
কয়েক মাসের অচলাবস্থার পর অবশেষে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লাব্লাঙ্ক জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটকিন–এর সঙ্গে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং উভয় পক্ষই পারস্পরিক সমাধানের পথে এগোচ্ছে।
লাব্লাঙ্কের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, দুই মন্ত্রীর মধ্যে প্রায় ৯০ মিনিটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব ও পণ্য নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা হয়। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, অটোমোবাইল এবং কপার খাত যেগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে।
মন্ত্রী লাব্লাঙ্ক বলেন, “আমরা এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছি যেখানে উভয় দেশই বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজছে। আমাদের লক্ষ্য হলো বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা এবং অযথা চাপ কমানো।”
বাণিজ্য আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত কার্স্টেন হিলম্যান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়েসন গ্রি–এর মধ্যে আরও প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। হিলম্যান একই সঙ্গে কানাডার প্রধান আলোচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
কানাডার কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই পর্যায়ের বৈঠকগুলোই চূড়ান্ত সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করবে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত ২২ আগস্ট কিছু প্রতিশোধমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই আলোচনায় গতি আসে। এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধের অন্যতম ইস্যু ছিল কানাডার পাল্টা শুল্ক আরোপ। ২০২৪ সালের মার্চে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ শতাংশ ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম শুল্ক আরোপ করলে কানাডা তার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কমলা, অ্যালকোহল, মোটরসাইকেলসহ বিপুল পরিমাণ আমেরিকান পণ্যের ওপর সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করে। এতে করে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন চরমে পৌঁছায়।
১ আগস্ট থেকে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে, যার কারণ হিসেবে হোয়াইট হাউস ফেন্টানাইলের প্রবাহ এবং কানাডার প্রতিশোধমূলক শুল্ক–কে দায়ী করেছে। তবে কানাডা–ইউ.এস.–মেক্সিকো বাণিজ্য চুক্তি (CUSMA)–এর আওতাধীন পণ্যগুলো এই নতুন শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার আড়ালে বাণিজ্য চাপে প্রতিপক্ষকে নত করার প্রচেষ্টা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে আলোচনায় যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো শিগগিরই একটি সমঝোতা স্মারক বা আংশিক বাণিজ্য চুক্তি–তে রূপ নিতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অস্থির নীতি এবং ২০২5 সালের মার্কিন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, কানাডা সরকার অভ্যন্তরীণ শিল্পক্ষেত্রে চাপ কমাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই সাম্প্রতিক অগ্রগতি উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই অগ্রগতি কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর।

