
এবার আবার রেখা প্রসঙ্গে আসি। আমরা কাজিনরা যখন ঈদ কিংবা স্কুল ছুটির সময় একসাথে হতাম তখন রেখার বানানো গল্প শোনার জন্য উদগ্রীব থাকতাম। রোজ রাতে রেখা ওর গল্পের ঝুড়ি আমাদের সামনে খুলে বসতো। ওর গল্পের নায়ক ছিল গোয়েন্দা খালেক। গোয়েন্দা খালেক জীবনে কী কী দুর্দান্ত গোয়েন্দা গিরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে সব রেখা ওর মন থেকে বানিয়ে দারুণ উত্তেজনা নিয়ে আমাদের শোনাতো। আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধকর শ্রোতা হয়ে সে গল্পগুলো শুনতাম এবং পরদিন রাতে রেখা আমাদের কী গল্প শোনাবে সেটা ভেবে খুব উত্তেজিত থাকতাম। গোয়েন্দার নাম রেখা কেন খালেক পছন্দ করেছিল সেটা কখনো জানা হয়নি। এবার দেখা হলে জিজ্ঞেস করবো ভাবছি। প্রতিদিন বিকালে রেখার আরেকটি কাজ ছিল আমরা যারা ওর চাইতে ছোট ছিলাম তাদের সবাইকে পিছনের উঠানে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে লেফট রাইট করাত। সেটা ছিল ওর সেনাবাহিনী ট্রেনিং। আমরাও বাধ্য সৈনিকের মতো লেফট রাইট করে ট্রেনিং গ্রহণ করতাম। এখন এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে দৃশ্যটা মনে হয়ে খুব হাসি পাচ্ছে। ছোটবেলায় মানুষ কত সহজ সরল থাকে। কিন্তু বড় হতে হতে সে সহজ সরলতাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
আমাদের কুমিল্লা শহরে তখন মইনুউদ্দিন বেকারি নতুন খোলা হয়েছে। ভীষণ জমজমাট ব্যবসা। আধুনিক ফ্রেশ নাস্তা তৈরি করা হতো এই বেকারিতে। পেস্ট্রি, পেটিজ, কাপ কেক, নানারকমের বিস্কুট আরো কত কী যে বিক্রি হতো। তখন মিষ্টি নিমকি দিয়ে মেহেমান্দারি করা হতো। মইনুদ্দিন সাহেব বেকারি খুলে বসে অতিথি আপ্যায়নে একটা নতুন স্বাদ এনে দিয়েছিল কুমিল্লা শহরে। মইনুউদ্দিন বেকারি আমাদের বাসার খুব কাছেই ছিল। দু-একদিন পর পর বা কোনো কোনো সময় প্রতিদিনই রেখার ইচ্ছে হতো বেকারি থেকে আনিয়ে কখনো কাপ কেক কখনো পেস্ট্রি খেতে। তখন আমাদের বাসায় চারু এবং বারেক নামে দুটি সম বয়েসী ছেলে কাজ করতো। বারেক ছিল কালো কুচকুচে মাথা ভর্তি চুল, অত্যন্তÍ হাসি খুশি। অনেক মজার মজার কথা বলে আমাদের হাসাতো। বারেক কখনো রাতে মশারি লাগিয়ে ঘুমাতো না। আম্মা ধমক দিয়ে বলতেন, বারেক তুই মশারী লাগাস না কেন? বারেক তার সবগুলো দাঁত বের করে হেসে বলতো, ‘কী যে কন খাল্লামা এত কালা মাইনশেরেকি মশা চোখে দেহে। আর চারু ছিল দাঁত উঁচু কপাল কুচকে রাখা রসকসহীন একটি ছেলে। চারুর কথা ওঠাতে চারু প্রসঙ্গে একটি কথা মনে হয়ে গেলো, আমরা একদিন কোথাও বেড়াতে গেছিলাম, ফিরে আসার পরে চারু খবর দিল, খাল্লামা একজন মাইয়া মানুষ আইছিল আফনাদের খুঁজে।
আম্মা বললেন কে আসছিল? কী নাম? চারুর জবাব ছিল, নাম কিছু কয় নাই। কইছে আবার আসবো। আম্মা আবার জিজ্ঞাস করলেন, দেখতে কেমন মহিলা? চারুর জবাব, কেমন আর? ব্যাটার মতো খুঁড় দিয়া চুল কাইটা রাখছে। প্রথম আধা মিনিট কথাটা বুঝতে না পারলেও পরে বুজলাম বয় কাট চুল কাটা কেউ হবে। চারুর কথায় মজা করার জন্য আমরা কোনো বয়কাট চুল দেখলে বলতাম, ‘ব্যডার মতো খুর দিয়া চুল কাটুইন্না মাইয়া মানুষ।’
যাক চারু প্রসঙ্গ। রেখা বারেককে পাঠাতো ওর খাবার নাস্তা ফানটা সবকিছু কিনে আনতে। তখন ফানটা অল্প বয়েসীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় ছিল। বারেকও আনন্দের সাথে গান গেয়ে লাফাতে লাফাতে চলে যেতো রেখার কাপ কেক পেস্ট্রি আর ফানটা কিনতে। কারণ, জানতো ও কিছু ভাগ পাবে এতে। তবে রেখা আম্মার থেকে টাকা নিয়ে কখনো তার পকেট মানি থেকে এসব করলেও কখনো ওর একার জন্য নাশতা কিনে আনতো না। আমার জন্যও আনাতো। আমার প্রতি যদিও ওর শাসক ভাব ছিল কিন্তু মায়াও ছিল অনেক।
এই রেখার মায়া প্রসঙ্গে আর একটি কথা মনে পড়ে গেলো। আমি তখন কনভেন্টে তিন বছর শেষ করেছি। আমাকে ভর্তি করা হলো কুমিল্লার সব চাইতে নামী স্কুলে। (ফায়জুন্নেসা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়) আমরা সব বোনরা এমনকি আম্মাও এই স্কুল থেকে পাশ করেছেন। আমি ক্লাস থ্রীতে ভর্তি হয়েছি। একদিন স্কুলে ছোট ক্লাসের মেয়েদের ইঞ্জেকশান দিতে এসেছে। কিসের ইঞ্জেকশান ছিল সেটা বলতে পারবো না। কিন্তু পাঠক বন্ধুরা আমাকে জানালো সেটা ছিল বিসিজি ইঞ্জেকশান। আমাদের সবার হাতে একটা করে হলুদ কার্ড দেয়া হলো আমাদের নাম ও বয়েস লেখার জন্য। ক্লাস টিচার আমাদের ভালো করে সব বুঝিয়ে দিলেন এবং ভয় পাবার কিছু নাই সেটাও বোঝালেন। সেদিন রেখা ছুটে এসেছিল আমার ক্লাশে আমাকে বলতে, আমি যেন বয়সের জায়গাতে লিখি আমার বয়েস সাত বছর তিন মাস। ভুল করে যেন আবার বেশি না লিখি। ওর হয়তো ধারণা হয়েছিল আমি যদি বয়েস বেশি লিখে ফেলি তাহলে হয়তো আমাকে বেশি ব্যথা দিবে। আমিও কার্ডে বড় বড় করে লিখেছিলাম, সাত বছর তিন মাস। আজ লিখতে গিয়ে এসব কথা মনে পড়াতে কেমন যেন আবেগকাতর হয়ে পড়েছি। তবে এ কথা সত্যি আমার জীবনের সব চাইতে গুরত্ব¡পূর্ণ বিষয়গুলোতে রেখার ভ‚মিকা ছিল সীমাহীন।
অল্প বয়েসে প্রেম করতে গিয়ে বহুবার আম্মার হাতে ধরা পড়েছে রেখা এবং আম্মার আদালতে দণ্ডতি হয়েছে। রেখার দণ্ডতি হওয়া দেখে আমি বসে বসে কাঁদতাম। আমি ছিলাম এমন একটি মেয়ে বাড়ির যে কারো দুঃখ-কষ্টে আমি প্রাণ খুলে কাঁদতে বসে যেতাম। কিন্তু যতই সাজা প্রাপ্ত আসামী হোক না কেন রেখা, তারপরও প্রচুর সাহসিকতা নিয়ে প্রেম চালিয়ে গেছে এবং বিয়ে পর্যন্ত সেটা টেনে নিয়ে গেছে। আর এখন সে প্রেমিক স্বামী নিয়ে চল্লিশ বছর যাবত সংসার করে যাচ্ছে।
ছোটবেলার কত কথা কত ঘটনা। কোনো কিছু যদি সেন্সার না করে লিখি তাহলে ২০০ পৃষ্টার একটা বই লিখে ফেলতে পারতাম। কিন্তু সব কথা কি বলা যায়? আর লেখা তো একেবারেই যায় না। সে কথাগুলো চিরদিন মনের গোপন খাঁচাতেই বন্দি করে রাখতে হয়।
এক রাতে ঘুম আসছিল না বলে লেখাটা শুরু করেছিলাম, ভেবেছিলাম আজ রাতে যা লিখছি ততটুকুই আর লেখা হবে না। কিন্তু স্মৃতি বহমান নদীর মতো আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। বার বার আমাকে টেনে এনে বসিয়ে দিচ্ছে কম্পিউটারের সামনে। আমিও স্মৃতির ডাকে সাড়া না দিয়ে পারছি না। স্মৃতির ক্ষমতা অনেক, তার ডাকে একবার সাড়া দিলে আর মুক্তি নেই। সে মানুষকে হাসায় কাঁদায়, হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা জাগিয়ে তোলে মানুষের মনে। সুখ দুঃখ সবকিছুতে মাখা মাখি আমাদের স্মৃতি।
