
রোদে ঝলমলে ছিলো দুপুরটি। নীল আকাশে ছিলো সাদা মেঘের ভেলা। বিশেষ ছুটির দিন বলে রাস্তা ছিলো মোটামুটি ফাকা।শান্ত ছায়া সুনিবীর মফস্বল শহর।চারিদিকে তাঁকালে মনে হয় গুচ্ছ গুচ্ছ ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
ধীরে ধীরে একটি রিকশা এসে থামলো দোতালা বাড়ীটির সামনে। মেয়েটি তার ভাইয়ের সাথে নেমে আসলো রিকসা থেকে।মেয়েটি কখনো আসেনি এই বাড়ীতে। কেমন যেনো একটা অসস্হি ঘিরে ধরছিল তাকে।ঘন্টাখানেক আগেও মেয়েটি ভাবেনি সে আসবে এবাড়ীতে। মেয়েটির ভাই কোথায় যাবে না বলেই বোনকে বিশেষ দিনে বেড়াতে যাবার কথা বলে রিকশা নিয়ে বেড় হয়েছিল। কিছুটা পথ আসার পর মেয়েটিকে বলা হয়েছিলো ওরা কোথায় যাচ্ছে? সেটা শুনে ভয়ে লজ্জায় মেয়েটির হাত পা ঠান্ডা ,মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। রিকসা থেকে নেমেই দেখতে পেলো একজন দাঁড়িয়ে আছে বুঝা গেলো তাদের ভিতরে নিয়ে যাবার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে ছেলেটি।
ছেলেটিকে অনুসরণ করে ওরা ভাই বোন সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
বাড়ীর বসার ঘরে প্রবেশ করে মেয়েটি দেখলো ঘর ভরতি লোকজন। কিন্তু সবাই মেয়েটির পরিচিত।কিন্তু আশ্চর্য কেউ মেয়েটিকে দেখে বিস্মত হলো না। মনে হলো সবাই জেনো জানতো আজ মেয়েটি আসবে,শুধু মেয়েটিই কিছু জানতো না।অল্প কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়ের পরে ,যার সাথে দেখা করবার জন্য মেয়েটিকে আনা হয়েছে ,তার পরিবারের একজন তাকে একটি খালি ঘরে নিয়ে বসিয়ে বললেন ,এখানে বসো ও আসবে এখনি।দুই মিনিটের মধ্যে সে ঘরে এলো। একটি চেয়ার টেনে মেয়েটির মুখোমুখি এসে বসলো।ছেলেটির মুখোমুখি বসে মেয়েটি অস্বাভাবিক ভাবে ঘামতে লাগলো। মনে হচ্ছিলো এখনি বুঝি তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ দুই সাপ্তাহ আগেই ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যমপাসে বসে কতো গল্প করেছে,স্বপ্ন দেখেছে ঘর বাধার। হঠাৎ করে জীবনের সব কিছু বদলে গেলো।এমন ঘটনার জন্য ওরা কেউই প্রস্তুত ছিলো না।
ছেলেটি মেয়েটির চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো ,একেবারে চলে এসেছো তো? মেয়েটি মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বললো না।ছেলেটি আবার প্রশ্ন করলো ,কেনো? মেয়েটি আবারও মৃদুস্বরে বললো ,এভাবে আমি পরিবারের সন্মান নষ্ট করতে পারবো না। তারপর দুজনের মাঝে আর কোন কথা হয়নি।
শুধু দুজনের চোখ দিয়ে অঝর ধারায় অশ্রু ঝরেছিল। সেদিন তাদের অশ্রু ধারা শ্রাবণ ধারাকেও হার মানিয়েছিল। তারা বুঝে নিয়েছিলো আজ থেকে ওরা দুজন একে অপরের কাছে প্রাক্তন। কেঁদে কেঁদে যখন দুজনের চোখই শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গিয়েছিলো তখন তারা কেউ কিছু না বলেই একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিলো।ছেলেটি মেয়েটিকে বিদায় জানাতে বাড়ীর গেট পরযন্ত এলো। মেয়েটি পেছনে না তাকিয়ে তার ভাইয়ের সাথে রিকশায় উঠে গেলো। হঠাৎ একটা শব্দে মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে তাঁকাতে দেখলো ছেলেটি দুহাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।
মেয়েটি নিজেকে সামলাতে না পেরে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকলো।
এটাই ছিলো তাদের জীবনএর শেষ দেখা। কতো বেলা বয়ে গেলো ,কতো মাস কতো বছর পেরিয়ে গেলো ,কতো যুগ পার হলো কিন্তু তাদের আর কোন দিনই দেখা হলো না। মেয়েটি এখন প্রবীন জীবনে পা দিয়েছে। জীবন কেটে গেছে স্বামী ,সন্তান,সংসারের ব্যস্ততায় আর এখন নাতি নাতনীদের নিয়ে অন্য রকম আনন্দের জীবন।তবুও এ বয়সে এসেও মাঝে মাঝে মহা সমুদ্রের তুমুল ঝর বুকের ভেতরটা নাড়া দিয়ে যায় মেয়েটির।চোখের সামনে ভেসে আসে সে নিরজন দুপুরের বাধভাঙ্গা কান্না।চোখ দুটো জ্বালা করে উঠে এখনো। মনে মনে ভাবে কোন দিন যদি একবার দেখা হতো শেষ বারের মতো?
ম্যাল্টন, কানাডা

