-14.8 C
Toronto
শুক্রবার, জানুয়ারী ২৮, ২০২২

বিজয়ের কথা

- Advertisement -

তাসরীনা শিখা

ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস। আমাদের গৌরব ও অহংকারের মাস। আমাদের এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে কত কাহিনী, কত আত্মদান, কত বেদনা, দুঃখ কষ্ট, কত স্বজন হারানোর ব্যাথা- সব কিছুর বিনিময়ে আমাদের এই বিজয় অর্জন।

কমলা দিদি আমাদের অত্যন্ত একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন। খুব কম দিনই ছিল যে কমলা’দির সাথে আমাদের দেখা হতো না। কমলা’দি একদিকে যেমন ছিলেন আমাদের বোনের মতো অন্য দিকে ছিলেন আমাদের বন্ধু। দীর্ঘ কেশধারি মিষ্টি চেহেরার কমলা’দি খুব ভালো গান করতেন। কমলা’দি এলে মা মাঝে মাঝে বলতেন কমলা একটা গান ধরতো মা। কমলা’দি কখনো মায়ের আবদার উপেক্ষা করতেন না। একটু গলা ঝেড়ে গান গেয়ে শুনাতেন মাকে। এভাবেই কমলা’দির আদর স্নেহে আমাদের দিন ভালই কাটছিল । ১৯৭১ এর মার্চের প্রথম দিককার কথা। জ্যোৎস্না রাত। জ্যোৎস্নার আলোতে আমাদের বাড়ির আঙ্গিনা মিষ্টি আলোতে ভরে গিয়েছিলো। মায়ের আমন্ত্রণে কমলা’দি এসেছিলেন আমাদের গান শোনাতে । জ্যোৎস্নার আলোতে ভরপুর বারান্দাতে বসে কমলা’দি একের পর এক গান শোনালেন আমাদের। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম কমলা’দির গান। তারপরে এসে গেলো ২৫শে মার্চের কাল রাত্রি। আমরা সবাই যে যার মতো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে চলে গেলাম। কেউ কারো খোঁজ খবর নিতে পারলো না। কয়েক মাস পরে যখন আমরা আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম , এসেই মা খোঁজ করলেন কমলা’দিদের। খালি বাড়ি, কেউ নেই বাড়ীতে। কমলা’দি বাবা এই কয়েক মাসে ২০ বছর বেড়ে যাওয়া চেহারা ও শরীর নিয়ে বাড়ি আগলে অন্ধকার বাড়ীতে বসে ছিলেন। মা যা জানতে পেরেছিলেন কমলা’দির বাবা সাথে কথা বলে , পাক সেনারা আক্রমণ কেরেছিল তাদের বাড়ি সারা বাড়ি তছনছ করে খুঁজলো কমলা’দির ভাইকে। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার বাবাকে প্রচণ্ড মারধোর করে কমলা’দিকে ধরে নিয়ে চলে গেলো । যাবার সময় বলে গেলো কমলা’দিকে কিছু জিজ্ঞাসা বাদ করে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাবে কিন্তু কমলা’দি আর ফিরে এলো না। কমলা’দির বাবা বাড়ীর সবাইকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়ে বাড়ি আগলে বসে আছেন কমলা’দি ফেরার আশায়। কমলা’দির কোন খোঁজ তিনি আর পেলেন না।

- Advertisement -

তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কমলা’দি নাকি ফিরে এসেছিলেন । কিন্তু আমরা কমলা’দিকে দেখার সুযোগ এবং অনুমতি কিছুই পাইনি। কমলা’দি বাড়ীর গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা মানুষের কুৎসিত আগ্রহ বন্ধ করার জন্য এবং কমলা’দিকে নিয়ে পরদিনই ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আর কোন দিন ফিরে আসেননি। আমার মা দেখা করতে পেরেছিলেন কমলা’দির সাথে।
আমার মাকে অনেক দিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলতে শুনেছি, আহারে কি মেয়েকে কি করে দিলো জানোয়ার গুলো । শরীরটাতে হাড় চামড়া ছাড়াতো কিছুই নেই। চুল গুলো কেমন কুচিকুচি করে ছেঁটে দিয়েছে। বলে মা আঁচলে চোখ মুছতেন।

প্রতি বিজয় দিবসে কমলা’দিকে বিশেষ ভাবে মনে পরে, নিজের মনে বলি কমলা’দি তুমি কেমন আছো? কোথায় আছো? তোমার কি বিয়ে হয়েছিলো কমলা’দি? তুমি সংসারী হতে পেরেছিলে? তোমার ছেলে মেয়ে আছে কমলা’দি? তুমি কি ভুলতে পেরেছিলে তোমার বিভৎস অতীতকে ? কমলা’দি একবার শুধু একবার তোমার সাথে দেখা হতো যদি আমার সাথে তাহলে আমার জীবনটা ধন্য হয়ে যেতো। কমলা’দি তুমি কোথায় আছ আমি জানি না। যেখানেই থাকো না কেনো তুমি অনেক ভালো থাকো দিদি।
এমন বহু কমলা’দি, শেফালী, আনোয়ারা আরো বহুজনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা। “ এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতাটা আনলো যারা আমরা তোমাদের ভুলবো না”। প্রতিটি বিজয় দিবসে আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশীদের সেটাই শপথ।
ম্যাল্টন, অন্টারিও

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles