
দোস্ত, কিছু টাকা ধার দিতে পারবি?
– তুই চাইছিস আর আমি দেই নাই; এরকম কখনো হইছে?
– অনেক টাকা যে?
– কতো?
– হাজার তিরিশ..
– এতো টাকা কী করবি!
– ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার, হটডগের ফুড ট্রাক কিনবো। রাস্তায় রাস্তায় ফাস্ট ফুড বেচবো
– টরন্টো না অটোয়ায়?
– টরন্টো
– তাইলে আমি নাই। লালবাতি জ্বালাবি। বাঙালি দেখলে তোর হুঁশ থাকে না। ফ্রি দিবি, বাকিতে দিবি। যে হাবাগোবা আর সহজ সরল তুই; কাউকে না বলতে পারিস না
– এইবার শক্ত হবো
– আমি অবশ্য ইদানিং ভাবি তোকে নিয়ে। তোর একটা কিছু করা দরকার। এইভাবে ফকিরের মতো আর কতো দিন? তোর কানাডা আসা চৌদ্দ বছর হইছে না?
– হু
– মানুষ পাঁচ বছরের মধ্যে গাড়ি বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স করে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট তোর থেকে কতদিনের ছোট যেন?
– পাঁচ মাসের
– তোর লজ্জা করে না? ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তাই নাই? এই দেশে ওল্ড হোমে ছোট্ট একটা খুপরির মাসিক খরচ খাওয়া দাওয়া বাবদ কতো আন্দাজ আছে?
– দুই হাজার?
– সবচেয়ে খারাপটাও তিন হাজার থেকে শুরু। তোর সেই রাজশাহীর এম-আর স্টুডেন্ট ভিলেজ মেসের থেকেও ছোট রুম। ছয় সাত হাজার লাগে ভালোগুলায়। এতো টাকা কোই পাবি? তাও আবার সকালে দিবে পাউরুটি জেলি, দুপুরে হটডগ/বার্গার, সুপ আর রাতে পাস্তা/পিজা
– ভাত?
– শ্বশুর বাড়ি পাইছিস? রুমে কিচ্ছু রান্না করতে দিবে না। তারপর একদিন বুড়া হয়ে মরে পচে থাকবি রুমের মধ্যে। লোকজন করিডরে হাঁটার সময় লাশের গন্ধ আর মাছির ভনভনানি শুনে পুলিশকে ফোন দিবে। পুলিশ এসে পাবে দরজার চিপায় মরে থাকা শুকনা টিকটিকির মতো লাশ..
.
ইয়া মাবুদ!
আমি সত্যি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। মানুষ মরার আগে শেষ বয়সে ভাল-মন্দ এটা-সেটা খেতে চায়। বাঙালির হয়ে কীভাবে বাঁচবো ভাত ছাড়া? পাউরুটি জেলি প্রতিদিন দিলে আমি শেষ। ভাতভাজি রুটি ছাড়া সকাল? ইম্পসিবল! কানাডায় আসাটাই বিরাট ভুল হইছে। বিজনেস যেভাবেই হোক দাঁড় করাতে হবে। আর কোনো দিকে তাকাবো না!
রিপন, টেনশন নিস না। ব্যাবস্থা হবে ইনশাআল্লাহ। আচ্ছা, তুই না হয় ছয়/সাত মাস ওই বিজনেস করলি। কিন্তু ঠান্ডার বাকি পাঁচ-ছয় মাস?
– ফটোকপির দোকান দিবো
– নজর বড় কর বেটা উল্লুক! মনে রাখবি টেসলা একসময় লস প্রজেক্ট ছিল। আর এখন? টাকা আমি দিচ্ছি, কিন্তু তুই মান্থলি কিস্তি দিবি সরাসরি ব্যাংক এ। তোর টাকার ভার আমি নিবো না
– রাজি
– আর তুই জি ড্রাইভার লাইসেন্স পরীক্ষা এবার সিরিয়াসলি দিয়ে ফেল। জি ছাড়া তোকে ফুড ট্রাক চালানোর পার্মিশন আদৌও দিবে কিনা আমার সন্দেহ..
