পাহাড়িস্মৃতিগুচ্ছ

পাহাড়িস্মৃতিগুচ্ছ - the Bengali Times
আমি এডমন্ড হিলারি আর শেরপা তেনজিনের মতো করে হিমালয় দেখিনি উঠিনি এভারেস্টে

আমি এডমন্ড হিলারি আর শেরপা তেনজিনের মতো করে হিমালয় দেখিনি,  উঠিনি এভারেস্টে। এমন কি জন্মজেলায় গারো-পাহাড়েও যাওয়া হয়নি। তবু পর্বতারোহীদের মতো যৎসামান্য পাহাড়ি অভিজ্ঞতা আছে। আছে পাহাড় নিয়ে একাধিক কবিতা বা কবিতার অংশ, বিষয়। পাহাড় সংখ্যা লেখার আগে আমারদেখা পাহাড়্গুলোর কথা ভাবলাম। যুক্তরাজ্যে, যুক্তরাষ্ট্রে এবং কানাডায় ছোটবড় পাহাড়ে উঠেছি, থেকেছি এবং ঘুরেছি। আজ সেই পাহাড়িস্মৃতির তিনটি অভিজ্ঞতা উপস্থাপন।

ক]

- Advertisement -

পাহাড় আমাকে সেভাবে টানে না; প্রাকৃতিক অন্যান্য সৌন্দর্য যেভাবে আকর্ষণ করে না। তবে পাহাড়িদের জীবন-যাপনের প্রতি আমার এক অদ্ভুত আত্মীয়তা আছে। কবিবন্ধু অরুণ কুমারের সেই কাব্যসঙ্গীত:

‘লালপাহাড়ির দেশে যা,

রাঙামাটির দেশে যাহেথাকে তুকে মানাইছে না

রেইক্কেবারে মানাইছে না রে…’

এতে লাল পাহাড়, রাঙামাটি এবং নিজেকে সমাজে না খাপ-খাওয়ানোর বিষয় তিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

আমি বিদেশি পাহাড়ে উঠেছি। পর্বত পাড় হয়েছি। গুহায় থেকেছি। ইংল্যান্ডের লিটসে থাকতেন আমার প্রিয় বোন সেলিমা সালেহওরফে মম। কিন্তু আমরা তাঁকে ‘ছপ্পু’ বলে ডাকি। তিনি সব দিক দিয়েই খুবই সৌখিন। ছপ্পুরবাসস্থানগুলোও ছিলো অদ্ভুত। হয়তো পাহাড়ে, নয়তো অজগ্রামে অথবা কোনো জলাশয়ের ধারে। আমি তিনটি বাড়িতেই গেয়েছি। তিন রকমের পরিবেশ।

আমি তাঁর পাহাড়ের বাড়ির কথাইবলি। ২০০৪ সালে সাতদিন লিটসের Todmorden-তে এক ছোটখাটো পর্বতের চূড়োয় দু’তলার একটিবাড়ি। উপরে চারটি রুম। আর নিচ তলায় আরো দুটি রুম। চার পাড়ে বিদেশে গাছপালা। আশেপাশেওবেশ ক’টা বাড়ি। কিন্তু উঠার পথ ভিন্ন ভিন্ন। ছপ্পুর বাসায় প্যাচানো পাহাড়ি সিঁড়ি ছিলো ৩৮টি। ঘরে ঢুকতে আরো দুই কদম, দুই সিঁড়ি! এক বার উপরে উঠলে আর নিচে নামতে চাইতাম নাবা নামলে আর সহজে উপরে উঠতে চাইতাম না।

আমি ছিলাম নিচের গুহার ভেতরদুটি ঘরের একটিতে। এই গুহাঘর তৈরি করা হয়েছে পাহাড়-পর্বতের পাথর-মাটি কেটে। পেছনে এবংদুই দিকে অন্ধকার। অনেকটা বাংলাদেশে মাটির তৈরি ঘরের কাছাকাছি মনে হতো। সামনে অবশ্যছোট ছোট দুটি খিড়কি ছিলো। সেখান থেকে অনেক নিচে মানুষের চলাচল আর রেলগাড়ি যাতায়াত দেখা যেতো।

মনে হয় দিন সাতেক সেই গুহাবাসকরেছি। রাতে গা ছমছম করতো। ভূত-পেত্নির কথা ভাবতাম। আর বার বার অকারণেই মনে পড়তো- সেইবিশ্বখ্যাত হেরা গুহার কথা। যেখানে ফেরেশতা জিব্রাইল কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সর্ব প্রথমবাণী নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আমি একটা কবিতার অহিও পাইনি!

আমি সেখানে থাকা সময়েই ছাড়া বাসাটি ছেড়ে গ্রামের মতো জায়গায় আরেকটি বাড়িভাড়া নেন। বাসা বদলের কারণে উপর থেকে যাবতীয় মালামাল নামাতে গিয়ে আমরা সবাই কাহিল হয়েপড়ি! সারা শরীরে ব্যাথা আর ব্যাথা! বাথটবে লবন আর গরম পানি দিয়ে থ্যারাপি দিয়েছিলাম,তা-ও মনে পড়ছে!সেই বাড়ির পায়খানার দরজারছিটকিনি ছিলো না! আজব এক কান্ড! কিন্তু মাটির মায়ায় পরিবেশটা ছিলো শান্ত এবং শান্তির নীড়!

আমাদের বাংলাদেশে দুটি গুহা আছে। একটি- খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আলুটিলা গুহা আরেকটি সিলেট অঞ্চলেরপ্রাচীন সুড়ঙ্গ হারং-হুরং। গুহা দুটি নিয়ে প্রচলিত লোক কাহিনী আছে।

ছপ্পু আমাকে ভয় দেখানোর জন্যপরে বলেছেন, ঐ বাসায় বহু বছর আগে হ্যালুইনের বংশধরেরা বসবাস করতো।

খ]

কানাডার কুইবেক তথা কেবেক সিটির বিউপ্রে শহরে স্বপরিবারে অবকাশে যাই ২০১৬-তে। শহরে ঢুকতেই যেন ঐতিহাসিক সেন্ট জিন গেট আমাদের স্বাগত জানালো।

সেন্ট লরেন্স এবং সেন্ট-চার্লস দুই নদীর মোহনায় মনোরম পরিবেশে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আর পাহাড়-পর্বত মিলিয়ে একটি পুরনো শহর, মনে হলো যেন ইউরোপীয় অনুভূতি!

এই শহরেই প্রায় হাজার মিটার উচ্চতার পাহাড় Mont-Sainte-Anne,  পর্বতটি লরেন্টিয়ান পর্বত শৃঙ্খলের একটি অংশ। এখানেই UCI মাউন্টেন বাইক বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়াও শীতকালে স্নোশুয়িং, কুকুর স্লেডিং, প্যারাগ্লাইডিং, স্লেই রাইড, আইস স্কেটিং, টিউবিং, স্নোমোবিলিং, স্পা, স্নোবোর্ডিং, স্কিইং আর গ্রীষ্মকালে জাকজমক ভাবে ক্যাম্পগ্রাউন্ড, প্যারাগ্লাইডিং, হাইকিং, গল্ফ, মাউন্টেন বাইকিং-এর আসর জমে উঠে।

পর্বতটির পাদদেশে ১০০ নম্বরের কটেজটি ভাড়া করি। আমরা দুই পরিবারে ছিলাম ছয় জন। দুই মেয়ে অর্জিতা, অনাদি, অপি আর আমি, এবং স্বপন-লিটিল। নিজেরাই রান্নাবান্না করে পিকনিক-পিকনিক আনন্দঘন সময় কাটতে থাকে আমাদের।

সকালে ব্রেকফার্স্ট সেরে বেরিয়ে পড়ি ঐতিহাসিক ফরাসি আর গ্রেট ব্রিটেন রাজ্যের স্মৃতিচিহ্ন স্থলে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে,  দূর্গে,  দ্বীপে, দূরে লং-ড্রাইভে, মার্কেটে, গ্রামেও। লাঞ্চ বাইরের রেস্টুরেন্টে বা খোলা আকাশের নিচে আর রাতে বাসায় এসে ডিনার, ড্রিং, ম্যারাথন আড্ডা।

এক বিকেলে আমরা আমাদের কটেজের নিচে হাটাহাটি করছি। হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের পদদেশে যাই। দেখি- ক্যাবল কার দিয়ে পর্যটক উপরে উঠছে, নামছে। হাইকিং করার জন্য ট্রেকার্সরা ব্যাগ, লাঠি, পানি, হালকা খাবার, দড়ি ইত্যাদি দরকারি জিনিস নিয়ে পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে।

স্বপন, লিটল (হুমায়ূন আহমদের যাকে অনুবাদ করে ‘ক্ষুদ্র’ বলে ডাকতেন) আর আমি টিম হর্টন্সের চা হাতে নিয়ে খেতে খেতে পাহাড়ের প্রথম ধাপ উঠলাম।  ঘুরতে ঘুরতে আরো এক ধাপ উপরে উঠি। আমাদের মাথার উপর দিয়ে তার বেয়ে ক্যাবল কার নামছে, উঠছে। পাহাড়ের স্তরে স্তরে বসার ব্যবস্থা আছে। আমরা বসে বিশ্রাম নিই। কোথাও গাছের সাথে ঝুলানো দোলনা। দোলনায় বসে দোল খাই। পাশের পথ দিয়ে দু’একজন সরু পথে উপরে যাচ্ছে, নামছে। একটু সামনে গেলেই দেখি- একটি ছোট্ট ঝরনায় জল পড়ছে। সেটা লাফ দিয়ে পাড় হওয়া যায়। মাটিকাটা সিঁড়ি বেয়ে আবার পেয়ে যাই একটি গর্ত। গর্তের উপর মরা গাছে কাঠের সেঁতু। আমরা সেটা পেরিয়ে আরো একধাপ উপরে উঠি। একটু ক্লান্ত অনুভব করি। ক্লান্তি দূর করার জন্য ঝুলে থাকা মাটির কাছাকাছি গাছের ডালে বসে বিশ্রাম নেই। অনেকটা বেঞ্চির মতো।

এবার লিটল নিচে নামার জন্য তাড়া দিলো আর স্বপন উপরে উঠার জন্য ইচ্ছে প্রকাশ করলো। তাদের দু’জনের পায়ে ক্র্যাম্পন না থাকলেও বেশ মজবুত কেটস ছিলো। আমার পরনে ঘরে পরা একটা কালো টিশার্ট, চেকচেক ট্রাওজার এবং পায়ে একজোড়া কালো পুরনো স্যান্ডেল। যা পায়ে দিয়ে পর্বতারোহী হওয়া বিপজ্জনক এবং ঝুঁকিপূর্ণ!

ইউকিপিডিয়া ভাষ্য- ‘পর্বতারোহণ একধরনের খেলা, শখ বা পেশা।… এটি ধীরে ধীরে একটি দুঃসাহসিক খেলা হিসেবে বিকাশ লাভ করে। তিন ধরনের পর্বতারোহণ রয়েছে: রক-ক্রাফট, স্নো ক্র্যাফট এবং স্কিয়িং। এগুলো নির্ভর করে পর্বতের পৃষ্ঠের উপর। পর্বতারোহণের জন্য অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং কারিগরী এবং সতর্কতামূলক জ্ঞান প্রয়োজন।‘

