করিমুননেছা

করিমুননেছা - the Bengali Times
আকতার হোসেন

দুজন সাক্ষীকে সাথে নিয়ে কাজী সাহেব অন্দরমহলে গেলেন।

করিমুননেছা মেঝের উপর পাটিতে বসা। কাজী সাহেব বললেন মোসাম্মৎ করিমুননেছা, উল্টো-ডাঙ্গার মরহুম রহমত উল্লার দ্বিতীয় পুত্র জনাব মেজবা উদ্দিনের সাথে এক লক্ষ দশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনার বিবাহ স্থির করা হইয়াছে। আপনি এই বিবাহে রাজি থাকিলে বলুন ‘কবুল’।

- Advertisement -

করিমুননেছা গভীর ভাবনায় ডুবে আছে। হাঁ না কিছুই বলছে না। অবশ্য এ রকম দৃশ্য সব বিয়েতেই দেখা যায়। কাজেই উৎসুক লোকজন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। বয়স্করা অতিরিক্ত এক খিলি পান মুখে দেয়।

মাঘ মাসে বিয়ে তাই করিমুননেছার আত্মীয়স্বজন সাধ্যমত গরম কাপড় পরে বসে আছে। কয়েকটি দুষ্ট ছেলে শুঁকনো পাতা জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে তাপ নিচ্ছে। এই অঞ্চলে বিয়ে শাদি শুরু হয় অনেক রাতে। এশার নামাজ পড়ে বরযাত্রী রওনা দিয়েছিল কাজেই এ বিয়েও রাত গড়িয়ে শেষ হবে।

সিরাজ মাষ্টার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পালাচ্ছে। কার জন্য সে গ্রামে থাকবে? উঁচু নিচু কিংবা ঝুরঝুরে ভাঙ্গা পথকে সে মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না। হাঁপিয়ে গেলে একটু থেমে নেয়, সেই ফাঁকে অন্ধকারের শেষে আলোর সন্ধান করে। কোথাও আলো দেখতে না পেয়ে আবার ছুটতে থাকে তার দুচাকার রকেট।

ক্লাস নাইনের সবচাইতে মেধাবী ছাত্রীর বিয়ে। লোকে বলে যথেষ্ট যত্ন নিয়ে করিমুননেছাকে পড়াত সিরাজ মাষ্টার। কিন্তু সিরাজ মাষ্টার সবসময় দাবী করত করিমুননেছা নিজ গুনেই এতো মেধাবী ছাত্রী। প্রিয় ছাত্রীর বিয়ে হচ্ছে অথচ সিরাজ মাষ্টার বিয়েতে উপস্থিত হতে পারছে না। কোথায় যাচ্ছে নিজেও জানে না। করিমুননেছার বিয়ে হচ্ছে এক প্রভাবশালী পরিবারে। কেউ বাঁধা দিলে বাপ দাদার ভিটায় ঘুঘু চড়িয়ে দেবে। মাষ্টারের তো চাল চুলা কিছুই নেই। বাঁধা দেওয়া তো দূরের কথা, মুখ ফুটে বিলম্বিত করারও সাহস নেই।

করিমুননেছার দীর্ঘ নীরবতার কারণে কাজী সাহেব অস্থির হয়ে ওঠেন। তবুও বর পক্ষের অনুরোধে তিনি আবারো বললেন, মোসাম্মৎ করিমুননেছা! মরহুম রহমত উল্লার দ্বিতীয় পুত্র জনাব মেজবা উদ্দিন কোটিপতির সাথে এক লক্ষ দশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনার বিবাহ স্থির করা হইয়াছে। আপনি এই বিবাহে রাজি থাকিলে বলুন ‘কবুল’।

করিমুননেছা তখনও ভেবে চলছে কবুলের বিপরীত শব্দ কী হতে পারে?

কাজী সাহেবকে ফজরের নামাজের ইমামতি করতে হবে। এখনো তার সকালের টাট্টি করা হয়নি। একাজে তাকে কমসেকম একঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। সেসব নিয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত। সংক্ষেপে আরও একবার বললেন, করিমুননেছা বিবাহে রাজি থাকিলে বলুন ‘কবুল’।

করিমুননেছা জিজ্ঞেস করলো আমার কী কী বলার সুযোগ আছে?

কাজী সাহেব বললেন আপনি বলুন ‘কবুল’

যদি কবুল না বলতে চাই তাহলে কবুলের বিপরীত শব্দ কী?

কাজি সাহেব রেগে গিয়ে বলেন ফিতনা করবেন না করিমুননেছা!

করিমুননেছা জোরালো ভাবেই প্রশ্নটা করলো, আরে বেটা কবুলের বিপরীত শব্দ কী?

ভোর হয় হয় করছে। যে কোন সময় শোনা যেতে পারে ‘ঘুম হইতে নামাজ শ্রেষ্ঠ’। কাজী সাহেব বললেন নাউজবিল্লাহ, কলি যুগ এসে গেছে। আমি আগেই শুনেছি এই মেয়ে বজ্জাত তাই বিয়া পড়াইতে রাজি ছিলাম না। এখন নিজ কানে তার বজ্জাতি শুনলাম।

পেছনে বসে থাকা এক পাল মহিলাদের উদ্দেশ্য করে করিমুননেছা বলল খবর্দার, পেছন থেকে কেউ আমার মাথায় ধাক্কা দিবা না। আমি মাথা নোয়াবো না। তারপর সে বলল, কাজী সাহেব কবুলের বিপরীত শব্দ বলেন। জানা না থাকলে কোরআন হাদিস দেখে উত্তর দেন। তাও যদি না পারেন তাহলে বাইরে গিয়ে ভোরের জন্য অপেক্ষা করেন।

ঠিক তখন অন্দর মহল থেকে একজন মহিলার প্রত্যাশিত কান্না ভেসে এলো। তিনি তার কন্যাকে কত কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন তার একটা সারসংক্ষেপ কান্নার মধ্যে বয়ান করে চললেন। এই মেয়েকে এখন কে বিয়ে করবে সে আশঙ্কার কথা জানাতে লাগলেন সুর করে। আজ যদি তার বাবা বেঁচে থাকতো তাহলে করিমুননেছা কোনদিন এই কাণ্ড করতে সাহস পেত না। করিমুননেছার মা এভাবেই বিয়ে ভেঙ্গে যাবার জন্য কান্না চালিয়ে যেতে থাকেন।

যেসব বিয়ে ভেঙ্গে যাবার জন্য বিয়ের কনেদের ঘাড়ে দোষ চাপানো হয় করিমুননেছার বিয়ে ভেঙ্গে যাবার জন্য সেভাবেই তাকে দোষী করা হলো।

সিরাজ মাষ্টারের রকেট একসময় নতুন পথের সন্ধান পায়। তারপর সেই বাইসাইকেল পিচ ঢালা পথে উঠে আসে। সে নিজ সিদ্ধান্তে অটুট থাকে। কোনদিন আর গ্রামে ফিরে আসে না।

চল্লিশ বছর পর আজও অনেকে বলতে পারবে না সিরাজ মাষ্টারের ভালোবাসা বেঁচে আছে না মরে গেছে।

একই প্রশ্ন করিমুননেছাকে করা হয়েছিল। সে উত্তর দিয়েছে, যে ছেড়ে যায় সে ফিরে আসে।

 

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles