু:ক্ষ দু:ক্ষ ভাব নিয়ে। সে বলে যেতে থাকে- বুঝলি রিপন, জীবনের কোনো গ্যারান্টি নাই

– হু

– মশার মতো জীবন; এই আছিস, এই নাই

– আসলেই

– অথচ দেখ, আমরা নিজেকে নিয়ে কতো ব্যস্ত! ভেতরে একজন মারা যাচ্ছে, আর তুই খাওয়ার চিন্তা করতেছিস। ঠিক কিনা! পিটারের মৃত্যুর পর পাঁচ মিনিটে ভুলে যাবি, আরামে ভুনা হাঁস দিয়ে প্লেটের পর প্লেট ভাত খেয়ে ঘুম দিবি। তোর মনে আছে, বাংলাদেশে আমরা যখন আরিফ ভাই এর লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্তানে গেলাম, তখন তুই হঠাৎ হাওয়া? তোকে পাওয়া গেল গোরস্তানের পাশে ছাপড়া দোকানে; আরামে ডালপুরি চায়ে ভিজিয়ে খাচ্ছিলি। তুই বড়োই অদ্ভুত চিড়িয়া!

.

সে কীভাবে যেন টের পায় আমার খিদে। আমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে? কিংবা চেহারা? আমার আসলেই খিদে লাগছে। তাছাড়া ভুনা হাঁসের কথা শুনে আরও বেড়ে গেল।  খিদে পেটে তার ফিলোসোফিক্যাল কথা-বার্তা অসহ্য লাগছে। এখন যদি বলি বাইরে হাঁটতে যাচ্ছি, বিশ্বাস করবে না; উল্টা আমার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে অপমান করবে।

সেদিন আমি আসলেই আর পারছিলাম না।

বাংলাদেশে ইদানিংকালের স্টেইনলেস স্টিলের খাটিয়াগুলো এতোই ভারী, বেশিক্ষন কাঁধে নিয়ে হাঁটার উপায় নাই। আর আমাদের হাঁটতে হয়েছিল সেই মজমপুর থেকে থানা পাড়া গোরস্তান পর্যন্ত। প্রচন্ড ভ্যাঁপসা গরম, ঘেমে সারা শরীর গোসল। খাটিয়া কাঁধে নিয়ে যে একটু দোয়া-দরুদ পড়বো, সেই উপায়টাও নাই। সারাক্ষন চিন্তা কতক্ষণ লাগবে গোরস্তান পৌঁছুতে..। ট্রাকে লাশ নেবার বিধান থাকলে খুব ভালো হতো।

সে আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল, দেশের খাটিয়াগুলা খুব ভারী না রে?

– হু

– ইচ্ছে করেই ভারী বানায়ে একটা বোধ সৃষ্টি করে। অবশ্য লাশ এমনিতেই অনেক ভারী, এক্সট্রা ভার দেয়ার দরকার নাই।

.

হঠাৎ আমার ভাগ্য খুলে গেলো।

এলিজাবেথ কাছে এসে বলল- তোমরা কি আমাকে একটা কফি খাওয়াতে পারবা? আমি খুব ক্ষুধার্ত

– শিওর! – আমি প্রশ্ন লুফে নিয়ে উত্তর দিলাম।

– চিনি ছাড়া, ডাবল ক্রিমের মিডিয়াম কফি। আর একটা সিনামন রেইজিন টোস্টেড বেগল, এক্সট্রা ক্রিম চিজ। আমি তোমাকে টাকা দিচ্ছি..

– লাগবে না।

আমি বন্ধুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, দোস্ত যাবো?

– যা [সে গম্ভীর গলায় বলল]

– তোর কিছু লাগবে?

– যাচ্ছিসই যখন, একটা এগ মাফিন আনতে পারিস। এই গরমে আর কফি খাবো না। একটা স্ট্রবেরী-ওয়াটারমিলন কোয়েনচার্স আনিস। বরফ দেয়া।

.

আমরা তিনজন চুপচাপ খেতে থাকি। এর মধ্যে ডাক্তার এসে এলিজাবেথকে বলল- আধাঘন্টার মধ্যে পিটারের মৃত্যু ঘটবে, আপনি কি একবার দেখা করতে চান?

– ওর কি জ্ঞান আছে?

– না

– তাহলে আমি আর দেখা করতে চাই না।

ডাক্তার চলে গেলেন।

আমরা লাশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। লাশ নিয়ে তাদের  নিউমার্কেট শহরে যেতে হবে, টরন্টো থেকে কমসেকম ষাট কিলোমিটার। সেখানে এক পারিবারিক গোরস্তানে পিটারের দাফন হবে। আমি যাবো না, বেঁচে গেলাম।

পিটারের অবস্থা নাকি আসলেই খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এমনিতেই খুব বৃদ্ধ, তার ওপর হার্টে সমস্যা, দুই কিডনি নষ্ট, চোখে কিছুই দেখতো না। হাঁটাহাঁটি, খাওয়া-দাওয়া করতে পারতো না। মাঝে মাঝে তীব্র যন্ত্রণার কাতরাতো। আর অপলক শুয়ে কি জানি ভাবতো। শুধুই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা।

.

আমি মহা বিরক্ত।

এসেছিলাম দুদিনের জন্য টরন্টো; ঘুরবো বলে। কত প্ল্যান প্রোগ্রাম ছিল, সব ভেস্তে গেলো। আমাকে বলল তার আধাঘন্টা লাগবে। আমি শুধু পাশে থাকবো, তারপর সে এলিজাবেথ আর পিটারের লাশ নিয়ে এক গাড়িতে যাবে, আর আমি বাসায় ফিরবো নিজের গাড়িতে। এলিজাবেথ হলো তার পাশের বাসার নেইবর। তার জন্য জান দিয়ে দিচ্ছে আমার বন্ধু। খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে!

হঠাৎ সে উঠে গিয়ে ভদ্রমহিলার কানে কানে কী জানি বলল। শুনে মনে হলো উনি খুব ইমপ্রেস্ড, খুশি। তারপর “আসতেছি, খেয়াল রাখিস” বলে তারা দুজন আস্তে আস্তে হেঁটে, লিফ্ট দিয়ে নেমে কোথাও হারিয়ে গেল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে চেয়ে দেখি ঐ দূরে এক গাছের ছায়ায় দু’জন খোশ গল্পে মেতে গেছে। দু’জনই বিড়ি ফুকছে!

ঘন্টাখানেকের মধ্যে লাশ হস্তান্তর করে দিল কর্তৃপক্ষ। বিপদ যখন আসে, মাটি খুঁড়ে বের হয়ে আসে। এলিজাবেথ সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়লো। তাকে নিয়ে চিশতী ছুটলো আরেক হসপিটালের ইমারজেন্সীতে। এবার লাশের দায়িত্ব এসে পড়লো আমার ঘাড়ে।

আমি এনিমেল হসপিটাল থেকে বের হয়ে বাঁচলাম। বিড়ালের লাশ নিয়ে ছুটলাম নিউমার্কেটে। সেখানে দাফনের জন্য অপেক্ষা করছে ভদ্রমহিলার কাজিন। শুধু তাই না, আসার সময় আরেকটা জ্যন্ত বিলাই তারা আমার হাত দিয়ে পাঠাবে পিটারের রিপ্লেস্মেন্ট হিসেবে।

অদ্ভুত এক দেশে এসে পড়ছি! মানুষের জন্য মায়া নাই, যত দরদ সব কুকুর বিড়ালের ওপর..

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles