
বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে গাম্বিয়া নামের যে দেশটি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছে ৩২ বছর আগে আমি সেই দেশে গিয়েছিলাম। আমার ছোট বোন রুনী থাকতো পার্শ্ববর্তী সেনেগালের ডাকার শহরে। ওদের ওখানে ঘুরতে গিয়ে একদিন গাম্বিয়াতে চলে যাই। সাথে ছিলেন ছোট বোনের স্বামী সোহরাব হোসেন। সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রার ১৯৮৭ সালের ২৬ জুন সংখ্যায়। আপনাদের জন্য ৪৫-৪৭ পাতা থেকে হুবহু তুলে দিলাম।
কুন্তে কান্তার দেশে
পশ্চিম আফ্রিকার একটি ছোট্ট দেশ দি গাম্বিয়া। জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ। শতকরা ৯০ ভাগই মুসলমান বাকী দশ ভাগ খৃষ্টান। বন্ধুত্ব ও অমায়িক ব্যবহারের সুখ্যাতি রয়েছে এদেশ বাসিদের। এরা সাধারণত লম্বা, পরিশ্রমী এবং কালো। একাধিক এথনিক গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বললেও প্রায় সকলেই ইংরেজি বলতে পারে। সরকারী কাজকর্ম ইংরেজিতেই চলে।
ব্রিটিশরা ১৮৫৬ সালে বাণিজ্যের উদ্দেশ্য নিয়ে এদেশে আসে এবং সামান্য কয়েক দশকের মধ্যে তাদের অবস্থান দৃঢ় করে এদেশের উপর রাজত্ব করতে থেকে। ১৯৬৫ সালে দি গাম্বিয়া স্বাধীনতা লাভ করে, এ বছর (১৯৮৭) দেশটি তার ২২তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করলো।
জুফরি নামক গ্রামের এক বৃদ্ধা মহিলাকে এক নজর দেখার জন্য গাম্বিয়াতে গিয়েছিলাম। রাজধানী বেনজুল হতে ৩২ কিলোমিটার দূরে গাম্বিয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ক্ষুদ্র গ্রাম জুফরি। এই গ্রাম থেকে দুইশত বিশ বৎসর আগে (১৭৬৭) এক যুবক নিখোঁজ হয়েছিল যাকে তার পরিবার আর কখনো ফিরে পায়নি, গ্রীওটস পদ্ধতিতে এক পুরুষ হতে অন্য পুরুষ পর্যায়ে তার নাম উত্তীর্ণ হওয়াতে সেই যুবকটির বংশের লোকেরা তার নাম কখনো ভুলে যায়নি। প্রায় দুইশত বৎসর পর মার্কিন লেখক এলেক্স হেলি গবেষণার দ্বারা প্রমাণ করেন যে তারই গ্রেট গ্রেট গ্যাণ্ডফাদার ছিলেন সেই হারিয়ে যাওয়া যুবক, যার নাম ছিল কুন্তা কিন্তে এবং জুফরি থেকে অপহরণ করে যাকে ক্রীতদাসরূপে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এলেক্স তাঁর বংশের উৎপত্তি সূত্র উদঘাটন করতে অনেক কষ্ট করে আফ্রিকার একটি ছোট্ট দেশের ক্ষুদ্র এই গ্রামটিতে এসেছিলেন। এখানে এলে তাঁকে এমনভাবে বরণ করা হয়েছিল যেন হারানো কুন্তা কিন্তে ফিরে এসেছে। এলেক্স হেলি আবেগে এতোই অভিভূত হয়ে যান যে অশ্রু সংবরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ পূর্ব পুরুষের করুণ কাহিনী নিয়ে লিখে ফেললেন আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই ‘রুটস’।
‘রুটস’ এর চলচ্চিত্র রূপ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকদেরও দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমার মা টেলিভিশনে কুন্তা কিন্তের শৃঙ্খলিত জীবন দেখে তার প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল হয়েছিলেন। কৃতদাসের জীবন তাঁর চোখ গড়িয়ে পানি নামিয়েছিল। মায়ের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই কুন্তা কিন্তের জীর্ণ কুঠিরে গিয়েছিলাম।
কিন্তের পরিবারে পা রাখা মাত্রই ঘর থেকে নেমে এলেন আমার কাঙ্ক্ষিত মহিলা বিন্তে কুন্তে। বয়স ৭০-৭৫ এর মধ্যে। বৃদ্ধা স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে অভ্যর্থনা জানালেন। পরিষ্কার বোঝা গেল কোন পর্যটক বা বিদেশী এলে তিনি খুশী হন। খুশী হবার প্রকৃত কারণ অবশ্য পরে অনুধাবন করলাম। মিনিট দশেক তার সাথে কথা বলে ও কয়েকটি ফটো তুলে যখন বিদায়ের পালা এলো মনে মনে ভাবলাম যে তাকে বাংলাদেশের কোন একটি স্মৃতিচিহ্ন দিতে পারলে মন্দ হয় না। কেননা সে অনেকের স্মৃতিচিহ্ন রেখে দিয়েছে। মানিব্যাগ খুলে বাংলাদেশের একমাত্র চিহ্ন কাগজের এক টাকার একটি নোট তাকে দিলাম। উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র স্মৃতিচিহ্ন। এছাড়া দেবার মত দেশীয় কিছু ছিল না। টাকাটা অনেক আগ্রহ নিয়ে মহিলা পরখ করছিলেন। আমি তাকে বুঝালাম এটা শুধু আমার মায়ের চিহ্ন, শুভেচ্ছার প্রতীক এবং এর বাজারদর এখানে কিছুই নেই। আচমকা ভদ্রমহিলার চেহারায় একটি পরিবর্তন এলো। এতটা নির্দয় পর্যটক হবো এটা বোধহয় তিনি আশা করেননি। হয়তো বৃথা সময় নষ্ট করা হলো! কুন্তা কিন্তের পরিবারের জীবিত বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার মুখে থেকে হাসি কেড়ে নিলাম এটা ভেবে নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হচ্ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করে সে হাসি আর ফিরে পেলাম না বরং যেটা আবিষ্কার করলাম তা হলো সেই বিখ্যাত পঙক্তি ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। অনুধাবন করলাম যাকে দেখে খুশী হতে এলাম তাকেও খুশী রাখা উচিৎ। সামান্য কিছু স্থানীয় মুদ্রা (ডালাসি) দিয়ে বললাম আপনার জন্য কিছু আনতে পারিনি এগুলো দিয়ে ফলমূল কিনে খাবেন। ধীরে ধীরে কবিতার লাইনগুলো উধাও হয়ে পূর্ববৎ হাসিমাখা মুখে ঝলসে উঠলো। আমিও শান্তি পেলাম।
কুন্তা কিন্তের পরিবার আজ ক্রীতদাসের শৃঙ্খলে বন্দী নয় তবে যা বন্দী করে রেখেছে তাহলো অভাব আর ক্ষুধা। যার প্রকৃত রূপ দাস প্রথার মতই করুণ। এক সময় চাবুকের আঘাতে যাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরত এখন ক্ষুধার আঘাতে তাদের হাত থেকে উপহার পড়ে যেতে চায়। পিঠের জ্বালা পেটের উপর ভর করে আছে। এই অভাব আর ক্ষুধার সংসারে আমার স্মৃতি চিহ্ন কতদিন টিকে থাকবে জানি না তবে স্মৃতি সম্ভার সমৃদ্ধ হলো যে অভিজ্ঞতায় তাহলো কবির ভাষা সাগর মরুভূমি, মহাদেশ মহাকাল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। দূরদেশে এসে আবারো দেখলাম ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’।
স্কারবোরো, কানাডা

