
টরন্টোর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরী শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত ডাউনটাউনের হেইডন পার্ক সেকেন্ডারি স্কুল স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে ওঠা এই স্কুলের পরিবেশ তাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও উপযোগী। তাই বিকল্প কোনো সমাধান বিবেচনা না করে হঠাৎ করে স্কুলটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অভিভাবকদের অভিযোগ, টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড (টিডিএসবি) তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা বা মতামত গ্রহণ না করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে তারা এখন বোর্ডের কাছে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডানডাস স্ট্রিট ওয়েস্ট ও স্পাদিনা অ্যাভিনিউয়ের কাছে অবস্থিত হেইডন পার্ক সেকেন্ডারি স্কুলে বর্তমানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়েদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি স্কুলটির অভিভাবকদের জানানো হয়, পাশের অর্ডে স্ট্রিট পাবলিক স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের জায়গা করে দিতে হেইডন পার্ক স্কুলটি অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। টিডিএসবির সুপারিন্টেন্ডেন্ট জেনিফার চ্যান ২ জুন অভিভাবকদের উদ্দেশে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, ১৪৯ কলেজ স্ট্রিটে একটি ৬০ তলা বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে অর্ডে স্ট্রিট পাবলিক স্কুলের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজের সময় স্কুলের খেলার মাঠের অংশ ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে চলা নির্মাণকাজের ফলে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টিডিএসবির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বহুতল ভবন নির্মাণের সময় কম্পন, অতিরিক্ত শব্দদূষণ, ভারী যানবাহনের চলাচল এবং ওপর থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। অর্ডে স্ট্রিট পাবলিক স্কুলটি কলেজ স্ট্রিট ও ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউয়ের কাছে, মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের আশপাশের ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত। ফলে নির্মাণকাজ চলাকালে স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে বলে বোর্ডের মূল্যায়ন।
টিডিএসবি জানিয়েছে, হেইডন পার্ক সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্তমান ক্যাম্পাসে ক্লাস করতে পারবে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে স্কুলটি নতুন স্থানে স্থানান্তরিত করা হবে। একই সময়ে অর্ডে স্ট্রিট পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের বর্তমান হেইডন পার্ক ভবনে আনা হবে, যাতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে নেওয়া যায়। বোর্ডের মতে, অর্ডে স্ট্রিট স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং তাদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন হেইডন পার্ক স্কুলের অভিভাবকরা। তাদের দাবি, স্কুলটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা অনেক কিশোরীর জন্য এটি নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অভিভাবকদের মতে, শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। ফলে পরিচিত শিক্ষক, সহপাঠী ও স্কুলের পরিবেশ থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শিক্ষাজীবনেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে কোনো অর্থবহ পরামর্শ বা জনমত গ্রহণ করা হয়নি। তারা মনে করেন, বিকল্প ভবন, অস্থায়ী ক্যাম্পাস কিংবা অন্য কোনো সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হলে হয়তো শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর এড়ানো সম্ভব হতো।
অভিভাবকরা এখন টিডিএসবির কাছে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি সমাধান বের করা হোক, যাতে অর্ডে স্ট্রিট পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় এবং একই সঙ্গে হেইডন পার্ক সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীল শিক্ষার পরিবেশও অক্ষুণ্ন থাকে। শিক্ষাবিদদের মতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই ভবিষ্যতে টিডিএসবি কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং অভিভাবকদের উদ্বেগ কতটা গুরুত্ব পায়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

