17.1 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০২৪

রাতে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘেরা হাওয়াইর মাওয়াই দ্বিপে পৌঁছেছি

রাতে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘেরা হাওয়াইর মাওয়াই দ্বিপে পৌঁছেছি
রাতে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘেরা হাওয়াইর মাওয়াই দ্বিপে পৌঁছেছি

আমাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেলো । আমরা এয়ার পোর্ট থেকেই গাড়ী ভাড়া করে নিলাম। কারন গাড়ী ছাড়া আমরা স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবো না।গত তিন দিন ডিজনি ওয়ার্ল্ড এ মিকি মিনি মাউসের সঙ্গে ছুটা ছুটি করে কাল রাতে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘেরা হাওয়াইর মাওয়াই দ্বিপে পৌঁছেছি । বহু বছর দেশের বাইরে আমাদের বসতি । প্রতি বছরি উড়োজাহাজে ভ্রমন করছি। কোন কোন সময় বছরে কয়েকবার। তারপরও উড়ো জাহাজ ভীতি আমার কাটে না। উড়ো জাহাজটি যখন মাঝে মাঝে চঞ্চল হয়ে উঠে খুব বেশী দুলাদুলি উঠা নামা শুরু করে, তখন আমার মনে হয় আমার জীবন পাখিটিও ভয়ে চোখ বব্ধ করে ফেলে। প্রতিটি ভ্রমণেই আমার মনে হয় আমার জীবন থেকে পাঁচটি বছর কমে গেলো। কিন্তু সত্যিকারের অর্থে যদি তাই হতো , তাহলে বহু ভ্রমনের ফলে আমার জিবনের আর কোন কিছু অবশিষ্ট থাকতো না।

হোটেলে এসে সব কিছু গুছিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে গেলো ।

- Advertisement -

তারপরও সময়ের ব্যবধানে জন্য অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আড় মোরা ভাঙতে ভাঙতে হোটেল রুমের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। উঁচু উঁচু পাম ট্রি দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। আমি নিজের মনেই বলে উঠলাম ,’তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি দেয় আকাশে’।

চারিপাশ থেকে ভেসে আসছে পাখির কলরব । আহা কতো কাল পরে আমি যেনো শুনলাম ভোরের পাখির কলরব। আমি আবারো বললাম ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল ,। এটা আমার চিরদিনের অভ্যাস সব কিছুর সাথে মিলিয়ে একটি কবিতার লাইন মনে করা। একটি কোকিল কোন এক ডালে বসে বেসুরো গলায় গান গেয়ে যাচ্ছে। মনে হয় কোকিলের দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয় হবে। কোকিলটি ভোর থেকে শুরু করে বেলা নয়টা পর্যন্ত গান গেয়ে গেলো কান্তিহীন ভাবে।কখনো উচ্চলয়ে কখনো নিম্নলয়ে। সা-রে-গা-মা-ধা-নি- ছা। মাঝে মাঝে সে সুরে সুর মেল্লাচ্ছে সখা সখী পাখিরাও।

রুমের বাইরে ব্যলকনিতে কফি হাতে নিয়ে এসে বসলাম । পাঁচ তালা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখলাম ঘুঘু পাখির চলাফেরা। একটি ঘুঘুকে দেখলাম আরেকটি ঘুঘু পাখির ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খেতে। ধরে নিলাম একটি মেয়ে ঘুঘু আরেকটি ছেলে ঘুঘু। কারন পাখিদের সমকামী হওয়ার কথাটা এখনো কেউ আবিস্কার করতে পারে নি ।প্রকৃতের নিয়মে ছেলে ঘুঘুটি ভালোবাসলো মেয়ে ঘুঘু টিকে । ভালোবাসা শেষ করে ছেলে ঘুঘুটি মেয়েটির উপর থেকে নেমে স্বদর্পে হাঁটতে শুরু করলো । আর মেয়ে ঘুঘুটি হেলে দুলে ছেলে ঘুঘুটির পেছনে হাঁটতে লাগলো । বিস্মিত হয়ে ভাবলাম পাখিদের মধ্যেও পুরুষত্বের দম্ভ।

আমাদের আজকের পরিকল্পনা সমুদ্র সৈকতে যাবো ।যদিও আমরা বসে আছি প্রশান্ত মহাসাগর ঘেরা দ্বিপে । আজ ভেবেই গেলাম আজ শুধু পা ভিজাবো , গা ভেজাবো না। পা ভিজিয়ে ভিজিয়ে হেঁটে বেড়াবো সৈকতের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। সূর্য তখন মাথার উপর দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে নিজের উপস্থিতি প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সমুদ্রের একের পর একের ঢেউ এসে আমার পা দুটো ছুঁয়ে ছুয়ে যাচ্ছে । আমার নিজেকে মনে হচ্ছিল এক চঞ্চলা কিশোরী ঝাঁপিয়ে পড়তে চাই সমুদ্রের বুকে। চারিদিকে কিশোরী , তরুণী , যুবতীরা সাতারের পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেউ বা যুগল ভাবে কেউ বা একা। আমি সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে হেঁটে হেঁটে অনুভব করছি জীবনের সর্ব সুখ । মাথায় চাপিয়েছি প্রচণ্ড বড় একটা টুপি নিজেকে রোদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ।সমুদ্র সৈকতে কিছু শ্বেতাঙ্গ তরুণী এবং যুবতী উদোম শরীরে উপুর হয়ে শুয়ে আছে নিজেদের সাদা রং পুড়িয়ে বাদামী করার জন্য। মনে মনে হাসলাম হায়রে… আমাদের কতো চেষ্টা রঙটা বাঁচানোর জন্য। আর এরা সূর্যের কাছে আত্ম সমর্পণ করেছে নিজেদের পুড়িয়ে দেবার জন্য। এতেই তাদের সুখ।

মাঝে মাঝে উদ্ভট চিন্তা আমাকে তাড়িত করে। দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম কি ভাবে আকাশ ছুঁয়ে আছে সমুদ্রে । ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই কিছুটা এগিয়ে গেলাম পানির দিকে। প্রচণ্ড একটা ঢেউ এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো । আমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আল্প একটু ভেসে চলে গেলাম ঢেউয়ের সাথী হয়ে। আমার সহযাত্রী আমাকে ধরে ফেললো । ঢেউ আমাকে বেশী দূর ভাসিয়ে নিতে পারলো না। চিন্তা করলাম ঢেউ যদি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো , কি রকম অনুভূতি হতো আমার? পরক্ষনেই নিজের মনে হাসি, কি আর হতো ? সমুদ্রের অতলে হারিয়ে যেতাম । কোন দিন হয়তো মৎস্য কন্যা হয়ে ভেসে উঠতাম।

আমার ভ্রমন সঙ্গী আমার স্বামী দেবতা কোথায় যেনো হারিয়ে গেলেন। আমাকে সমুদ্র সৈকতে বসিয়ে রেখে। এমন হারিয়ে যাবার অভ্যাস ওর নতুন কিছু না তাই হারিয়ে যাওয়াটা আমাকে তেমন চিন্তিত করে না। আমি জানি সে তার সময় মতো ফিরে আসবে। মানচিত্র হাতে নিয়ে গেছে। মানচিত্র হাতে হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে নতুন কিছু আবিস্কারের উদ্দেশ্যে। একটি ভিয়েতনামি মেয়েকে দেখলাম কোলে একটি শিশু আর হাতে ধরা আরেকটি শিশুকে নিয়ে সে মহা আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে পানিতে পা ভিজিয়ে। একটু আলাপ করার ইচ্ছে হোলো তরুণীটির সাথে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম এতো ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এসেছো , ক্লান্তি লাগছে না ? মেয়েটি হেসে জবাব দিলো ‘না’ –

না এসে কি করবো বোলো ? কতো দিন আর অপেক্ষা করবো হানিমউনের? আমার বিস্মিত চোখ দেখে মেয়েটি শব্দ করে হেসে উঠলো । তারপর বললো বিয়ে কিছুদিন আগেই প্রথম সন্তানের আগমনী বার্তা । হানিমুন আর হোলো না। বড়টার আট মাস হতে না হতেই ছোটটার আগমনী বার্তা সব কিছুই ঘটে গেলো অপরিকল্পিত ভাবে।্তাই আমি আর আমার স্বামী সিধান্ত নিলাম দুই বাচ্চা নিয়েই আমরা হানিমুন করবো , নাহয় আবার কবে তিন নাম্বারটা চলে আসে।

বলেই মেয়েটা প্রান খুলে হেসে উঠলো । আমরা খুবই উপভোগ করছি, কোন কষ্টই হচ্ছে না আমাদের দুই বাচ্চা নিয়ে। মেয়েটির কথা শুনে খুব ভালো লাগলো । কঠিন জীবনটা কতো সহজ ভাবে নিয়েছে মেয়েটা।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles