
ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন যেন এখন কিশোর-কিশোরীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পড়াশোনা, বিনোদন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ সবকিছুই এখন স্ক্রিনকেন্দ্রিক। কিন্তু সেই নির্ভরতা কোথায় গিয়ে অতিরিক্ত হয়ে উঠছে, তা নিয়েই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা।
তরুণ কানাডিয়ানরা প্রতিদিন গড়ে ৫ দশমিক ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে মোবাইল ফোনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিমাণ সময় শুধু অভ্যাস নয়, ধীরে ধীরে তা মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কানাডিয়ান পেডিয়াট্রিক সোসাইটি দীর্ঘদিন ধরেই শিশু ও কিশোরদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্ক্রিনটাইমের সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু গবেষণার ফল বলছে, প্রতি দশজন কিশোরের মধ্যে নয়জনই সেই সীমা অতিক্রম করছে। অর্থাৎ অধিকাংশ তরুণ-তরুণীই চিকিৎসকদের পরামর্শের দ্বিগুণেরও বেশি সময় কাটাচ্ছে স্ক্রিনে।
এই অতিরিক্ত স্ক্রিন নির্ভরতা ভবিষ্যতে মানসিক ও সামাজিক আচরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। টরন্টোর একজন সাইকোলজিস্ট বলেন, স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আচ্ছন্নতা উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করতে পারে। তার কথায়, “যখন কেউ সারাক্ষণ স্ক্রিনে ডুবে থাকে এবং অন্যরা কী করছে তা নিয়ে ক্রমাগত চিন্তা করতে থাকে, তখন সেটা ধীরে ধীরে মানসিক সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে হওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।”
মনোবিদদের মতে, কিশোর বয়স এমন একটি সময় যখন ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। এই সময় অতিরিক্ত ভার্চুয়াল নির্ভরতা বাস্তব সম্পর্ক, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক মেলামেশাকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে একাকিত্ব এবং মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় রজার্স “স্ক্রিন ব্রেক ইনিশিয়েটিভ” নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এর অংশ হিসেবেই ২ মে “দি ৫.২ প্রজেক্ট” শুরু হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এই জাতীয় কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ডলার। মূল লক্ষ্য, কিশোরদের মধ্যে প্রযুক্তির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ওশোয়ার বাসিন্দা জেফ গোথিয়ের জানান, তার ১৫ বছরের ছেলে কাইডেন প্রতিদিন গড়ে ৮ দশমিক ২২ ঘণ্টা সময় স্ক্রিনে কাটায় এই তথ্য জানার পর তিনি কার্যত হতবাক হয়ে যান। একজন সাইকোথেরাপিস্ট বলেন, “আমি আগেও ওর স্ক্রিনটাইম নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু এতটা সময় ব্যয় করছে জানার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। প্রায়ই বলতে হয় ফোনটা নামাও, অন্য কিছু করো, পড়াশোনা শেষ হয়েছে কি না দেখো, ভিডিও গেমে কত সময় কাটাচ্ছো সেটা ভাবো।”
অভিভাবকদের মধ্যেও এই নিয়ে দুশ্চিন্তা স্পষ্ট। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি দশজন বাবা-মায়ের মধ্যে নয়জন মনে করেন তাদের সন্তান অতিরিক্ত সময় ফোনে কাটাচ্ছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অভিভাবক এটিকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখছেন।
শুধুমাত্র সময় কমানোই সমাধান নয়। বরং পরিবারে “ডিজিটাল ব্যালান্স” তৈরি করা জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ের পরে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, খেলাধুলা ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এসবই কিশোরদের সুস্থ মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তি আজকের বাস্তবতা। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতা বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কাই এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

