17.1 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০২৪

‘কর্মক্ষেত্রে কুইন বি হয়ে উঠছেন না তো!’

‘কর্মক্ষেত্রে কুইন বি হয়ে উঠছেন না তো!’
ছবির মডেল মার্শিয়া শাওন ছবি হাসান রাজা

‘অফিসে গিয়ে এক মুহূর্ত মনে হয় শ্বাস নিতে পারি না। আমার এক সহকর্মী ভদ্রমহিলা যেন আমাদের বসকে পরিচালনা করে। মজার ব্যাপার হলো আগের বসও তাঁর খুব কাছের মানুষ ছিলেন; আবার নতুন বসকেও নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরায়। এখন এমন এক অবস্থা করেছে যে এর অনুমতি ছাড়া আমরা কেউ বসের রুমে ঢুকতে পারি না। বিশ্বাস করা যায়? ডিপার্টমেন্টের এমন কেউ নেই যাঁর বিরুদ্ধে সে কথা বলে না, একজনের কথা আরেকজনকে নিজের মত করে লাগায়।’

আমার চেম্বারে কাউন্সেলিং নিতে আসা কর্মজীবী নারীটি এভাবেই বলে গেলেন। খানিকক্ষণ নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ ভদ্রমহিলা আপনার সামনে এমনভাবে আপনাকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলবেন যেন আপনার জন্য তার প্রাণ কাঁদতে কাঁদতে শেষ। অথচ মূল লক্ষ্য হচ্ছে আপনাকে কন্ট্রোল করা। এইজন্য যদি আপনার নামে কুৎসা রটাতে হয় সে কুৎসা রটাবেন, যদি আপনাকে অপদস্থ করতে হয় আপনাকে অপদস্থ করবেন। প্রত্যেকের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখবেন। সেই সম্পর্ক নানান ভাঁজের। ইনিয়ে বিনিয়ে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমন ভাবে তথ্য উপস্থাপন করবেন যেখানে সবাই মনে করবে আপনারই দোষ। বিশেষ করে ডিপার্টমেন্টে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে গুজগুজ ফুসফুস করবে, সমালোচনা করা যেন এর মজ্জাগত। আপনি টেরই পাবেন না কখন দোষী হয়ে গেছেন অপরের চোখে।’

- Advertisement -

তাঁর বর্ণনায় বোঝা গেল, তাঁর সহকর্মী নারীটিযে পরিমাণ অসম্মান এবং অবজ্ঞা তাঁকে করেন, তাতে তাঁর নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়া প্রায় দুর্বিসহ হয়ে উঠছে। চাকরিটা যদি ছেড়ে দিতে পারতেন তবেই যেন রেহাই পেতেন। কিন্তু তার পরিস্থিতি হয়ত চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতোও নয়।

এবার আসা যাক মূল কথায়, যাঁকে নিয়ে অভিযোগ, সেই অভিযুক্ত নারী সম্ভবত ‘কুইন বি সিনড্রোমে ‘ ভুগছেন। ১৯৭৩ সালে ক্যারল অ্যান টাভ্রিস একজন আমেরিকান, সামাজিক মনোবিজ্ঞানী, নারীবাদী; তাঁর দুই সহযোগী সহ সর্বপ্রথম মনস্তত্ত্বে এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। একটি মৌচাকে রানী মৌমাছি যেমন অন্য কোন নারী মৌমাছিকে বেঁচে থাকতে দেয় না, মৌচাকের সম্পূর্ণ অধিকার নিজের উপর নিয়ে নেয়, ঠিক সেরকম কুইন বি তে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে ছাপিয়ে অন্য কাউকে উঠতে দেন না।

কুইন বি কারা
‘কুইন বি’ উপাধি নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাঁরা পুরুষ-শাসিত ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে। এ ধরনের নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিজেদেরকে উপরে প্রতিস্থাপন করেন এবং সাধারণত অন্য নারী কোনভাবেই উপরে উঠুক সেটা সহ্য করতে পারেন না। ব্রিটিশ সাইকোলজি সোসাইটির মতে, যে প্রতিষ্ঠানের অবচেতন সংস্কৃতি– পুরুষ প্রাধান্য নির্ভর, সেসব জায়গায় ‘কুইন বি সিনড্রোমে’ আক্রান্ত, ক্ষমতালোভী শীর্ষ পদে যেতে আগ্রহী নারীদের দেখা যায়। এরা অহংকারী, আত্নকেন্দ্রিক, ম্যানিপুলাটিভ, দুর্বিনীত, অগভীর মানসিকতা সম্পন্ন, সহকর্মীদেরকে ভয় দিয়ে অবদমন করে।

এ ধরনের নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের একটি গ্রুপ তৈরি করেন, সেই গ্রুপে সবাইকে প্রবেশাধিকার দেয় না এবং নিজেকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন উচ্চতর মানুষ হিসেবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে জুনিয়ররা কুইন বি এর আচরণ অবমাননাকর হিসেবে বুঝতে পারলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অসম্যতার কারণে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিন্তু সেটা বুঝতে পারেন না। কর্মকর্তারা অন্ধের মতো তোষামোদকারী কুইন বি এর উপরে আস্থা রাখেন। কিন্তু উর্ধ্বতনদের গদি চলে গেলে কুইন বি তখন তাঁদের বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না। ফলে শীর্ষস্থানীয় পদে যারা অধিষ্ঠিত তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীরা (সবাই নন) যখন ক্ষমতাসীন অবস্থায় পৌঁছাচ্ছেন তখন অধীনস্থ নারী সহকর্মীদের সাথে তারা পুরুষদের তুলনায় অধিক প্রতিকূল এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন। ফলে যিনি কুইন বি তার প্রকৃতপক্ষে অন্যদের সাথে আন্ত সম্পর্কের বন্ধন দুর্বল। যদিও মুখে মুখে সবাই তাকে তোয়াজ করে।

কুইন বি এর আচরণের উদ্দেশ্য কী?
এ ধরনের আচরণের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাঁরা তাদের অধীনস্থ নারী কর্মচারীদের থেকে নিজেদেরকে সামাজিকভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আলাদা প্রমাণ করা। ফলে তাদের মধ্যে যে একটি শক্তিশালী পৌরষ চেতনা আছে অধীনস্ত নারীদের অবদমন করে তারা সেটা প্রমাণ করতে চান অবচেতনভাবে।

শুধু তাই নয় কুইন বি নিজেও কিন্তু সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকেন যে এই বুঝি কেউ তার সাফল্য কেড়ে নিয়ে গেল। ফলে কুইন বি নিজে সব সময় তটস্থ থাকেন, চেষ্টা করেন অন্যদের টেক্কা দিয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে। এর পরিণতি স্বরূপ যদি দলে নতুন কোন নারী সদস্য গ্রুপে যুক্ত হন তবে কুইন বি উঠে পড়ে লাগেন নতুন আগত সদস্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। সদ্য আগত নতুন নারী সদস্যটিকে নিয়ে নানাবিধ গুজব, অপপ্রচার, মিথ্যে কথা বলা কোন কিছুতেই কুইন বি কুন্ঠিত হয় না। ধরা পড়ে গেলে এমন একটা ভাব দেখান যেন, ‘আমি তো বুঝতে পারিনি’, অথবা ‘আমি তো কিছু জানি না।’

লক্ষণ ও উপসর্গ

প্রতিযোগিতাপূর্ণ, হিংসাবিদ্বেষ এবং ঈর্ষা পূর্ণ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেন।
নিজের থেকে অধঃস্থনদের ক্রমশই এক ঘরে করে ফেলেন। এটা শেষ হলে নিজের থেকে উপরের পদমর্যাদার ব্যক্তিদেরও ঠেলতে ঠেলতে কোনায় নিয়ে যান, যাতে তাঁরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কর্তৃপক্ষের কাছে। এরা অধিনস্থদের চাপতে চাপতে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান যেখানে প্রকৃতপক্ষে ভুক্তভোগী তীব্র হতাশ হয়ে মনে করেন হয় চাকরিটা ছেড়ে দেয়াই বুঝি ভালো।

যেকোনো দলগত কাজের কৃতিত্ব বা স্বীকৃতি অন্য কাউকে দেন না।
নিজের পছন্দের মানুষ ছাড়া অন্য কাউকে নিজের দলে ঢুকতে না দেওয়া।
অন্যকে অসম্মান করা। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে কুইন বি তে আক্রান্ত নারীরা অনেক বেশি রূঢ়, অসভ্য, অসম্মানজনক, অবজ্ঞা ও অবমাননামূলক আচরণ প্রদর্শন করে। কারও সম্পর্কে অশ্লীল বাক্য বলতে এদের বিন্দুমাত্র ঠোঁট কাঁপে না।
গোপনে গোপনে দল তৈরি করা, প্রকাশ্যে এক কথা বলা, নীতি নির্ধারণ করা; কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটাকে অস্বীকার করেন।

ক্ষমতাসীনের পদলেহন করেন ও ক্ষমতাহীনকে অবজ্ঞা করেন।

এরা প্রচন্ড বুলি করতে পছন্দ করেন। বুলি করাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন যে ভুক্তভুগী প্রচণ্ড হীনমন্যতায় ভুগবে না হলে সামাজিকভাবে সবার সামনে বদরাগী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিপন্ন হবে। কিন্তু অন্যরা কেউ টের পাবে না যে এই রাগ তৈরি করার পেছনে কুইন বি নিজে দায়ী।

সামাজিকভাবে কুইন বি নিজেকে ভিকটিম প্রমাণ করে সবার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
মডেল: মার্শিয়া শাওন, পোশাক: হরিতকী, জুয়েলারি: মনসিজ ক্র‍্যাফট, মেকআপ: বিন্দিয়া এক্সক্লুসিভ কেয়ার, ছবি: হাসান রাজা।

কুইন বি’র বৈশিষ্ট্য়
সমাজতত্ত্ব বলে, কুইন বি একজন নারী যিনি একটি দলকে নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর পছন্দের অবস্থানে থেকে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই নিয়ন্ত্রণ তিনি করছেন, সম্পূর্ন নিজের ক্ষমতার লোভে, ক্ষমতালিপ্সা থেকে। তিনি নিজের লাভ ছাড়া একটি কাজও করবেন না। এরা প্রধানত ভয় দিয়ে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

কর্মক্ষেত্রে কুইন বি ও সতর্কতা

– প্রথমত সচেতন হতে হবে যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কুইন বি সিনড্রোমে আক্রান্ত এবং তাঁর কারণে অন্যরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফলে কর্মক্ষেত্রে বুলিং এবং হ্যারাসমেন্ট প্রতিরোধে পলিসি নির্ধারণ জরুরি সর্বসম্মতিক্রমে।
– সোজাসাপ্টা কুইন বি’র সঙ্গে সম্ভব হলে এক টিমে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ মনে রাখবেন, এরা আপনার কাজ পণ্ড করবেই। কাজেই যে কোন টিম তৈরিতে একজন কুইন বি’র অন্তর্ভুক্তি রেড ফ্লাগ। সহজ কথা কুইন বি কে না বলুন। কারণ স্বার্থপর ব্যক্তিরা অন্যকে ভালবাসতে অক্ষম, তবে তারা নিজেরাও নিজেদের ভালবাসতে সক্ষম নয়।

যেভাবে কুইন বি সিনড্রোমে আক্রান্ত থেকে বাঁচবেন
– প্রথমেই নিজের চোখে আয়না ধরুন যখন দেখছেন একজন মানুষ আপনার প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়াচ্ছে না। প্রশ্ন করুন কেন হাত বাড়াচ্ছে না? আপনার নির্দিষ্ট কোন আচরণটির জন্য হাত বাড়াচ্ছে না?
– চিন্তা করুন আপনার শক্তি এবং দুর্বলতা গুলো কী কী। আপনার করা কাজের ক্রেডিট কীভাবে কুইন বি তে আক্রান্ত ব্যক্তি চুরি করছে প্রকাশ্যে তা বিশ্লেষণ করুন।
– মনে রাখবেন কুইন বিতে আক্রান্ত নারী শুধু একা আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে তা নয়। তিনি অন্য নারীদের কেউ দমিয়ে রাখছেন। তিনি কাদেরকে কাদেরকে দমিয়ে রাখছেন সেটা চিহ্নিত করুন। কেন দমিয়ে রাখছেন, কিভাবে দমিয়ে রাখছেন এই দমন নীতির ফলে কি লাভ হচ্ছে তার সেটা আক্ষরিকভাবে কাগজে লিখুন।
– এবার যারা অবদমিত হচ্ছেন তাদেরকে নিয়ে শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তুলুন।
– যেখানে আপনার পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলো দায়িত্ব নিয়ে আপনার পাশে দাঁড়াবে এবং কুইন বিয়েতে আক্রান্ত মানুষটির নেতিবাচক আচরণগুলোতে প্রভাবিত হবে না।
– নিজে ইতিবাচক থাকুন এবং আপনার পাশের অবদমিত মানুষগুলোকে সহযোগিতা করুন নিঃস্বার্থভাবে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জায়গা থেকে। মনে রাখুন, দলগতভাবে কাজ করা মানে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। যাঁরা পৃথিবীতে শুধু ‘আমি’ ‘আমি’ করে তাঁরা খুব বেশি দূর আগাতে পারে না। আমাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গুণাবলী আছে। তাই সবাই মিলে যখন একটি দল তৈরি করব সেই দলটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবেই।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles