
বাবার কথাটাই বলি আগে। চলে যাবার মতন সাহসী কাজটা তিনিই প্রথম মাথা পেতে নিলেন। যে সমস্ত বাবারা অদ্ভুত স্বভাবের হন আমার বাবা ছিলেন তাদেরই একজন। কত কথা বলা যায় তাকে নিয়ে, আজ শুধু একটাই বলবো।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একরাতে হঠাৎ প্রচণ্ড পেট ব্যথা শুরু হলো। কেমন করে মা যেন সেটা টের পেয়ে আমার ঘরে এসে হাজির। আমার ঘরের দরজা বরাবর খোলা থাকতো। নিজে ঘুমাতে যাবার আগে মা এসে চার-পাঁচবার পরীক্ষা করে দেখতেন মশারির নিচ দিয়ে মশা ঢোকবার কোনো ব্যবস্থা রয়ে গেল কিনা? জাজিমের নীচে বার বার মশারি গোঁজা মায়ের অভ্যাস। মাথার কাছে এক গ্লাস পানি ঠিকমত পিরিচ দিয়ে ঢাকা হলো কিনা সেটাও তার দেখবার বিষয় ছিল। হাতের নাগালের মধ্যে টেবিল রাখা না হলে বার বার টি-টেবিল সরাতেন। তার ছেলের রাতে পানি পিপাসা লেগে গেলে তবে যেন বিছানা থেকে নামতে না হয় সে-ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেই তিনি শুতে যেতেন। আরো একটি কাজ আমার মা করতেন। পানির গ্লাসের নীচেও একটা পিরিচ থাকতো। সেই পিরিচে কিছু পানি ঢেলে রাখা হতো যাতে কোন পিঁপড়া গ্লাসের উপর গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে না পারে। তার ছেলে পানি খেতে যাবে আর তখন একরাশ পিঁপড়া ঢুকে যাবে মুখে, তবে আর তিনি মা হলেন কেন! মায়ের পাগলামির লিস্ট অনেক বড়। বাবার কথাই শেষ করতে পারবো না। তার ওপর মায়ের কথা তুললে বেলা পার হয়ে যাবে।
যা বলছিলাম। আমার ব্যথা কমানোর জন্য মা তার ডাক্তারি বিদ্যা খুলে বসলেন। প্রথমে এক গ্লাস চিনির সরবত খেতে দিলেন। বললেন এক ঢোকে শেষ করে ফেলতে। তাতে কোন কাজ হলো না দেখে পরবর্তীতে নিয়ে এলেন লেবু-চিপড়ানো লবণ পানি। মায়ের লেখাপড়া স্কুল পর্যন্ত, কিন্তু ডাক্তারি বিদ্যায় তিনি বিদ্যার জাহাজ। দুঃখের বিষয় সে-রাতে তার বিদ্যার জাহাজ ভেসে থাকতে পারল না বেশিক্ষণ। অনুপায়ে একে একে বাড়ির সকলকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন মধ্যরাতে। বাবা তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন।
বাবার ঘড়ি চলতো বাবার পেছন পেছন। তিনি যখন ঘুম থেকে উঠতেন তখন ঘড়িতে ভোর পাঁচটা। তিনি যখন ঘুমাতে যেতেন তখন ঘড়িতে বাজতো রাত নয়টা। এমন নয় যে রাত নয়টা বেজেছে বলে তিনি ঘুমাতে যেতেন। স্বভাবতই ঘটনার সময় তার গভীর ঘুম। মা তাকে বিরক্ত করতে চাননি বলেই চুপি চুপি অন্যদের ঘুম থেকে তুলে এনেছিলেন। ঘুম থেকে উঠেই বাড়ির কাজের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এবং ছোটবোন রোজী দল বেঁধে এই রাজপুত্রের সেবা করতে লেগে গেল।
শুনলে হাসি পাবে, প্রচণ্ড ব্যথায় যখন ছটফট করছিলাম তখন মায়ের ডাক্তারি বুদ্ধিতে একজন কাজের মেয়ে আমার দু’পায়ে গরম তেল মালিশ করে দিচ্ছিল। ছোটবোন রোজী সে’ও মাথার চুলে হাত বুলিয়ে শুশ্রূষার চরম পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত। যেন পেট ব্যথা ভালো হচ্ছে না সেটা পরে দেখা যাবে। আপাতত মাথা ব্যথাকে আটকানো বড় দরকার।
সব ঘরের বাতি জ্বালানো অবস্থায় অনেকগুলো ফিসফিস শব্দের যোগফল কিন্তু গণগুঞ্জন। বাবার পক্ষে তাই আর ঘুমিয়ে থাকা সম্ভব হলো না। ঘুম ভেঙে যেতেই তিনি আবিষ্কার করলেন তার আদরের পুত্রের শরীরের কোন এক জায়গায় কিছু একটা অসুবিধা হয়েছে। কি হয়েছে তা যেন জানার দরকার নেই।
বাবার চোখের ঘুম তখনো ঠিকমত চলে যায়নি অথচ তার আগেই তিনি সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে গেলেন গলির মাথায় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার চাচার বাড়ি। কেউ তার যাওয়া টের পায়নি, কিন্তু ডাক্তার চাচার বাড়ির গেটের ঝমঝম শব্দ এবং বাবার চিৎকার ‘ডাক্তার ভাই, ও ডাক্তার ভাই, ওঠেন তো দেখি। কি মরার ঘুম রে বাবা, ও ডাক্তার ভাই’ সে সংবাদটাই বয়ে এনেছিল।
ডাক্তার চাচার মরার ঘুম আসেনি। সিলিং পাখাগুলোর মরার শব্দ তার কানে আমার বাবার ব্যাকুল আকুতি পৌঁছে দিতে দেরি করছিল। বাবার কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই তিনি হুমড়ি খেয়ে উঠে চলে এসেছিলেন আমাকে দেখতে। সবকিছু বুঝে নিয়ে তিনি আমাকে এক ডোজ ওষুধ দিয়ে বললেন ‘ফুড পয়জনিং হয়েছে, কয়েকবার দাস্ত হলে ঠিক হয়ে যাবে’।
ডাক্তার চাচা চলে যাবার সময় আরো একটি কথা বলেছিলেন ‘বাবা তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠো। তোমার পেটে যন্ত্রণার সময় ডাক্তারদের ঘুমিয়ে থাকা যেন মস্ত বড় অপরাধ সেটা নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝে ফেলেছ। আর একটু হলে তোমার আব্বা আমার বাড়ির ইট সিমেন্ট খুলে ফেলতেন’।
এখন বাবাও নেই, শুনেছি সেই ডাক্তার চাচাও মারা গেছেন। বাবা বেঁচে নেই সেই ভয়ে পেট ব্যথা হলে টুঁ শব্দটিও করি নি বহুদিন। বাবার রাজপুত্র এখন রাজ্য ছাড়া দেশান্তরী এক শ্রমিক। জীবনচক্রের ঘূর্ণিপাকে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে আর বাবা-মুখি হবার সুযোগ নেই।
আর দশটা বাবাদের চেয়ে আমার বাবা ভিন্ন কিছু ছিলেন না। সব বাবাদের স্বভাবে অভিন্ন একটা গণ্ডগোল লেগে থাকে। সন্তানদের সুখদুঃখ ব্যথা-বেদনায় তারা পাগল হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে, সন্তানেরা বাবা-মায়ের জন্য কতটুকু করে তার বড় উদাহরণ তো আমি নিজেই! পলাতক সন্তান আমি। আর দশটা ভাল ছেলের মত আমি বাবা-মায়ের প্রয়োজনে কাজে আসিনি। বাবার যখন সবচেয়ে আমাকেই প্রয়োজন তখন তার পাশে তো দূরের কথা, কাছেও থাকতে ব্যর্থ হয়েছি।
সুস্থ শরীর আর সুঠাম দেহের মানুষ ছিলেন আমার বাবা। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ মাইল হাঁটাহাঁটি ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। একমাত্র ডায়াবেটিস ছাড়া কোন রোগ ছিল না। ডায়াবেটিস সেটাও ছিল পুরোদস্তুর কন্ট্রোলের মধ্যে। হঠাৎ অবিশ্বাস্য এক সংবাদ পেলাম তার পেটে ক্যান্সার হয়েছে। খবর শুনেই ছুটে গিয়েছিলাম দেশে। জরুরি ভিত্তিতে যা যা করার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি তাকে সুস্থ করতে। থেকে যেতে চেয়েছিলাম দেশে। নওশের ভাই ছিলেন আমার ফুপাতো ভাই। নিজের বড় ভাই না থাকাতে তাকেই বড় ভাই মানতাম। তিনি বললেন এটা জীবনের এক অধ্যায়। তুমি তোমার সংসারে চলে যাও। একজন ভাগ্না ছিলেন বেশ ধনী ব্যক্তি। হায়দার আঙ্কেল বলে ডাকতো আমার বোনেরা। আমি তার অফিসেও গেলাম। কিছু একটা চাকুরী করে বাংলাদেশে থাকা যায় কিনা? আমাদের ছেলে দুটো তখন স্কুলে পড়ে ওদের পড়ালেখার খরচ সহ আঠারো বছর পরে ঢাকায় এসে নতুন করে সব কিছু শুরু করা এসব মিলিয়ে নওশের ভাইয়ের কথা মেনে নিলাম। যতদিন থাকা যায় ছুটি বাড়িয়ে থেকে গেলাম। আব্বার অপারেশন করানো হলো যদিও ওপেন এন্ড ক্লোজ। তারপরও যে প্রয়োজনটা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেটা করতে পারিনি। তার মৃত্যুর সময় কাছে থাকতে পারিনি। ক্যানাডায় ফিরে আসতে হয়েছিল এক সময়। শুনেছি শেষের দিকে তার ব্যথার মাত্রা প্রচণ্ড ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ক্যান্সারের ব্যথা যে কত কষ্টদায়ক তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়, যার হয় সে-ই শুধু বোঝে। আমার সেই সামান্য পেট ব্যথা এটা নয়, যা কিনা এক ডোজ হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খেয়ে এক ঘণ্টায় ভাল হয়ে গিয়েছিল।
একটা উইপোকার মতন ক্যান্সারের জীবাণু দিনে দিনে তাকে খেয়ে ফেলতে লাগল। তিনি ওজন হারিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলেন। একসময় তার গলার আওয়াজ ফিসফিস হয়ে পড়লো। এমন অবস্থায় তিনি কথা বলতেন খুব ধীরে ধীরে। বলতাম আব্বা আসতে হবে? চলে আসি? তিনি বলতে না আমি ভালো আছি। এক সপ্তাহ পরে আবার ফোন করলাম। সেবার ফোন ধরল আমার ভাগ্না আরিফ। তাকে বললাম তোমার নানাকে ফোন দাও। সে ফোন তুলি দিলো নানার কানে কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে আমার কোন প্রশ্নের উত্তর এলো না। একটু পরে আরিফ রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে ইন্টারপ্রেটারের মত বললো, ‘মামা তুমি কথা বলে যাও, নানা সব শুনতে পাচ্ছেন’। আমি বললাম, ‘শুনতে পাচ্ছেন মানে’? আরিফ উত্তর দিলো, ‘নানা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন’।
ধপ্ করে বসে পড়লাম মেঝের উপর। এভাবেই কি মানুষ শেষ হয়ে যায়! সন্তানের সাথে কথা বলার কি চেষ্টা বুকের ভেতর থেকে চাপ দিয়ে কথা বের করে আনতে চাচ্ছেন অথচ শব্দ বের করতে পারলেন না কণ্ঠনালী গড়িয়ে। কি আশ্চর্য ! এই লোকই একদিন ডাক্তারকে বের করে এনেছিলেন রাতের অন্ধকার গুহা থেকে। এরই নাম বুঝি পরিণতি!
আবারো ছুটে গেলাম ঢাকায়। সূতার আগায় ঝোলানো একটা খেলনার মতো মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন শেষের দিকে। ছোট্ট যে কোন বাচ্চাও তাঁকে নাড়াতে পারতো। কামরুল, কাকলী, হিরু, রোজী, রুনি যে যেভাবে পারতো তাকে নাড়াচাড়া করাতো। দ্বিতীয় দফায় মাত্র পনেরো দিন থাকতে পারলাম। ফিরে আসার সময় বাবাকে একটা মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে এসেছিলাম। কয়েকদিন পর আবারো আসবো বলে তার পায়ে চুমু খেয়ে ফিরে এলাম ক্যানাডায়। এর চেয়ে বেশি একদিনও থাকা সম্ভব ছিল না সেবার। আমি ফিরে আসার মাত্র বারোদিন পর আমার মিথ্যা আশ্বাসকে সত্যি ভেবে ভেবে তিনি চলে গেলেন অচেনা আস্তানায়। পৃথিবীর যত শূন্য স্থান আছে সেখানেই আমার বাবার দৃষ্টি। আমি তাই এখনো শূন্যকে দেখি ভক্তির দৃষ্টি দিয়ে।
এক বৎসরের মাথায় ঘটলো আর একটি মহা বিদায়। আমার শ্বশুর একটা উপকার করতেন আমার। নিয়মিত আমাকে চিঠি লিখতেন তিনি। ইন্টারনেট টেলিফোনের যুগেও চিঠি না লিখতে পারলে তিনি সন্তুষ্ট হতেন না। এমনও দেখা গেছে যেদিন টেলিফোনে কথা বলেছি সেদিনের তারিখেও পরবর্তীতে চিঠি এসেছে। একদিন এক নির্জন সন্ধ্যায় দশ পনেরো মিনিটের একটা বাঁচা-মরা কসরা শেষ হতেই তিনি চিরবিদায় নিলেন। পঁচাত্তর বছর ধরে বেঁচে থাকার বাসনা মাত্র পনেরো মিনিটে শেষ হয়ে গেল। আর সেই সাথে সাথে আসল ঘটনারও সমাপ্তি। অর্থাৎ দেশ থেকে কাগজের চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। চিঠি লিখবার হাত মিশে গেছে মাটির সাথে।
দেশে যাবার একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। এয়ারপোর্টে নেমেই দুইজন বাবাকে দেখতে পেতাম একসাথে। এখন পৃথিবী উল্টে গেলেও তাদের আর দেখতে পাব না। হুলুস্থুল সব কাণ্ড করতেন তারা ‘তোমরা সব কি করছ, এই শামীম ড্রাইভারকে গাড়ি আনতে বলো। আমার ছোট বোনের স্বামী শামীম নিজেই পুলিশের আই জি পি মতন উত্তেজিত থাকতো তারওপর দুজন মুরুব্বী তাকে একটা কাজ দিয়েছে সে তখন সেনাবাহিনীর চিফ হয়ে যেতো। দাদা বলে কথা, তার দাদা কানাডা থেকে আসছে আর এসেই তিনি কি লোকের ধাক্কা খাবেন? এসব দৃশ্য আর এখনে দেখা যায় না। দেখার উপায় নেই ব্যস্তসমস্ত দু’টি লোককে আমার হাঁটবার পথ পরিষ্কার করার জন্য যারা অন্যদের ঠেলে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছেন। হাসিমাখা মুখ, উজ্জ্বল চোখগুলো চিরবিদায় নিয়ে গেছে।
এক বছরও হলো না, শ্বশুরের পথ অনুসরণ করলেন শাশুড়ীমা। এক আজব স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। দাও দাও অভ্যাসটা ছিল তর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। মাছের মাথা দাও। পিঠা দাও। আরো একটা কলা, আরো একটি মিষ্টি, একের পর এক শুধু দিয়েই যেতেন। ‘আছে তো বাবা, আরো একটু নাও’ এই সুবচন উচ্চারণ করার মানুষটাও চলে গেলেন। খাওয়াদাওয়া বড় কথা নয়। খাবার সময় কারোর যত্ন যদি মৃদুভাবে বইতে থাকে খাবার টেবিলের চারিপাশে তাহলে অল্প খেলেই মনটা ভরে যায়। অথবা অনেক দিন মনে থাকে। এখন শুধু পেটপূজা হয়। মন যা ভরার সে বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। অথবা মিটিমিটি করে জেগে আছে। কেননা এখন বাবা মা নেই কিন্তু আছেন কিছু প্রশ্রয় দেওয়া মানুষ।
কিছুদিন আগে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো আপনার বাবা মা কি বেঁছে আছেন, প্রশ্নটা শোনামাত্র হাসি পেয়ে যেতো। বাবা মা বেঁচে থাকবে না কেন ? এ আবার কেমন প্রশ্ন ? আমার বয়সের অনেকেরই বাবা মা বেঁচে নেই। এটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞ লোকেরা সে-কথাটি মনে রেখেই প্রশ্ন করতো। আমি শুধু অবিজ্ঞের মতো না বুঝেই প্রশ্নটা শুনে হেসে দিতাম। এখন আর আগের মতো হাসি পায় না। নিজের হাসির কাছে নিজেই ধরা পড়ে গেছি। এখন শুধু কান খাড়া করে শুনি আমাদের ছেলেদু’টোকে কেউ না আবার একই প্রশ্ন করে বসে ! ওদের ঠোঁটের হাসি কতদিন ঝুলে থাকে তা দেখবার বড় শখ জাগে মনে। বাবা মা বেঁচে থাকবে না কেন, এমন গর্ব কবে যেন তাদেরও খর্ব হয়ে যায় ! এটাই তো নিয়ম।
চারজনের মধ্যে তিনজনকে ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছি। চিন্তা করতেও ভয় লাগে গড়ে প্রতি বৎসরে একজন করে বিদায় নিচ্ছেন। যে-মাটি খেয়ে বসেছে তিন তিনজন আপনজন, সে-মাটির দিকে তাকাতেও ভয় লাগে। মাটির খেয়ালের কি কোন ঠিক-ঠিকানা আছে ? হয়তো যখন তখন কারো গায়ে দু’ফোঁটা গোলাপ জল ছিটিয়ে বলে বসবে তোমাকেও বেশ পছন্দ হয়েছে। এসো আমার ঘরে এসো। থ্রি ডাউন, ওয়ান আপ, সেই আপটি হলো আমার মা। স্কুলে পড়া ছেলেকে যিনি একদিন বলেছিলেন, “বেঁচে থাকলে স্বাধীন দেশে আবার দেখা হবে।” তাঁর কথা ষোল-আনা সত্যি হয়েছে। যুদ্ধ শেষে এমনি এক ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে হাতে একটা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে এসে মায়ের পায়ের ওপর ঝুঁকে পড়েছিলাম। তিনি গর্ব করে সেদিন সকলের সামনে কেঁদেছিলেন। ভাসুর দেবর কারো পরোয়া সেদিন তিনি করেননি। এমন কাঁদবার সুযোগ সকলের জীবনে সবসময় আসে না।
এখন আমার নিজের চোখ ফেটে পানি ছুটে আসে মায়ের কথা চিন্তা হলে। গত তিন বৎসর ধরে তিনি অচল হয়ে আছেন। বাত রোগ তাঁকে পঙ্গু করে ফেলেছে, ইদানীং কিডনি এবং হার্ট রোগও যোগ দিয়েছে সাথে।
গেল বছর নভেম্বর মাসে দেশে গিয়েছিলাম মাকে দেখতে। একদিন রাতে হঠাৎ শুনতে পেলাম মায়ের কান্না। দৌড়ে গিয়ে দেখি দু’চোখ বেয়ে তার অঝোরে পানি ঝরছে। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে মা ? তার চোখের পানি মুছে দিলাম আমার হাত দিয়ে। তিনি এখনো কাঁদতে পারেন ঠিকই কিন্তু নিজ হাতে চোখের পানি মুছতে পারেন না। হাত দু’টো চোখ পর্যন্ত উঠাতে তাঁর কষ্ট হয়।
‘এত রাতে কাঁদছেন কেন, আব্বাকে কি স্বপ্নে দেখেছেন,’ মাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘সেই কখন থেকে মেয়েগুলোকে ডেকে যাচ্ছি, তিন তিনটা কাজের মেয়ে এই ঘরে ঘুমাচ্ছে অথচ কেউ আমার ডাক শুনছে না।’ আমি বললাম, ‘ওরা সারাদিন এত খাটাখাটি করে, ঘুমলে কি ওদের হুশ থাকে? কেন ডেকেছিলেন ওদের, আমাকে বলেন।’ মা বললেন, ‘আমার ভীষণ শীত লাগছে। সেই কখন থেকে কাঁপছি। কাঁথাটা একটু টেনে দিতে হবে।’
বুকের পাঁজরের নীচ থেকে কাঁথাটা টেনে গলা পর্যন্ত ঢেকে দিতে দিতে ভাবলাম, এক হাত দূরত্বকে জয় করবার ক্ষমতাও আমার মায়ের নেই। কাজের মানুষদের ডেকে ডেকে হাল ছেড়ে দিয়ে মনের দুঃখে কাঁদতে হয়। এ কান্নার পেছনে কি শীতের কষ্ট, না শীতল কষ্ট। সে-কথা বুঝবার ক্ষমতা আমার নেই।
আমার মা একসময় জেদি স্বভাবের ছিলেন। ক্যানাডা আসার পর প্রথম দিকে বরফ ঠেলে রাত দু’টোর সময় কাজ থেকে ফিরতাম। তখন গাড়িও ছিল না কোনো। থাকতাম এক শহরে, আর কাজ করতাম আরেক শহরে। আমার কষ্টের কথা কে যেন দয়া করে মায়ের কানে পৌঁছে দিয়েছিল। হবে হয়তো আমার কোন শুভাকাঙ্ক্ষী। ছোটবোন রোজী একদিন আবিষ্কার করলো ডিসেম্বরের কনকনে শীতে জানালা খুলে মা তার মুখ বের করে দিয়ে ঠাণ্ডার কষ্ট অনুভব করছেন। রোজী বললো, ‘আম্মা একি করছেন আপনি !’ রোজী তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে দিলো। তিনিও জেদ ধরলেন জানালা বন্ধ করতে দেবেন না। তার ছেলে ঠাণ্ডার মধ্যে ক্যানাডায় কত কি কষ্ট করছে তিনি বুঝি এতটুকু ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারবেন না !
কি থেকে কি হয়ে গেল এসব। এখন বুঝতে পারছি মা-বাবা ছাড়া পৃথিবীতে কোন মানুষ জন্ম নিতে পারে না কেন। পৃথিবীটা সন্তানদের বাসযোগ্য করে তবেই তারা বিদায় নেন। এটাই তাদের ধর্ম।
এখন এও বুঝতে পারছি একজন লোক অন্য আরেকজনকে কেন জিজ্ঞেস করেন তাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন কিনা। আসলে যাদের বাবা-মা এখনো বেঁচে আছেন তারা হলেন ভাগ্যবান। যাদের নেই তারা অভাগা। যাদের সুযোগ রয়েছে চোখের সামনে বাবা-মায়ের হাঁটাহাঁটি দেখবার তারা যেন দু’চোখ ভরে বাবা-মাকে দেখে নেয়। গাল ভরে কথা বলার শখ মিটিয়ে ফেলে। অদৃশ্য হাতের ডাক এলে সন্তানদের ডাকও তারা আর শুনতে পাবেন না। এক অদৃশ্য ডাকে আছে প্রচণ্ড মায়া। যে মায়ার কাছে চোখের পলকে ঢিলে হয়ে যাবে রক্তের বাঁধন।
নাকের আগায় দু’ফোঁটা দম নিয়ে আমার মা এখনো বেঁচে আছেন। কোনকিছু করার শক্তি নেই। তবুও কিছু একটা হলে তাকেই ফোন করি। কোনকিছু করতে হলে তার পরামর্শ শুনি। তার পরামর্শ যে নিতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবুও তাকেই জিজ্ঞেস করি। এই সুযোগটা হয়তো বেশিদিন থাকবে না। যখন থাকবে না তখন হয়তো মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হলে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলবো। অথবা গাছের দিকে তাকিয়ে চোখ ভরা অশ্রু নিয়ে মা’কে খুঁজে বেড়াবো। মা মা বলে ডেকে যাবো নিঃশব্দে।
দেশ থেকে আসার পর প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ, ষোলই ডিসেম্বর এবং দু’টি নববর্ষে মা’কে নিয়মিত ফোন করে আসছি। নির্ভুল এ নিয়ম। তিনিও এই বিশেষ দিনগুলোতে অপেক্ষায় থাকেন ফোন পাবার। শেষ কথা হলো গত ষোলই ডিসেম্বর। এরপর এসে যাবে নববর্ষ। ২০০৪ সাল বেশি দূরে নয়। তাকে এবারো শুভ নববর্ষ বলবো। এবার কেন, এর পরের অনেকগুলো নববর্ষে মা-ছেলের কথা হলেই তাকেই না বলা হবে আশা পূরণ, সাধ মেটা !
পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সকল মা-বাবাকে জানাই নববর্ষের শুভেচ্ছা
স্কারবোরো, কানাডা