বড়পা। আমাদের সবার বড় বোন লীনা। যৌবনের প্রথম পর্বে পা দেবার সাথে সাথেই আমেরিকাতে বসবাস। বড়পা একজন নিওক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার। বড়পার সাথে ছোটবেলার খুব বেশি স্মৃতি আমার নেই। সবার বড় বলে বড়বড় ভাবটা ওর মাঝে বিদ্যমান ছিল। ও কখনো আমাদের খেলার সাথী ছিল না। খুব ছোটবেলাতে বড়পাকে আমরা আপনি বলে ডাকতাম। সে সময় বড় ভাই-বোনদের আপনি ডাকার প্রচলন ছিল। আমরা শুধু বড়পাকেই আপনি বলতাম। কিন্তু সেটা বেশিদিন চালু থাকেনি। একটু বড় হয়ে আমরা আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসলাম। আমাদের ধারণা হলো বড় ভাইবোনদের আপনি ডাকাটা ঠিক আধুনিক পর্যায়ে পড়ছে না। আর আমার সেজো বোন রেখার অনাধুনিক কিছু করাটা অসম্মান জনক ব্যাপার বলে মনে হতো।
আমার ধারণা রেখাই আপনি ডাকটা ঝেটিয়ে বিদায় করেছিল। বড়পার কথা মনে হলে, মনে পড়ে বড়’পার কানের কাছে রেডিও নিয়ে শুয়ে শুয়ে কলকাতার নাটক শোনা, নীহারঞ্জনের উপন্যাস পড়া। বড়পা কেন যে কানের কাছে নিয়ে নাটক শুনতো জানি না। নাটকে এমন কী কথা থাকতো যে ও ছাড়া আর কেউ শুনতে পারবে না। তাছাড়া আমার মনে হয় না বাড়িতে অন্য কারো আগ্রহ ছিল নাটক শোনার। আর আমার তো নয়ই, কারণ তখন আমার নাটক শোনার বয়সই হয়নি। বড়পার প্রিয় নায়িকা ছিল সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেনের ছবি কেটে কেটে গাম দিয়ে খাতাতে লাগিয়ে সুচিত্রা সেনের অ্যালবাম বানিয়ে ছিল। তবে বড়পা আমাকে সাঁতার শিখিয়েছিল। আমাদের বাসার পেছনে বাড়ির সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে থেকে শুরু একটি পুকুরের। দেখলে মনে হতো এটা বুঝি আমাদেরই পুকুর। কিন্তু সেটা আমাদের পুকুর ছিল না। পুকুরটাকে বলা হতো কালিবাড়ি পুকুর। পুকুরের অন্য পাড়ে ছিল কালিবাড়ি। কালীবাড়ির ঘাটটা ছিল অন্য ঘাটের তুলনাতে বেশ বড়।
আমার আব্বাও সুন্দর করে একটা ঘাট বানিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের আনন্দের জন্য। তবে পুকুরের চারপাশের বাসিন্দারা যার যার প্রয়োজনে পুকুরটা ব্যবহার করতো। আমাদের এখানে যখন আমাদের খালাতো চাচাতো ভাই-বোনেরা বেড়াতে আসতো তখন আমরা পুকুরে নেমে ঝাঁপাঝাঁপি করতাম। কী যে টলটলে পরিষ্কার পানি ছিল এই পুকুরের। পানি এতই স্বচ্ছ ছিল যে, পুকুরের নিচে যে ছোট ছোট মাছগুলো ভেসে যেতো সেটা আমরা পানির উপর থেকেই দেখতে পেতাম। আমরা ঝাঁপাঝাঁপি করতে করতে এই পুকুরে সাঁতার শিখে গিয়েছিলাম। আমাদের সাঁতার শেখার জন্য আব্বা কলাগাছের পাতা লেজ কেটে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, বড়’পা কলাগাছ দিয়ে আমাকে সাঁতার কাটিয়ে মাঝ পুকুরে নিয়ে কলাগাছটা আমার কাছ থেকে নিয়ে একটু সরে থাকতো। আমি ভয়ে চিৎকার করে হাবু ডুবু খেতে থাকতাম আর এভাবেই বড়পার কাছে আমার সাঁতার শেখা। সব চাইতে মজার ব্যাপার ছিল আমরা বোনরা সাঁতার কেটে পুকুরের এপাড় থেকে ওপাড়ে চলে যেতাম কিন্তু আমাদের ভাইয়েরা কখনো তা করেনি।
এই পুকুরের চারপাশে তেমন খুব বেশি বাড়িঘর ছিল না। এখানে বাইরের কোনো লোকদের পুকুর ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। কাজেই এটা ছিল আমাদের পাড়া প্রতিবেশীদের পুকুর। পুকুরে খুব সুন্দর শাপলা ফুল ফুটতো। ফুটে থাকতো কচুরিপানার বেগুনি ফুল। সে ফুল দিয়ে কত যে খেলা আমরা খেলেছি।
ম্যাল্টন, কানাডা

