
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে গোর্ডি হাউ ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক সেতু। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরকে নতুন গতি দেবে। তবে পরিবহন খাতে বড় ধরনের সাশ্রয় হলেও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম কমবে এমন প্রত্যাশা এখনই বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন ট্রাকিং শিল্পের প্রতিনিধিরা।
নতুন ছয় লেনের গোর্ডি হাউ ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ সরাসরি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের হাইওয়ে ৪০১-কে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারস্টেট-৭৫ মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল আরও সহজ, দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন হবে। এতদিন সীমান্ত পারাপারের জন্য প্রধান ভরসা ছিল প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো অ্যাম্বাসাডর ব্রিজ। কিন্তু সেই সেতুতে যানজট, একাধিক ট্রাফিক সিগন্যাল এবং জটিল সংযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রায়ই সময় নষ্ট হতো। নতুন সেতু চালু হওয়ায় সেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন সেতুর মাধ্যমে সীমান্ত পারাপারের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দ্রুত এক্স-রে স্ক্যানিং এবং তুলনামূলক কম টোলের কারণে বড় ট্রাকিং কোম্পানিগুলো প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে। এই সেতু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী মহলের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোর এখন আরও কার্যকর, নির্ভরযোগ্য এবং ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসায়ীরা এখন নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে তাদের পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাবে। বিলম্বের আশঙ্কা কমে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও স্থিতিশীল হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যদিও পরিবহন খাতে ব্যয় কমবে, তবুও এর সরাসরি প্রভাব বাজারে পণ্যের দামের ওপর পড়বে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একটি পণ্যের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে কেবল পরিবহন ব্যয় নয়, বরং উৎপাদন খরচ, শ্রম ব্যয়, জ্বালানির দাম, শুল্ক, মুদ্রাস্ফীতি, গুদামজাতকরণ এবং খুচরা বিক্রেতাদের পরিচালন ব্যয়সহ আরও অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ট্রাকিং কোম্পানির সাশ্রয় হলেও সেই সুবিধা পুরোপুরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
প্রায় ৯৬ বছর ধরে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে অ্যাম্বাসাডর ব্রিজ। তবে পুরোনো অবকাঠামো হওয়ায় এর সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। নতুন গোর্ডি হাউ ব্রিজে রয়েছে : ছয় লেনের আধুনিক সড়ক ব্যবস্থা। অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ও এক্স-রে স্ক্যানিং প্রযুক্তি। দ্রুত সীমান্ত ছাড়পত্রের সুবিধা। প্রতিযোগিতামূলক ও তুলনামূলক কম টোল। সরাসরি মহাসড়ক সংযোগ, যেখানে অতিরিক্ত এক্সিট র্যাম্প বা একাধিক ট্রাফিক সিগন্যালের প্রয়োজন নেই। এসব সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যানবাহনের চলাচল আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গোর্ডি হাউ ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ ব্যয় ও অর্থায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কয়েক মাস ধরে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার পর অবশেষে এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলো।
এই সেতু কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং উত্তর আমেরিকার সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। উৎপাদন, অটোমোবাইল শিল্প, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং সীমান্তনির্ভর বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাজার খরচে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার গতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই অধিকাংশ বিশ্লেষকের অভিমত।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

