চার মহাদেশ পাড়ি দিয়ে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী

চার মহাদেশ পাড়ি দিয়ে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী - the Bengali Times
মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনে কার্ল বুশবি

দীর্ঘ ২৮ বছরের দুঃসাহসিক অভিযান শেষে নিজ দেশে ফিরেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি। দক্ষিণ আমেরিকার চিলি থেকে যাত্রা শুরু করে প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যের নিজ শহর হালে পৌঁছেছেন তিনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তাঁর ব্যতিক্রমী বিশ্বভ্রমণ।

১৯৯৮ সালের নভেম্বরে ২৯ বছর বয়সে চিলির পুন্টা অ্যারেনাস থেকে যাত্রা শুরু করেন সাবেক এই প্যারাট্রুপার। তাঁর লক্ষ্য ছিল কোনো ধরনের যানবাহন ব্যবহার না করে এবং মাঝপথে যুক্তরাজ্যে ফিরে না গিয়ে স্থল ও জলপথ পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে পৌঁছানো।

- Advertisement -

এ জন্য নিজের জন্য দুটি কঠোর নিয়মও নির্ধারণ করেছিলেন বুশবি। প্রথমত, অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ফিরবেন না। দ্বিতীয়ত, যাত্রার অগ্রগতির জন্য কোনো পরিবহণ ব্যবহার করবেন না।

চারটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত ছিল তাঁর এই দীর্ঘ অভিযান। পথে পাড়ি দিতে হয়েছে বিপজ্জনক দারিয়েন গ্যাপের ঘন জঙ্গল, হিমশীতল বেরিং প্রণালি এবং ইংলিশ চ্যানেল। দীর্ঘ যাত্রার শেষ পর্যায়ে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে অতিক্রম করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান তিনি।

বাড়ি ফেরার আগে হালের নগরকেন্দ্রে তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। সেখান থেকে মায়ের বাড়ির উদ্দেশে শেষ কয়েক মাইল পথ পাড়ি দেন বুশবি। বাড়ির দরজায় পৌঁছে তিনি বলেন, বাড়িতে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। সবকিছুই অবাস্তব মনে হচ্ছে।

হালের সাটন পার্ক এলাকায় ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর মা অ্যাঞ্জেলা বুশবি। দীর্ঘদিন আগে মা-ছেলের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, ছেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই অপেক্ষা করবেন। অবশেষে ছেলেকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মা প্রশ্ন করেন, ‘তুমি এত দিন কোথায় ছিলে?’

পরে গণমাধ্যমকে অ্যাঞ্জেলা বলেন, ছেলেকে বাড়িতে ফিরে পেয়ে তিনি খুব খুশি। একই সঙ্গে স্বস্তিও অনুভব করছেন।

বাড়ি ফেরার পর এক সংবাদ সম্মেলনে কার্ল বুশবি জানান, দীর্ঘদিনের এই অভিযানের এখানেই ইতি টানছেন তিনি। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাঁর জন্য সহজ হবে না। কারণ, জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় তিনি একজন অভিযাত্রী হিসেবে কাটিয়েছেন।

বুশবির এই দীর্ঘ অভিযানে নানা বাধা এসেছে। ভিসা জটিলতা, ২০০৭ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কয়েক দফায় যাত্রা থেমে যায়। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ২৮ বছরের মধ্যে প্রায় ১৫ বছর তিনি হেঁটেছেন। বাকি সময় বিভিন্ন জটিলতা ও পরিস্থিতির কারণে অপেক্ষায় কাটাতে হয়েছে। বিরতির সময় কম খরচে থাকার জন্য প্রায়ই মেক্সিকোতে অবস্থান করতেন তিনি।

অভিযানের শুরুতে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় যাত্রা করেছিলেন বুশবি। অনেক সময় মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি কখনো রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া খাবার খেয়েও দিন কাটিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁর অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করে। পাশাপাশি বই প্রকাশের চুক্তি ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সুযোগ পান তিনি।

দেশে ফিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বুশবি জানান, জার্মানির খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ওয়ার্নার হার্জগের সঙ্গে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্বিতীয় বই লেখার কাজও চলছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার বলার মতো একটি গল্প আছে।’

এর আগে হাম্বার ব্রিজ অতিক্রম করে পূর্ব ইয়র্কশায়ারে পৌঁছালে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে স্বাগত জানান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর ৩৬ বছর বয়সি ছেলে অ্যাডাম, ১২ বছর বয়সি নাতনি, বাবা ও ভাইয়েরা। নাতনির সঙ্গে এর আগে কখনো দেখা হয়নি বুশবির। পরিবারের সঙ্গে এই পুনর্মিলনকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেন তিনি।

হালের নগরকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে স্বাগত জানান নগরপ্রধান মারিয়া কাউয়ার্ড। সেখানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক মানুষের ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে বুশবি বলেন, কাউকে এমন স্বাগত জানানো হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।

তবে দীর্ঘ অভিযানের পর এখন নতুন জীবনে অভ্যস্ত হওয়াই তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এত বছর ধরে অভিযাত্রীর পরিচয়ে বেঁচে থাকার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবেন, তা নিয়ে ভাবছেন তিনি।

বুশবির ভাষ্য, দেশে ফেরার পর আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহ তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে। দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলা শেষ হলেও এবার শুরু হচ্ছে জীবনের নতুন অধ্যায়।

সূত্র: বিবিসি

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles