
ব্যস্ত জীবনে শরীরের যত্ন নেওয়ার কথা অনেকেই ভুলে যান। দিনের পর দিন বসে কাজ করা, অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত তেল-লবণযুক্ত খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব কিংবা ধূমপানের মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। শুরুতে এসবের প্রভাব খুব একটা বোঝা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাপনে কিছু সহজ পরিবর্তন আনলেই হৃদযন্ত্রের সুস্থতা অনেকটাই বজায় রাখা সম্ভব। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. কাজী নজরুল ইসলাম হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
হৃদযন্ত্রের সুস্থতা কেন জরুরি
হৃদযন্ত্র প্রতিনিয়ত শরীরের প্রতিটি অংশে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। ফলে হৃৎপিণ্ড সুস্থ না থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। হৃদযন্ত্রের যত্ন নেওয়া শুধু দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার বিষয় নয়, বরং সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, ধূমপান, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি।
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে ৭ অভ্যাস
১. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন
রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে।
ডা. নজরুল ইসলামের পরামর্শ, ডায়াবেটিস না থাকলেও নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। তাঁর মতে, প্রতি তিন বছর অন্তর একবার পরীক্ষা করা যেতে পারে। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
২. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করুন
বিশেষ করে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বি জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই সুষম খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
৩. রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখুন
উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি করতে থাকে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ওষুধও সেবন করতে হবে।
৪. ধূমপান ছাড়ুন
ধূমপান হৃদযন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।
তাই যারা ধূমপান করেন, তাদের যত দ্রুত সম্ভব এ অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। ধূমপান বন্ধ করলে শরীর ধীরে ধীরে ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করে।
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অতিরিক্ত ওজন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শরীরের ওজন স্বাস্থ্যসম্মত সীমায় রাখা তাই হৃদযন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. নজরুল ইসলাম উচ্চতার তুলনায় ওজনের হিসাব বা বিএমআই নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিএমআই ২৫-এর নিচে রাখতে পারলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
৬. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা পছন্দের কোনো ব্যায়াম—যে কোনো উপায়ে শরীরকে সক্রিয় রাখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস করা ভালো। এতে হৃদযন্ত্রের পাশাপাশি সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতাও বজায় থাকে।
৭. স্বাস্থ্যকর খাবার খান
হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাজা ফল ও শাকসবজি, দানাদার শস্য, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখা ভালো।
অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত লবণ, ভাজাপোড়া খাবার এবং লাল মাংসের পরিমাণ কমাতে হবে। সম্ভব হলে এসব খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
হৃদযন্ত্রের সমস্যা অনেক সময় গুরুতর হওয়ার আগে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে কারও হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা হৃৎস্পন্দনে অনিয়ম দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।

