
কানাডার টরন্টো শহরে চলমান তীব্র শীত ও রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তবে অন্ধ ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও বেশি বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক। এমনই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন টরন্টোর বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী ডেভিড লেপোফস্কি।
শীতের শুরুতে হিমশীতল আবহাওয়ার মধ্যেও চলাচলের জন্য লেপোফস্কি একটি নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করতেন যত দ্রুত সম্ভব গন্তব্যে পৌঁছাতে হাঁটা। তাঁর মতে, এতে শরীর গরম থাকে এবং ঠান্ডার প্রভাব কিছুটা কম লাগে। কিন্তু চলতি শীতে সেই কৌশলই হয়ে উঠেছে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
লেপোফস্কি বলেন, “এ বছরের শীত শুধু তীব্রই নয়, দীর্ঘস্থায়ী। তার ওপর রোববার রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছে। এত বেশি তুষার পরিষ্কার করতে শহরের কর্তৃপক্ষের কয়েকদিন তো লাগবেই।” তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত হাঁটা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করাও প্রায় অসম্ভব।
৬৮ বছর বয়সী লেপোফস্কি নিজেও একজন অন্ধ ব্যক্তি। তিনি জানান, রাস্তা ও ফুটপাত যখন বরফ ও পুরু তুষারের স্তরে ঢাকা থাকে, তখন দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য হাঁটা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। “কোথায় বরফ জমে উঁচু হয়ে আছে বা কোথায় হঠাৎ পা পিছলে যেতে পারে তা বোঝার কোনো উপায় থাকে না,” বলেন তিনি।
তিনি স্বীকার করেন, ৫০ সেন্টিমিটারেরও বেশি পুরু তুষার পরিষ্কার করা যেকোনো বড় শহরের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তাঁর প্রশ্ন, এই পরিষ্কারের পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? লেপোফস্কির মতে, তাঁর মতো মানুষের কথা মাথায় রেখে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী প্রায়ই তাঁকে কাছের কোনো গ্রোসারি স্টোর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনতে বলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে হচ্ছে। “রুটের কিছু অংশে শাবল চালানো হলেও, একটু এগোলেই সামনে পড়ে যায় তুষারের পাহাড়। তখন আর এগোনোর উপায় থাকে না। ভাঙা কোমর নিয়ে কেউই তো শেষ জীবন কাটাতে চায় না,” বলেন তিনি।
ডেভিড লেপোফস্কি খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেন এবং অন্টারিওর একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী অধিকার বিষয়ে পাঠদান করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অ্যাকসেসিবিলিটি অব অন্টারিয়ান্স উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যাক্ট কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।
বর্তমানে তিনি অ্যাকসেসিবিলিটি অব অন্টারিয়ান্স উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যাক্ট অ্যালায়েন্সের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই অ্যালায়েন্স মূলত প্রবেশগম্যতা ও প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের একটি জোট। পাশাপাশি তিনি প্রতিবন্ধীদের অধিকার বিষয়ক একটি পডকাস্টও সঞ্চালনা করছেন।
লেপোফস্কির বক্তব্য স্পষ্ট শহরের তুষার পরিষ্কারের কাজ শুধু যান চলাচলের সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ফুটপাত, ক্রসিং ও নিত্যপ্রয়োজনীয় স্থানে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক মানুষেরা কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়বেন। এই শীত যেন সেই কঠিন বাস্তবতাই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

