৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ

৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ - the Bengali Times

ক্যালগেরির আকাশে তখন আগস্টের ধোঁয়াটে আলো। দূরের কোথাও আগুন জ্বলছে। বাতাসে গরম আর শুষ্কতার অস্বস্তি। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার দিকে দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষ ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যাচ্ছে। অগ্নিনির্বাপকেরা ছুটছেন আগুনের দিকে।

- Advertisement -

আর ঠিক সেই সময় ক্যালগেরির জেনেসিস সেন্টারে হাজারো মানুষ একত্র হয়েছেন প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি ও বিশ্বাসের কথা বলতে।

এ যেন একই পৃথিবীর দুই ছবি—একদিকে আগুন, উৎকণ্ঠা ও বাস্তুচ্যুতি; অন্যদিকে প্রার্থনার নীরবতা, ধর্মীয় বক্তব্য আর মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার কথা।

সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত ৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা শেষ হয়েছে এই দুই বাস্তবতার এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি করে।

১৯৮০ সালে ছোট্ট একটি আঞ্চলিক সমাবেশ হিসেবে যে আয়োজনের শুরু, চার দশকের বেশি সময়ে সেটিই পরিণত হয়েছে উত্তর আমেরিকার অন্যতম বড় ইসলামী আধ্যাত্মিক সম্মেলনে। এবার ক্যালগেরির জেনেসিস সেন্টারে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন ৫ হাজার ৩৬৪ জন। তাঁদের মধ্যে আহমদীয়া মুসলিম কমিউনিটির ৪ হাজার ৮০৫ সদস্য এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ৫৫৯ জন অতিথি ছিলেন। এমটিএ কানাডার সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে অনলাইনে অনুষ্ঠানটি দেখেছেন ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ।

সংখ্যাগুলো বড়। কিন্তু এই সমাবেশের তাৎপর্য কেবল সংখ্যায় নয়।

৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ - the Bengali Times

প্রশ্নটি বরং অন্য জায়গায়—যে পৃথিবীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে মুহূর্তে বিভক্ত করে, রাজনীতি ক্রমেই মেরুকৃত হয়, যুদ্ধ ও সংঘাত মানুষের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন আগুন, বন্যা ও দুর্যোগের নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, সেখানে ধর্ম মানুষকে কী শেখাতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন এবার জলসার আলোচনাগুলো ফিরে গেছে একটি সহজ অথচ গভীর কোরআনিক নির্দেশনার কাছে:

‘কুলু কওলান সাদিদা’—সঠিক কথা বলো।

একটি ‘সঠিক কথা’র শক্তি

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি কথা মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি অসম্পূর্ণ খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ - the Bengali Times

এই বাস্তবতায় ‘সঠিক কথা বলার’ নির্দেশনাটি যেন নতুন অর্থ পেয়েছে।

জলসার বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তারা এই বিষয়টিকেই নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—কথা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; কথা মানুষের চরিত্র, সম্পর্ক ও সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই কথা বলার স্বাধীনতার সঙ্গে আসে সত্য বলার দায়িত্বও।

কানাডায় আহমদীয়া মুসলিম কমিউনিটির জাতীয় সভাপতি (আমির) মালিক লাল খান সম্মেলনের সরাসরি সম্প্রচারে বলেন, কোরআনের এই নির্দেশনা অনুসরণ করা গেলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সৃষ্ট বহু বিরোধই এড়ানো সম্ভব।

কথাটি শুনতে সহজ। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এর প্রয়োগ কঠিন।

কারণ এখন মানুষ শুধু যা জানে, তা বলে না—অনেক সময় যা শুনেছে, সেটিও বলে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্যের গতি সত্যের চেয়েও দ্রুত।

জলসায় তাই ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে ডিজিটাল যুগের নাগরিক নৈতিকতাকেও একই আলোচনার টেবিলে বসানো হয়েছে।

৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ - the Bengali Times

সংকটের পৃথিবীতে নিজেকে রক্ষা

সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে মিশনারি-ইন-চার্জ সোহাইল মোবারক আহমদ শর্মা বৈশ্বিক সংকটের সময়ে নিজেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেন।

তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্র ছিল আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা—বাইরের পৃথিবী যত অস্থিরই হোক, মানুষের ভেতরের জগত যেন ভেঙে না পড়ে।

ভ্যাঙ্কুভারের আমির নাঈম লাখান কথা বলেছেন কৃতজ্ঞতা নিয়ে। তাঁর বক্তব্যের বিষয় ছিল—‘আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা’। অন্যদিকে সাদ হায়াত বাজওয়া মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে বিশ্বাস, সরলতা ও পবিত্রতার শিক্ষা তুলে ধরেন।

ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন আইজাজ খান। ‘প্রমিজড মসিহ’-এর গ্রন্থাবলি পাঠ কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি ব্যাখ্যা করেন।

আবদুস সামি খান উর্দু ভাষায় তুলে ধরেন খুলাফায়ে আহমদিয়াত ও জামা’তের সদস্যদের মধ্যকার ভালোবাসার বন্ধনের কথা।

আত্মার যত্নের প্রসঙ্গও ছিল আলোচনায়। আজহার হানিফ বলেন আল্লাহর স্মরণ কীভাবে মানুষের আত্মাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। হাফিজ আতাউল ওয়াহাব খলিফাতুল মসিহের খুতবাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি পথ হিসেবে তুলে ধরেন।

বক্তব্যগুলোর বিষয় আলাদা হলেও একটি সুর যেন বারবার ফিরে এসেছে—মানুষের পরিবর্তন শুরু হয় তার নিজের ভেতর থেকে।

৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ - the Bengali Times

দেশপ্রেমও বিশ্বাসের অংশ

ধর্মীয় জীবনকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিক দায়িত্বের কথাও উঠে এসেছে জলসায়।

মাজলিস খুদ্দামুল আহমদিয়ার সভাপতি শাহরুখ রিজওয়ান আবিদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য বিশ্বাসের অংশ।

অর্থাৎ ধর্ম মানুষের কাছ থেকে শুধু প্রার্থনা চায় না; সমাজ ও দেশের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।

জাতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল বারী উর্দু ভাষায় ‘ওয়া বিল-ওয়ালিদাইনি ইহসানা’—‘পিতা-মাতার প্রতি সদয় হও’—বিষয়ে বক্তব্য দেন।

পশ্চিমা সমাজে বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি ইসলামে বাবা-মায়ের প্রতি পারিবারিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রযুক্তির যুগে পরিবার বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের ধরনও। সেই পরিবর্তনের মধ্যে পুরোনো একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে—বয়স বাড়লে বাবা-মায়ের পাশে কে থাকবে?

জলসার বক্তব্যে তার উত্তর খোঁজা হয়েছে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভেতরেই।

৪২তম জলসা সালানা পশ্চিম কানাডা: ধর্ম, নৈতিকতা ও অস্থির সময়ের মুখোমুখি এক সমাবেশ - the Bengali Times

একটি খবর শেয়ার করার আগে

সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বক্তা উসমান জামিল বর্তমান ইন্টারনেট সংস্কৃতির দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছেন।

তিনি মহানবী (সা.)-এর সেই শিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে মানুষ যা শোনে, তা যাচাই না করে বলে বেড়ানোর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

আজকের ভাষায় বললে—শেয়ার করার আগে যাচাই করুন।

একটি মিথ্যা তথ্য একজন মানুষের সম্মান নষ্ট করতে পারে। একটি গুজব ভেঙে দিতে পারে একটি পরিবার। একটি ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে সামাজিক অবিশ্বাস।

তাই ডিজিটাল যুগের ‘শেয়ার’ বাটনের সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় নৈতিকতার পুরোনো প্রশ্নটিই ফিরে আসে—আমি যা বলছি, তা কি সত্য?