কিন্তু আমাদের কারো কিছুই ছিলো না; হঠাৎ কৌতুহল আর সাহস বেড়ে যায়। কারণ, আমরা সমতল থেকে প্রায় এক তৃতীয়াংশ উঠে এসেছি। আমি স্বপনের পক্ষে সায় দিয়ে মনে মনে একটু প্রস্তুতি নিলাম। প্রস্তুতি মানে দু’টো শক্ত মরা ডাল কুড়িয়ে নিলাম। সেটাই একমাত্র সম্বল।

৮০৩ মিটার উঁচু Mont-Sainte-Anne-এ আস্তে ধীরে উঠতে সময় লাগলো পৌণে তিন ঘন্টা। উঁচু-নিচু, আঁকা-বাঁকা, এবড়ো-থেবড়ো, পাহাড়ি মাটির পথ বেয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে এক সময় চূড়ায় উঠেলাম। কিন্তু আমাদের হাতে বাংলাদেশ এবং কানাডা কোনো দেশের পতাকাই ছিলো না। থাকলে নিশ্চয় দুই আঙ্গুলে V দেখিয়ে বিজয়ের হাসিমার্কা ছবি তুলতাম!

পর্বতের শেখর থেকে দেখা নিচে সেন্ট লরেন্স নদী, ঘরবাড়ি, ছোট ছোট পাহাড়, প্রকৃতি দেখা  সে এক অন্য রকম অনুভূতি। শীতকাল হলে স্নো আর বরফের দৃশ্য দেখা যেতো আর ফলঋতু হলে লাল-হলুদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাতো।

যাহোক। পর্বতের চূড়ার বেশ কিছু জায়গা জুড়ে পার্কের মতো। পর্যটকদের জন্য বসার জায়গা, রেস্টুরেন্ট এবং ক্যাবল কার স্টেশন। আমরা বেশ ক্লান্ত। পা অসাড় হয়ে আসছিলো। রেস্টুরেন্টে চা-কফি-জুস খেয়ে নামার সময় হেঁটে নয়; ক্যাবল কারে বিনা পয়সায় নেমে এলাম। বিনা পয়সার কারণ, ক্যাবল কারে উঠানামার টিকিট এক সাথে করতে হয়। নিচ থেকে। উপর থেকে নামার ওয়ান ওয়ে টিকিট নেই। এই এডভেঞ্চার অভিযান এক বিরল অভিজ্ঞতা!

পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই অতি সাধারণ ভাবে ২,৬২৫ ফুট উঁচুর পর্বতারোহী হিসেবে নিজেই নিজে ‘ধন্যবাদ’ দিলাম।

গ]

পাহাড়ের সাথে অনেক ধর্মবিশ্বাসজড়িত। মুসলিন-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধসহ অন্যান্য আদিবাসীদের ধর্মীয় কাহিনীর সাথে পাহাড়েরঘটনা সম্পৃক্ত। যা ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্রতম ভূমি তথা তীর্থস্থান। আবার অনেক রহস্যময়পাহাড় আছে। আছে- বিস্ময়কর পাহাড়। এই পাহাড়্গুলো আমার দেখা ইচ্ছে প্রবল।

যেমন- সৌদি আরবে ওয়াদি আলজিন পাহাড়। যা জিনের পাহাড় বলেই খ্যাত। চলমান সব কিছু ঢালুর বিপরীত দিকে অর্থাৎ উপরেরদিকে গড়ায়। সাধারণত, সব কিছু ঢালুর দিকে গড়িয়ে গেলেও কেবল এই পাহাড়টির সাথেই ঘটেছে এমন অদ্ভুত কাণ্ড। পুরো ব্যাপারটিই সাধারণ নিয়মের ঠিক উল্টোটা ঘটে চলে এখানে। হয়তো,জায়গাটিতে প্রচুর চুম্বকজাতীয় পদার্থ আছে তাই এমনটি হয়। ফলে বিজ্ঞান হয়ে গেছে ভৌতিক।

শ্রীলঙ্কায় আছে আদম পাহাড়। কথিত আছে- এখানেই স্বর্গচ্যুত আদম পৃথিবীতে পদার্পণ করেন। আর বিই হাওয়া পৃথিবীতে অবতরন করেন  জেদ্দায় মারওয়া পাহাড়ে।

অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে আইয়ারস রক। যাকে ম্যাজিক পাহাড়ও বলে থাকেন। পাহাড়টির স্বাভাবিক রং লাল তবে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্তের সময় ঘটে অদ্ভুত যত ঘটনা। সকালে সুর্যের আলোর বিচ্ছুরণ পাহাড়ের উপর পড়লেই মনে হয় যেন আগুন ধরেছে এর গায়ে। সারাদিনই চলে রঙ বদলেরখেলা। বেগুনী ও গাঢ় লাল রংয়ের শিখা বের হয়ে আসে পাহাড়ের শরীর থেকে।

চীন রেয়েছে রংধনু পর্বতমালাঅর্থাৎ পুরো পাহাড় জুড়ে ছড়িয়ে থেকে রঙ্গের আগুন। যেন রংবেরঙের কার্পেট বিছিয়ে রাখাপাহাড়টি নাম ঝানগিয়া ড্যাংশিয়া।

চীন রয়েছে আরেকটি মজার সড়ক।সাত মাইল দীর্ঘ এই পাহাড়ি পথে ৯৯টি বাঁক রয়েছে! প্রতিটি বাঁকই পাহাড়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরেএসেছে! যেতে যেতে চোখে পড়বে বিশাল গুহা। এই গুহার নাম হচ্ছে- ‘স্বর্গের দুয়ার’।

ভয়ংকর পাকিস্তানে রয়েছে ভয়ংকরপাহাড়ি পথ। পাহাড়ের কুল ঘেষে শুন্য ঝুলে থাকা ১০৪ মাইল দীর্ঘ এটি হচ্ছে স্কার্দু রোড। সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে ৪ হাজার ৯০০ ফুট উঁচুতে সিন্ধু নদীর পাশে জিলজিতের কারাকোরাম হাইওয়েতে সড়কটি। এই পথের গন্তব্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ৩০৩ ফুট ওপরে। যা একই সাথে দর্শনীয়এবং ভয়ংকর বিপজ্জনক সড়ক।

ঘ]

উপরের বর্ণিত জিনের পাহাড়, রঙ্গের পাহাড়, পাহাড়ের ঝুলন্ত সড়ক দেখা হলেও বেশ ক’রাত ছিলাম পাহাড়ি এক রাজবাড়িতে। ক্যালোফোর্ণিয়া সান দিয়েগো শহরের একটি ঐতিহাসিক রাজবাড়িতে। একাধিক পাহাড়, ছোটনদী, ঝোঁপ-জঙ্গলের ভেতর এক ইলোরা-অজান্তার গুহার মতো ঘরবাড়ি। ৫০ একরের অধিক এই অদ্ভূতুডেবাড়িটি স্থানীয় হামুল এলাকার খুমিআই আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতার বিশাল রাজবাড়ি। এখনরাজা নেই, রানীও নেই। এই পাহাড়ের মালিক অনুবাদক শিল্পী আনিসুজ জামান এবং ইসাবেলই [De Anda Isabel] এখন রাজারানী!

২০২৪ সালে এই পাহাড়ি বাড়িটি শতবর্ষে পা দিলো। এইছোট্ট রাজবাড়ির ভেতর আরো কয়েকটি ছোট ছোট বাড়িঘর আছে- পাহাড়ে, গাছে, জঙ্গলে। প্রতিবাড়ির বৈশিষ্ট ভিন্ন ভিন্ন।

মদ্যরাত এবং মধ্যরাতের আড্ডা দিয়ে আমরা পাহাড়ি-উৎসব যাপনকরি। সেই সাথে ম্যাক্সিকান খাবার হামুদ, যা অনেকটা আমাদের পাটিসাপটা পিঠার মতো। আরবীজ থেকে উৎপাদিত মাইক্রো গ্রিণ, আঙ্গিনা থেকে তুলে আনা ফুলের ফুল-চা, সাজনাপাতার চা। আর নানা দেশের পানীয়।

এই বাড়িগুলোর মধ্যে একটাস্বপ্নের বাড়ি ট্রি-হাউজ। চারিদিকে পাখপাখালি, প্রাণীদের অভয়ারণ্য। ট্রি-হাউজ তথাবৃক্ষবাড়িতে ছিলেন একজোড়া টোনাটুনি- রাকীব আর মনিকা। সেখানে আমরা কবিতা পাঠের আসর করি।

আদিবাসীদের টং স্ট্যাইলেরছাপড়া বাড়িটি ছিলো আমার জন্য বরাদ্দ।  সামনেছিলো একটি পুরনো ভাঙ্গা আর্মি জিপ। যার ফলে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের একটা ফ্লেভারমনে পড়ে। মনে পড়ে জুলাই ৪, ২০২১ সালে লেখা আমার সেই ‘খাগড়াছড়ি’ কবিতার কথাঃ

ং]

খাগড়াছড়ির শীর্ষ টং-এ পা ঝুলিয়ে দুলিয়ে গান গাইকি গান, জানিনা।.পাহাড়ি উঁচু মাচায় বসে নিচের নির্জন ঝর্ণার জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে—.পার্বত্য জুম চাষের দৃশ্য দেখি-বাংলাদেশ দেখি!.পিপিংটম দৃষ্টিতে বন্দুক তাক করে, রাগ করেবাঁকা পথে সেনাবাহিনীর জলপাই রঙের জিপ টহল দেয়এলকহলিক সন্ধ্যায়।একটু আগে সবার চোখ-চশমা ফাঁকি দিয়েসূর্যগুলো কখন কোথায় কি ভাবে ডুব দিলো;কেউ টের পেল না!.আমাদের গ্রামের পাগলিও এভাবেগাছের ডালে পা ঝুলিয়ে-দুলিয়েকাঠবিড়ালির সাথে পেয়ারা খেতে খেতে হাসতো, কাঁদতোআর বলতো:-ঐ যে আর্মি আইতাছে, আর্মি।.তখন কালুর ঘাট ট্রান্সমিটারের টাওয়ারে নয়; রাউটারেসন্দেহজনের তালিকায়অতি গোপন ভাষায় ভেসে উঠলো একটিসতর্কীয় সংকেত!অথচ আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সাইক্লোন নেই, ভূমিকম্পও না!

……………………………………………………………………………

খাগড়াছড়ির শীর্ষ টং-এ পা ঝুলিয়ে দুলিয়ে গান গাই

কি গান, জানিনা।

.

পাহাড়ি উঁচু মাচায় বসে নিচের নির্জন ঝর্ণার জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে

.

পার্বত্য জুম চাষের দৃশ্য দেখি-

বাংলাদেশ দেখি!

.

পিপিংটম দৃষ্টিতে বন্দুক তাক করে, রাগ করে

বাঁকা পথে সেনাবাহিনীর জলপাই রঙের জিপ টহল দেয়

এলকহলিক সন্ধ্যায়।

একটু আগে সবার চোখ-চশমা ফাঁকি দিয়ে

সূর্যগুলো কখন কোথায় কি ভাবে ডুব দিলো;

কেউ টের পেল না!

.

আমাদের গ্রামের পাগলিও এভাবে

গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে-দুলিয়ে

কাঠবিড়ালির সাথে পেয়ারা খেতে খেতে হাসতো,

কাঁদতো আর বলতো

:-ঐ যে আর্মি আইতাছে, আর্মি। ওরা বর্গী

.

তখন কালুর ঘাট ট্রান্সমিটারের টাওয়ারে নয়; রাউটারে

সন্দেহজনের তালিকায়

অতি গোপন ভাষায় ভেসে উঠলো একটি

সতর্কীয় সংকেত!

অথচ আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সাইক্লোন নেই, ভূমিকম্পও না!

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles