
ডিবি কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের খাবারের ছবি তুলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশের সিদ্ধান্ত তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ। এ-সংক্রান্ত একটি ফোনালাপের প্রতিলিপি বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব অডিও রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ওবায়দুল কাদের ও হারুন অর রশীদের কথোপকথনের প্রতিলিপি অনুযায়ী, সমন্বয়কদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের ছিল না বলে দাবি করেন হারুন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধানের নির্দেশেই খাবারের ব্যবস্থা এবং ছবি তোলা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের জানতে চান, সমন্বয়কদের খাওয়ানোর পর ছবি তুলে তা বাইরে প্রকাশ করতে বলা হয়েছিল কি না। জবাবে হারুন বলেন, ছবি তোলা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের জন্য তা পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
হারুন আরও দাবি করেন, তিনি যা করেছেন, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশেই করেছেন। এর বাইরে নিজের সিদ্ধান্তে কিছু করেননি বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টি যাচাই করতে প্রমাণ নেওয়ার জন্য ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে হারুন অভিযোগ করেন, তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর অপরাধ কী—ওবায়দুল কাদেরের কাছে তা জানতে চান তিনি।
হারুনকে সরানো নিয়ে কাদের-কামালের আলোচনা
এদিকে ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আরেকটি ফোনালাপের প্রতিলিপিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে হারুন অর রশীদকে ডিবির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা হয়।
আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, হারুনকে ডিএমপির মধ্যেই রাখা হবে, তবে তাঁর দায়িত্ব পরিবর্তন করা হবে। অন্য কোথাও দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ডিএমপিতে রেখেই শুধু ডিবির দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এ সিদ্ধান্তে পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি এবং বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের। জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও পুলিশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা স্বীকার করেন।
কথোপকথনে কামাল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী হারুনকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরই তাঁর দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিষয়টি সাত দিন ধরে কার্যকর করার জন্য বলা হচ্ছিল বলেও জানান তিনি।
এরপর ওবায়দুল কাদের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে বলেন। জবাবে কামাল জানান, তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই হারুনের দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান আসামি।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরে ২ আগস্ট মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
বর্তমানে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।