তারপর আগুনের খবর

রবিবার ছিল সম্মেলনের শেষ দিন।

কিন্তু বাইরে তখন পৃথিবী অন্য এক গল্প লিখছে।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল ও ওকানাগানে তীব্র গরম এবং শুষ্ক বাতাসের কারণে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। সামারল্যান্ড, পিচল্যান্ডসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন।

যখন মানুষ জলসার সমাপনী অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন অন্য কোথাও মানুষ নিজের বাড়িতে শেষবারের মতো চোখ রেখে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

এই বৈপরীত্যটি হয়তো সম্মেলনের শেষ মুহূর্তটিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল।

নির্ধারিত কর্মসূচিতে বিরতি দিয়ে জাতীয় আমির মালিক লাল খান উপস্থিত সবাইকে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য দোয়া করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন—

“বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা, তাঁদের ঘরবাড়ির সুরক্ষা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করা অগ্নিনির্বাপকদের নিরাপত্তার জন্য সবাই দোয়া করুন। আল্লাহ যেন বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্বস্তি দেন এবং এই পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ ও দ্রুত অবসান ঘটান।”

হাজারো মানুষের সেই নীরব প্রার্থনায় তখন হয়তো ক্যালগেরি থেকে অনেক দূরের সেই আগুনও উপস্থিত ছিল।

নতুন মানুষের আগমন

সম্মেলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল নতুন সদস্যদের যোগদান।

আয়োজকেরা জানান, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে অনুষ্ঠিত বায়আত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১১ জন আনুষ্ঠানিকভাবে আহমদীয়া মুসলিম কমিউনিটিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আফগান বংশোদ্ভূত কানাডীয় পরিবারও রয়েছে।

একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সম্প্রসারণের সংবাদ। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসী কানাডার আরেকটি গল্পও—বিভিন্ন দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষের নতুন পরিচয় ও নতুন সামাজিক পরিসরে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার গল্প।

আগুনের ধোঁয়ার ভেতর একটি প্রশ্ন

সম্মেলন শেষ হলো।

জেনেসিস সেন্টারের দরজা দিয়ে মানুষ যখন বেরিয়ে গেলেন, ক্যালগেরির আকাশে তখনও আগস্টের ধোঁয়াটে আবহ।

কেউ ফিরলেন বাড়িতে। কেউ ফিরলেন অন্য শহরে। কেউ হয়তো ফিরলেন নিজের ব্যস্ত জীবনে।

কিন্তু দুই দিনের আলোচনার একটি প্রশ্ন তাঁদের সঙ্গে থেকে গেল—

অস্থির পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে নিজেকে স্থির রাখবে?

জলসার উত্তর ছিল—সত্যের প্রতি অটল থেকে, কথায় সংযম রেখে, মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে, পরিবারকে ধারণ করে, নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি কর্তব্য পালন করে এবং সর্বোপরি স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে।

সম্ভবত এ কারণেই এবারের জলসা সালানা পশ্চিম কানাডাকে শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে দেখলে এর পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না।

এটি ছিল এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ, কোথাও বিভাজন, কোথাও অবিশ্বাস—আর কোথাও দাবানল।

তার মধ্যেও মানুষ এক জায়গায় এসে বসেছে।

কেউ কথা বলেছে সত্য নিয়ে।
কেউ কৃতজ্ঞতা নিয়ে।
কেউ বাবা-মায়ের কথা বলেছে।
কেউ দেশের কথা বলেছে।
কেউ আত্মার কথা বলেছে।
আর শেষ মুহূর্তে সবাই মিলে প্রার্থনা করেছে আগুনে ঘর হারানো মানুষগুলোর জন্য।

বাইরে তখন পৃথিবী জ্বলছিল।

ভেতরে মানুষ খুঁজছিল—আলো।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles