আমাদের ছোটকন্যা

আমাদের ছোটকন্যা - the Bengali Times
মোস্তফা আকন্দ

আমাদের ছোট কন্যাটি নিজের পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে কুমনে (Kumon) পড়ায়।

কুমন একটি জাপানি মডেলের প্রাইভেট টিউটরিং সেন্টার। কানাডার প্রায় সব শহর ও শহরতলীতে এই কুমনের ফ্র্যাঞ্চাইজি বেশ চোখে পড়ে। তাতে বোঝা যায় এর চাহিদা ব্যাপক।

- Advertisement -

সেখানে আমাদের কন্যাটি সপ্তাহে তিন ঘণ্টা বাচ্চাদের পড়ায়। প্রতি ঘণ্টায় ১৪ ডলার করে মজুরি পায়। মানে সপ্তাহে তার আয় ৪২ ডলার।

তাকে গাড়িতে করে নিয়ে যাই, আবার বাসায় নিয়ে আসি। তাতে আমার এক ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। আমার এক ঘণ্টার সময়ের দাম তো আছে। সেটা তো আর কুমন দেয় না।

আর্থিক হিসাবে তার এই কুমনের চাকরি লাভজনক নয়। আয় মাত্র ৪২ ডলার, কিন্তু খরচই বেশি। সাথে তার পড়ালেখায় ক্ষতি হয়। তারপরেও আমি তাকে চাকরিটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেই ও সহায়তা করি।

আপাতদৃষ্টিতে এটি অলাভজনক হলেও এটি তার ভবিষ্যতের জন্য অনেক লাভজনক। এই তিন ঘণ্টার চাকরি করে সে অনেক কিছু শিখছে।

তার নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি হচ্ছে। কারণ ক্লাসে তাকে বাচ্চাদেরকে সুপারভাইজ করে শিক্ষণ পরিবেশ বজায় রাখতে হয়।

তার মধ্যে সময়ানুবর্তিতার গুরুত্বও তৈরি হচ্ছে, কারণ তাকে সঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে হচ্ছে।

ক্লাসে বাচ্চারা নানা রকম ঝামেলা করে, সেগুলো ম্যানেজ করে বাচ্চাদের লার্নিং গোলস অর্জন করাতে হচ্ছে। ফলে সে সমস্যা সমাধানের টেকনিকগুলো অর্জন করছে।

তাকে অন্য শিক্ষকদের সাথে কোলাবোরেশন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেন্টারের কারিকুলাম শেষ করতে হচ্ছে। ফলে তার পরিকল্পনা, সমন্বয় ও টিমওয়ার্কের ব্যাপারে দক্ষতা বাড়ছে। এভাবে দিনে দিনে তার সফট স্কিল বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে তার প্রফেশনাল জীবনে কাজে লাগবে। কারণ সব দেশেরই এমপ্লয়াররা কর্মীদের মধ্যে এই স্কিলগুলো খোঁজে।

বাচ্চাদের পরিপূর্ণ বিকশিত মানুষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য শুধু স্কুলের পড়া ও শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। স্কুলের কারিকুলামের বাইরে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

চাকরিবাকরি না করলেও বাচ্চাদেরকে ঘরে অথবা বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবার কাজ, বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, ডিবেটিং, সাহিত্যিক ক্লাবে সংযুক্ত হতে সহায়তা করা উচিত। এতে বাচ্চাদের দক্ষতা তো অর্জন হয়ই, সাথে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

আর বর্তমান সময়ে বাচ্চাদেরকে তো ঘর থেকে বের করাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। কারণ তারা অনলাইনে নানান কিছুতে ব্যস্ত থাকে। রাতে ঘুমাতে চায় না। ফলে সকালে ঘুম থেকেও উঠতে চায় না।

তারপর বাইরে আছে নানান রকমের মাদকের হাতছানি। ইদানীং কিশোর-কিশোরীরা সহজেই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

ঘরে-বাইরে সবখানে বিপদ। বাবা-মায়েদের জন্য হয়েছে মহাবিপদ। কানাডায় অনেক বাচ্চা স্কুল শেষ করতে পারছে না, কেউ কেউ ইউনিভার্সিটি শেষ করলেও চাকরিবাকরি জোগাড় করতে পারছে না। কেউ আবার চাকরি পেলেও চাকরি ধরে রাখতে পারছে না সফট স্কিলের অভাবে অথবা মানসিক সমস্যার কারণে। কারণ মাদক ও গেমিং আসক্তির কারণে আমাদের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশ ভালো নেই।

মাদক, অনলাইন গেমিং, সোশ্যাল মিডিয়াকে দোষ দিয়ে আমাদের কেউ কেউ হয়তো পার পাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আসলেই কী আমরা পার পাচ্ছি? মনে হয় না।

মাদকের সরবরাহ, বিক্রি ও তার ব্যবহারের ওপর আমাদের হয়তো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেরকম সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নেই সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন গেমিংয়ের ওপর।

কিন্তু আমরা এগুলোর শিকার হচ্ছি প্রতিনিয়ত।

এক কথায় এ বিশাল সমস্যার সমাধান নেই।

কিন্তু সমস্যাকে উপলব্ধি করাটা জরুরি। যতটুকু পারা যায় বাচ্চাদেরকে সময় দেওয়া গেলে হয়তো আমাদের বাচ্চারা কিছুটা নিরাপদ থাকতে পারে।

শুধুমাত্র সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারকে দোষ দিয়ে নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

শেষ কথা বলি, যতটুকু পারা যায় আমাদের উচিত আমাদের বাচ্চাদেরকে সংসারের নানা কাজে, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবা, চাকরি, বিভিন্ন বিষয়ে সংযুক্ত হতে সহায়তা করা উচিত। তাতে জীবন দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবেও তারা সুস্থ বেড়ে উঠতে পারবে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles