
টরন্টোর একটি সংশোধনাগারে ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বন্দির ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনায় কানাডাজুড়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে কারাগারগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদের নিরাপত্তা নিয়ে। টরন্টো কমিউনিটি হাউজিং (টিসিএইচসি) কমপ্লেক্সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া লুথার পিপি নামের ওই বৃদ্ধ বর্তমানে গুরুতর শারীরিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ, জেলের ভেতর সহবন্দির হামলায় তিনি পঙ্গু হয়ে পড়েছেন এবং দৃষ্টিশক্তিও হারিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও আদালতের নথি অনুযায়ী, উত্তর ইটোবিকোকের একটি বয়স্কদের আবাসনে বসবাস করতেন লুথার পিপি। প্রতিবেশীদের অভিযোগ ছিল, তিনি প্রায়ই উচ্চস্বরে চিৎকার করতেন, অন্যদের অপমান করতেন এবং মাঝেমধ্যে ভবনের সিঁড়িতেই ঘুমিয়ে থাকতেন। তবে একইসঙ্গে অনেকেই বলেছেন, পিপির আচরণে মানসিক অসুস্থতার স্পষ্ট লক্ষণ ছিল এবং তার চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল। এক প্রতিবেশী বলেন, “তিনি বিরক্তিকর ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি একজন অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষ। তার চিকিৎসা দরকার ছিল, এই পরিণতি নয়।”
আদালতের নথিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এক প্রতিবেশীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ছিল জনসমক্ষে বিপজ্জনক আচরণের উদ্দেশ্যে প্রায় ৩০ ইঞ্চি দীর্ঘ একটি কাঠ বহন করা এবং টরন্টো কমিউনিটি হাউজিং ভবনের ক্ষতিসাধন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর লুথার পিপিকে পাঠানো হয় টরন্টো সাউথ ডিটেনশন সেন্টারে। সেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বন্দিদের জন্য নির্ধারিত একটি সেলে তাকে রাখা হয় ৫০ বছর বয়সী ডগলাটস ডেস্ট্রাজিয়ন্স-ডুমেসনিলস নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডেস্ট্রাজিয়ন্স-ডুমেসনিলসের বিরুদ্ধেও অতীতে সহিংস ও বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগ ছিল।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গত ১২ এপ্রিল সেলের ভেতরে ডেস্ট্রাজিয়ন্স-ডুমেসনিলস লুথার পিপির ওপর নৃশংস হামলা চালান। এতে বৃদ্ধ বন্দি গুরুতরভাবে আহত হন এবং তার জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলার ফলে পিপি স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছেন।
ঘটনার পর লুথার পিপির বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ডেস্ট্রাজিয়ন্স-ডুমেসনিলসের জামিন শুনানি মঙ্গলবার অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিসে অনুষ্ঠিত হয়। তবে শুনানি দীর্ঘ হয়নি। আদালতে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের নাম পর্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে পারছিলেন না। তার মানসিক অবস্থার অবনতির কারণে তাকে একটি সুরক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অন্টারিওর সংশোধনাগার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিকভাবে অসুস্থ বা দুর্বল বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের অভাব ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংশোধনাগারগুলোতে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, পৃথক পর্যবেক্ষণ ইউনিট এবং দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে জেলে পাঠানো হলেও বাস্তবে তাদের প্রয়োজন চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি হামলার তদন্তেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি কানাডার কারাগার ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা দুর্বল, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

