
নভেম্বর ২০২৪-এ কুইবেক প্রদেশের প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো প্রাদেশিক আইনসভায় এক বিস্তৃত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, যা আগামী দশ বছরে প্রদেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও কৌশল নির্ধারণ করবে। প্রিমিয়ারের বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে, কুইবেক আর শুধুমাত্র একটি শিল্পনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি হবে প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতৃত্বদায়ী একটি আধুনিক প্রদেশ।
লেগোর নতুন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি তিনটি: অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং সীমান্ত যোগাযোগ শক্তিশালীকরণ। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা। এর মধ্যে থাকবে সড়ক, সেতু, গণপরিবহন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ। বিশেষভাবে কুইবেক শহর, মন্ট্রিয়েল এবং প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে এই বিনিয়োগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।
অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ প্রসঙ্গে প্রিমিয়ার লেগো জানিয়েছেন, স্থানীয় ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ভর্তুকি এবং কর ছাড় চালু করা হবে। প্রদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (এসএমই) বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করছে। লেগো বলেন, “যদি আমরা এই ব্যবসাগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারি, তবে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্ত হবে।” নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী তিন বছরে প্রায় ১ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার আশা করা হচ্ছে।
কুইবেকের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হলো যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে প্রদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ যায়। নতুন পরিকল্পনায় সীমান্তবর্তী সড়ক, রেল ও বন্দর অবকাঠামো আধুনিকীকরণের জন্য প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এতে শুধু পণ্য পরিবহন নয়, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও বাড়বে। সরকারের আশা, এই পদক্ষেপ আগামী পাঁচ বছরে রপ্তানি আয়ে অন্তত ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করবে।
লেগো শ্রমবাজারকেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন। কুইবেক বর্তমানে অভিবাসন ধরে রাখার ক্ষেত্রে কানাডার অন্যান্য প্রদেশের চেয়ে ভালো করছে। ২০২৩ সালে প্রদেশে আসা নতুন অভিবাসীদের প্রায় ৮০ শতাংশ অন্তত পাঁচ বছর ধরে প্রদেশে স্থায়ীভাবে থেকে গেছে। নতুন পরিকল্পনায় অভিবাসীদের জন্য প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হবে।
তবে সমালোচকরা বলেছেন, যদি দৃষ্টি শুধুমাত্র বড় প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বাস্তবে জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। বিরোধীদলীয় নেতারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং আবাসন খাতে আরও সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অবকাঠামো প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ ঠিকাদারি এবং প্রশাসনিক খরচে নষ্ট হতে পারে।
পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, নতুন রাস্তা ও সেতু নির্মাণের ফলে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেলে কার্বন নিঃসরণও বাড়বে। বর্তমানে কুইবেকের মোট কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৭৭ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে পরিবহন খাত দায়ী প্রায় ৪৩ শতাংশের জন্য। প্রিমিয়ার লেগো আশ্বাস দিয়েছেন যে সব প্রকল্প পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে বাস্তবায়িত হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, লেগোর এই পরিকল্পনা কুইবেককে দীর্ঘমেয়াদে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে। বর্তমানে প্রদেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৪৭০ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৫৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ফ্রাঁসোয়া লেগোর নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কুইবেকের জন্য এক সাহসী ও উচ্চাভিলাষী রূপরেখা। এতে একদিকে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি রয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে। তবে পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করছে বাস্তবায়নের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর কার্যকর প্রভাবের ওপর।