– আজকেই রেজিস্ট্রেশন করবো
– এ নিয়ে তোর কততম পরীক্ষা হবে?
– সাতেরো
– লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা..
.
আমি স্বপ্ন দেখা শুরু করি; সারা কানাডায় আমার ফুড ট্রাকের বিজনেস ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মোড়ে মোড়ে হাজার হাজার ট্রাক। মিলিওনার থেকে বিলিওনিয়ার হতে যাচ্ছি..
.
নরওয়েজীয়ান বন্ধু হাবিবের ফোন- ও কাহা কী করো?
– দোস্ত, বিজনেস শুরু করতেছি ইনশাআল্লাহ!
– কিসির গো কাহা?
তাকে যাবতীয় বিস্তারিত বলতে থাকি। সে মন দিয়ে শুনে বলল- শুনো কাহা, তুমার আইডিয়া ঠিক আছে। কিন্তু এমুন ব্যাবসা করবা, জিডা আগি কেও করেনি
– যেমন?
– সান্ডার ধরো। সৌদি থিকি সান্দার আন্ডা আইনি বাচ্চা ফুটাও। শুধু এক্ষেন সার্কুলার দাও, উডার মাংশ খালি পারে মরা মানুষও জ্যাতা হয়া দাঁড়ায়ে উটপি। দেকপা বাঙালি হুড়মুড় কইরি কেনছে; বাঙালি ভাবীরা ইয়া বড় পেট নিয়ি ঘোরছে ড্যানফোর্থে। যে পাওয়ার সান্ডার গোস্তের! তুমি তো আর আমার কতা শুনবা নানে, শুধু চিশতীর কথা শুনবা। চিশতীর কতা তুমার কাছ বেদবাক্য
– তোর কথা শুনবো
– তুমি না জুওলজিস্ট, লিপিস্টিক পার্টি!
– হ
– তুমি পারবা কাহা.. আর সৌদি গেলি পার ঐ হাতেই হজটা সাইরি আসবা
– কিন্তু সান্ডার খোঁজ কেমনে পাবো?
– কোফিলের বাঙালি পিএস এর সাথে যোগাযোগ করো। কোফিলের পোলারে সাথে নিয়ে ফিল্ডে যাও। যতো সান্ডা ধরবা, হাফ ফিরি দিবা। একেকটা সান্ডা দুই তিনশো ডলার! আর সান্ডার বিড়িয়ানি বানায়ে খাওয়াবা, দেকপা তুমি হিরো!
– ওকে
– এই সান্ডার ফার্ম যদি তুমি চালাতি পারো গো কাহা, তুমাক আর রাস্তায় আলু ভাজা বিক্কিরি করতি হবিনানে। সান্ডা এক্সপোর্ট করবা সৌদি, মিডিল ইস্ট, সারা দুনিয়ায়। আর সান্ডার ডিম বিক্কিরি কৈরী তুমি হবা বিলিওনিয়ার গো কাহা..
.
আমি আর চিশতী সৌদি আলখাল্লা পরে, কোফিলের গাট্টাগোট্টা ছেলেকে সাথে নিয়ে সৌদি মরুভুমিতে সান্ডা ধরতে দৌড়াচ্ছি। লাফ দিয়ে সান্ডার লেজ ধরে ফেলছি.. তারপর ঝোপ থেকে ডিম বের করে কৌটায় ভরে জমাচ্ছি কানাডায় আনবার জন্য। ডিম লুকিয়ে আনা কঠিন কিছু না।
হঠাৎ ঝাকাঝাকিতে আমার টনক নড়ে। চোখ মেলে দেখি গিন্নি আমার দিকে বিশ্ময়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে বলছে, চান্দু! তুমি আরবীতে এইসব কী বলতেছো?
তুমি আরবী শিখলা কবে!
অটোয়া, কানাডা

